কার্ড ঘষলেই মিলবে টিভি-ফ্রিজ!

ঢাকা, শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৫ ১৪২৮,   ০৪ রমজান ১৪৪২

কার্ড ঘষলেই মিলবে টিভি-ফ্রিজ!

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৮ ২ মার্চ ২০২১   আপডেট: ১৬:১২ ২ মার্চ ২০২১

প্রলোভন দেখিয়ে একটি প্রতারকচক্র গরিব মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

প্রলোভন দেখিয়ে একটি প্রতারকচক্র গরিব মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

মাত্র ১০০ টাকায় কার্ড ঘষলেই মিলবে টিভি, ফ্রিজ, সেলাই মেশিনসহ নামী দামী ইলেকট্রনিকস পণ্য-সামগ্রী। এমন প্রলোভন দেখিয়ে একটি প্রতারকচক্র গরিব মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

অথচ কার্ড ঘষে মিলছে রাইস কুকার, ব্লেন্ডার, গ্যাসের চুলাসহ নিম্নমানের এক একটি সামগ্রী, সেগুলো আবার কিনতে হচ্ছে ১৫০০ টাকা দরে। নেই কোনো টিভি-ফ্রিজ বা দামী সামগ্রী। 

কোম্পানির ছাড় আছে ১৫ টি কার্ড নিলে এসব মিলবে বলে প্রতারক চক্রটি জানায়।  ঝিনাইদহের শৈলকুপায় শিক্ষক পাড়ায় জাতীয় পার্টির শৈলকুপা উপজেলা শাখার সভাপতি মনিকা আলমের বাসায় প্রতারক চক্র পেতেছে এমন ফাঁদ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্র রাজবাড়ী, নড়াইলের লোহাগড়া, মাগুরা সদরে এমন কার্ড বা লটারির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিয়ে এক মাস পর পর রাতের আঁধারে পালিয়ে নতুন নতুন জেলায় আস্তানা পাতে। 

সর্বশেষ তাদের অবস্থান ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায়। ফেব্রুয়ারির শুরুতে অতি গোপনে বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী নিয়ে গড়ে ওঠা চক্রটি শৈলকুপার শিক্ষকপাড়ার এই বাড়িতে অবস্থান নেয়। 

এর আগে তাদের অবস্থান ছিল মাগুরা সদর উপজেলার পারনান্দুয়ালী পল্লী বিদ্যুৎপাড়ায় । সেখানে বাটুল মুন্সী নামে এক ব্যক্তির দোকানের ঠিকানা ব্যবহার করে এবংএকটি বাসা ভাড়া নিয়ে শুরু করে প্রতারণা। বিশেষ করে পল্লী অঞ্চলের দারিদ্র-শ্রমজীবি মানুষগুলোকে তারা টার্গেট করে। ইটভাটাগুলো চক্রটির প্রধান টার্গেট। 

প্রতারকচক্র

২ নম্বর আঠারোখাদা ইউপির পাশে কামারবাড়ি শাপলাবাটা মোড়ে রয়েছে ইটভাটা। সেই ভাটার শ্রমিক মনজিলা, রেহেনাসহ অসংখ্য নারী ও পুরুষ শ্রমিক খুব সহজেই তাদের যাপিত জীবনের রান্নাবাড়া আর ঘরগৃহস্থালীর সামগ্রী পরিপাটি করতে ঝুঁকে পড়েন কার্ড ঘষলেই টিভি-ফ্রিজের চটকদারী গোলকধাঁধায়। পটে যায় তরুণ-তরুণীদের হাতে থাকা কার্ড কিনতে। 

এক এক শ্রমিক ১৫-২০ টা করে কার্ড কেনে তবে সেসব কার্ডে মেলেনি তাদের টিভি-ফ্রিজ। খুঁজতে গিয়ে দেখেন রাতের আঁধারে পালিয়েছে প্রতারক চক্রটি।

শৈলকুপার শিক্ষকপাড়ায় চক্রটির সন্ধান পেয়ে মাগুরা থেকে ইটভাটার শ্রমিকরা এসে পুলিশকে বিষয়টি অবগত করেন। তারা প্রতারকদের বিচার ও গ্রেফতার দাবি জানায়। 

পুলিশ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে জাতীয় পার্টির নেত্রী মনিকা আলমের বাসায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার সত্যতা পায়। পুলিশের খোঁজাখুঁজিতে ফাঁদপাতা চক্রটি তাড়াহুড়া করে কয়েকজন শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেয়।  

কার্ড ঘষলেই টিভি-ফ্রিজসহ এমন লোভনীয় ফাঁদে পড়তে শুরু করেছে শৈলকুপার বিভিন্ন এলাকার মানুষ। কবিরপুর, ঝাউদিয়াসহ ইটভাটাগুলিতে চলছে প্রতারক চক্রের লাখ লাখ টাকার ব্যবসা।

শৈলকুপার শিক্ষক পাড়ায় জাতীয় পার্টির উপজেলা শাখার সভাপতি মনিকা আলমের বাড়িতে এই প্রতারক চক্রের অবস্থানের খবরে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। 

জানা গেছে, গোপালগঞ্জের মুকসেদপুরসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা একদল তরুণ-তরুণী ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে উঠেন এই বাসাতে। নেই কোনো সাইনবোর্ড, বাসা ভাড়ার চুক্তিপত্র এমনকি কোনো কাগজপত্র নেই।   

শৈলকুপা থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম জানান, ভাড়াটিয়া এলে বাসার মালিক থানাতে সেসবের এন্ট্রি করবে এমন নিয়ম রয়েছে। 

এদিকে প্রতারক চক্রটির প্রধান রেশমা ইলেকট্রনিকস গ্যালারির ম্যানেজার হিসেবে লোকমান হোসেন নামের এক যুবক নিজেকে পরিচয় দেয়। 

তিনি জানান, ঢাকায় তাদের শোরুম রয়েছে। এর আগে মাগুরায় ছিল তবে সেখানে পণ্য বিক্রি না হওয়ায় ঝিনাইদহের শৈলকুপা চলে আসেন বলে স্বীকার করেন। 

কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা কাগজপত্র ছাড়া কিভাবে এসব কার্ড বা লটারি বিক্রি করছেন? এমন প্রশ্নে তিনি জানান, নতুন এসেছে পরে ট্রেড লাইসেন্স করবে, বাসার মালিক ও জাতীয় পার্টির নেত্রী বিষয়টি দেখছেন।

সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে বিষয়টি জানাজানি হলে পরে চক্রটি শৈলকুপা পৌরসভা থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নেয়। কিন্তু থানাতে তাদের কোনো কাগজপত্র এন্ট্রি করা নেই। এমন ফাঁদের বিষয়ে বাসার মালিক সাবেক ব্যাংকার আবু বাশার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি চটে যান। মনিকা আলমও তার স্বামীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে ভাড়াটিয়াদের ব্যাপারে কিছু বলতে চাননি।

প্রতারক চক্রের নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানান, তারা শোরুম থেকে এসেছেন, কোম্পানি নামী-দামী পণ্যের বিশেষ ছাড় দিয়েছে যা কার্ড ঘষলেই মিলবে। মুক্তা ও রিয়া নামে দুই কর্মী জানান, তারা বিভিন্ন জেলায় জেলায় গিয়ে এভাবে পণ্য বিক্রি করছেন। বিভিন্ন ইটভাটা শ্রমিক তাদের প্রধান কাস্টমার।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে