ইংল্যান্ড-আমেরিকায় ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে পাবনার খাঁটি ঘি

ঢাকা, বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ১ ১৪২৮,   ০১ রমজান ১৪৪২

ইংল্যান্ড-আমেরিকায় ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে পাবনার খাঁটি ঘি

পাবনা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩৭ ৫ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৫:৪৮ ৫ মার্চ ২০২১

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমড়া বাজারের কারখানায় খাঁটি দুধ থেকে তৈরি ছানা

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমড়া বাজারের কারখানায় খাঁটি দুধ থেকে তৈরি ছানা

বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে ছানা ও ঘিয়ের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। দুগ্ধ ভান্ডার খ্যাত পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের খাঁটি দুধের তৈরি ছানা ও ঘি-এর সুঘ্রাণ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন ছড়িয়ে পড়েছে ইংল্যান্ড-আমেরিকার মতো উন্নত দেশে। প্রতি বছর ঘি ও ছানা রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে।

জনপ্রিয় ও নির্ভেজাল এসব ছানা ও ঘি তৈরির কারখানা অবস্থিত পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা বাজারে।

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসিব খান তরুণ জানান, বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ লিটারের বেশি দুধ উৎপাদন হয়। দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা পাবনার ভাঙ্গুড়া ক্রয় কেন্দ্র, সিরাজগঞ্জের লাহিড়ী মোহনপুর ও বাঘাবাড়ি মিল্কভিটায় প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ লিটার দুধ সরবরাহ করেন।

ঘি তৈরির জন্য দুধ থেকে ক্রিম সংগ্রহ করা হচ্ছেতিনি আরো জানান, এ অঞ্চলে প্রায় এক হাজার দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমিতির মাধ্যমে দুধ সরবরাহ করা হয়। সমিতির সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার। এছাড়া সমিতির বাইরেও কয়েক হাজার খামারি দুধ সরবরাহ করেন। ৭৫-৮০ হাজার লিটার দুধ কেনে আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ঘোষরা কেনে ২৮-৩০ হাজার লিটার। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ কিনে প্রক্রিয়াজাত করে রাজধানীতে পাঠাতে বেশ কয়েকটি চিলিং সেন্টার স্থাপন করেছেন। অধিকাংশ স্থানে খামারিরা বাড়ি বসেই দুধ বিক্রি করতে পারেন। ঘোষরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ কিনে চিলিং সেন্টারে সরবরাহ করেন।  

পাবনার প্রতিষ্ঠিত ঘোষ ও ঘি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে পর্যাপ্ত পরিমাণ দই, মিষ্টি ও ছানা তৈরি হয়। খাঁটি দুধ থেকে তৈরি ছানা ও ঘি। এ অঞ্চলের ঘি-এর চাহিদা পূরণ করে দেশের বাইরেও রফতানি হয়।

ননী গোপাল ঘোষ জানান, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ থেকে প্রতিদিন ১শ’ মণের বেশি ছানা ও ২৫-২৭ মণ ঘি ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, খুলনা ও রাজশাহীতে পাঠানো হয়।

দুধ ছানা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকরাডেমড়া বাজারের রবি ঘোষ, পরিতোষ ঘোষ ও বাবলু ঘোষ জানান, ডেমড়ার ৭-৮ জন ঘোষ নিয়মিত ছানা ও ঘি তৈরি করেন। তারা প্রতিদিন ৩৪-৩৭ মণ ছানা ও সাত মণ ঘি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের অভিজাত মিষ্টির দোকানে সরবরাহ করেন। কয়েকটি মিষ্টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসব ঘি ও ছানা প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বাইরে পাঠায়। সিলেট ও চট্টগ্রামে পাঠানো ছানা ও ঘি-এর উল্লেখযোগ্য অংশ ইংল্যান্ড-আমেরিকায় রফতানি করা হয়।

ছানা ব্যবসায়ী আবু তাহের জানান, বছর দশেক আগে কুষ্টিয়ার বালিরদিয়া গ্রামের পৈত্রিক নিবাস ছেড়ে পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ১২-১৪ বছর ধরে ছানার ব্যবসা সূত্রে তার ডেমরায় যাতায়াত। ডেমরা থেকে পাইকারি দরে ছানা কিনে নিজ এলাকায় বিক্রি করতেন। এ ব্যবসা ক্রমেই জমে ওঠে। পরে তিনি ডেমরা বাজারে নিজস্ব কারখানা স্থাপন করেন। নিজ এলাকা থেকে ব্যবসা পরিচালনা করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। লাভজনক ব্যবসাটি ধরে রাখতেই তিনি ডেমরায় স্থায়ী হন। তার দোকানে প্রতিদিন অর্ধশত মণ দুধ কেনা হয়। ছানা উৎপাদন হয় প্রায় ২৫০ কেজি।

ছানার দর কত? এগুলো কোথায় সরবরাহ হয়? জানতে চাইলে আবু তাহের জানান, সকাল-বিকেল দুই দফায় দুধ কেনা হয়। সকালে প্রতি মণ দুধের গড় দাম হয় ১৬০০ টাকা, বিকেলে ১৭০০-১৮০০ টাকা। বাঘাবাড়ির মিল্কভিটা বন্ধ থাকলে দুধ সেদিন সস্তা হয়। দুধ থেকে দুই ধরনের ছানা তৈরি হয়। সারান ছানা ও টানা ছানা। দুধ থেকে যান্ত্রিক উপায়ে ক্রিম উঠানোর পর যে ছানা পাওয়া যায় সেটা হলো টানা ছানা। সারান ছানা ৯০-১০০ টাকা কেজি আর টানা ছানা বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকা।

বড়াল নদীতে ছানার পাত্র ঠাণ্ডা করছে শ্রমিকরাডেমরা বাজারে ছানা ও ঘি ব্যবসায়ীদের ১০-১২টি কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারখানায় ৮-২০ জন শ্রমিক কাজ করে। কারখানাগুলোও চলে দুই শিফটে। ভোর থেকে দুপুর ও বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে ছানা তৈরির কাজ। কারখানাগুলোতে চলে এক এলাহী কাণ্ড। দেখা গেল দেবেন ঘোষের কারখানায় ১০ জন শ্রমিক বড় চুল্লিতে দুধ ফুটাচ্ছিল। অন্যরা পাশের ডোবায় ছানা ঠাণ্ডা করতে ব্যস্ত। কেউ কেউ বড় কাপড়ে ছানা রেখে বাঁশের আড়ায় ঝুলিয়ে ছানা থেকে পানি ঝরাচ্ছে। এসব শ্রমিকই প্রতিদিন ভোরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ সংগ্রহ করে কারখানায় আনে।

ডেমড়া বাজারের দুলাল ঘোষ জানান, এ বাজারের ঘোষরা প্রতিদিন প্রায় ৭শ’ মণ দুধ কিনে ছানা তৈরি করেন। ওই পরিমাণ দুধে প্রায় ১২৫ মণ ছানা তৈরি হয়। এরমধ্যে ১৮-২০ মণ ছানা স্থানীয় বাজারে বিক্রির পর বাকি ছানা চলে যায় দেশের অন্য অঞ্চলে।

তিনি আরো জানান, এক মণ দুধ থেকে আট কেজি ছানা ও ৩ কেজি ফ্যাট পাওয়া যায়। তিন কেজি ফ্যাট জ্বালিয়ে দেড় কেজি খাঁটি ঘি পাওয়া যায়। এ হিসেবে বৃহত্তর পাবনার দুটি জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১শ’ লিটার বা ২৭ মন ঘি তৈরি হয়।

বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলের দুগ্ধ শিল্পে সমৃদ্ধির পাশাপাশি আছে অনিয়ম-দুর্নীতির কালো থাবা। নজরদারির অভাবে অনেক কারখানায় তৈরি হচ্ছে ভেজাল ছানা। কিছু কিছু কারখানার পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে ভেজাল ঘি-ছানা বিক্রি করছে। এতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের দুর্নাম হচ্ছে।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ সংগ্রহ করে কারখানায় নিয়ে আসে ঘোষরাআবার গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে দুধ উৎপাদনও। খামার পরিচলনা করতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গো-খামারিরা। বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া জগন্নাথপুর, শম্ভুপুর, সাঁথিয়ার সেলন্দা, নাগডেমড়া, সোনাতলা, ধুলাউড়ি, ফরিদপুর উপজেলার ডেমড়া, পারফরিদপুর এলাকার দুধ উৎপাদনকারীরা জানান, গো-খাদ্যের দাম বেড়েই চলেছে। সে তুলনায় দুধের দাম বাড়েনি। ফলে কিছুদিন ধরেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের রতন কুমার সরকার জানান, তার খামারে ৩০টি গরু রয়েছে। আগে প্রতি বছর ৫-৬ লাখ টাকা লাভ থাকতো। এখন গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় তা কমে অর্ধেকে নেমেছে। খৈল-ভূষির দোকানে সারা বছর প্রায় ৫০ হাজার টাকা বাকি পড়ে আছে। বাকি শোধ করতে এবার গরু বিক্রি ছাড়া উপায় থাকবে না।

হাটুরিয়া জগন্নাথপুরের প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি মোমিন মোলল্ল জানান, সমিতির বেশিরভাগ সদস্য দেনার ভারে জর্জরিত। এখন দুধের দাম যদি এভাবে পড়ে যায় তাহলে গরু বিক্রি করেই দেনা শোধ করতে হবে। লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে এরইমধ্যে শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের বৃআঙ্গার গ্রামেরগো-খামারি নাজিমউদ্দিন আহমেদ ১২টি উন্নতজাতের গাভী বিক্রি করে দিয়েছেন।

বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলের খামারিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা দুধ এভাবেই পাঠানো হয় বাঘাবাড়ির মিল্কভিটায়গো-খাদ্য বিক্রেতারা জানান, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তারা গো-খাদ্য কেনেন। সেসব এলাকায় গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে, পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গো-খাদ্যের ওপর।

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আল মামুন হোসেন জানান, জেলার বহু খামারি দুধ উৎপাদন করে সাংসারিক স্বচ্ছলতা এনেছেন। দুধ উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করেই ছানা-ঘি শিল্প গড়ে উঠেছে। বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে উৎপাদিত ছানা ও ঘি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ছানা-ঘি শিল্পের প্রসারের সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। তারা খাঁটি ঘি-এর নামে ভেজাল ঘি বাজারে সরবরাহ করছে। এতে দেশীয় ব্যবসায়ীদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া গো-চারণ ভূমি কমে যাওয়া ও গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় দুগ্ধ উৎপাদন ও ছানা-ঘি তৈরির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ শিল্পের সুনাম রক্ষায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর