রায় পক্ষে আসলেও সব হারিয়েছে শাহানারার পরিবার 

ঢাকা, শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ৫ ১৪২৮,   ০৪ রমজান ১৪৪২

রায় পক্ষে আসলেও সব হারিয়েছে শাহানারার পরিবার 

মাগুরা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:২৩ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কন্যা শাহানারা

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কন্যা শাহানারা

মাগুরায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কন্যা শাহানারার আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় জাগরণী চক্র এনজি’র আঞ্চলিক সমিতি সংশ্লিষ্ট চারজনকে সাজা দিয়েছে আদালত। রোববার মাগুরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউর রহমান চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় দেন।

২০১৬ সালে মাগুরার সদর উপজেলার কাশিনাথপুর গ্রামের আবদুস ছালামের স্ত্রী শাহানারা খাতুন মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে ঋণের জন্যে স্থানীয় এনজিও জাগরণী চক্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু ঋণ নিতে এনজিওকে দিতে হবে ব্যাংক চেক। আর এই চেকটি দিয়েই বিপদে পড়ে যান শাহানারা। ঋণ তো পায়নি; বরং এনজিও সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠির খপ্পড়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় তাকে।

মাগুরা জেলা জজ আদালতে দায়েরকৃত আত্মহত্যায় প্ররোচনার এই মামলাটির রায়ে রোববার প্রতারক চক্রের চারজনকে সাজা দিয়েছেন আদালত। কিন্তু শাহানারা আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকতে মেয়েটিকে তুলে দিতে পারেননি শ্বশুরবাড়িতে। শুধু তাই নয়, ওই প্রতারক গোষ্ঠি জোরপূর্বক তাদের বসতবাড়িটিও দখল করে নেয়ায় তার স্বামী-সন্তানদের ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে পথে পথে।

আত্মহননের শিকার শাহানারা খাতুন মাগুরা সদর উপজেলার কাশিনাথপুর গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ইসরাইল বিশ্বাসের মেয়ে। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর রাত ১ টার দিকে তিনি নিজের বসত ঘরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনার পরদিন জাগরণী চক্র এনজিওর এক কর্মকর্তা এবং এনজিওর আঞ্চলিক সমিতির নেতা মরজিনা বেমগ মধু, তার বাবা মকছেদ শেখ, মা মিলিনা ও স্বামী খোকন শেখকে আসামি করে মাগুরা জেলা জজ আদালতে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলাটি দায়ের করেন শাহানারার বড় ভাই হাফিজুর রহমান মিন্টু।

দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছর মামলা চলার পর অবশেষে রোববার মাগুরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জিয়াউর রহমান যাবতীয় স্বাক্ষ্য প্রমাণাদি শেষে জাগরণী চক্রের আঞ্চলিক সমিতির নেত্রী মরজিনা বেগম মধুকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার দায়ে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৩ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি এই অপরাধকর্মে সহযোগিতা করার দায়ে মরজিনার বাবা মকছেদ শেখ, মা মিলিনা এবং স্বামী খোকন শেখকে ১ বছর করে কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ১ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের গৃহবধূ শাহানারা খাতুন ঋণের জন্যে জাগরণী চক্র এনজিওর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা এনজিওটির আঞ্চলিক সমিতি প্রধান মরজিনা বেগম মধুর কাছে সাদা চেকে স্বাক্ষর করে ঋণের জন্যে আবেদন করতে বলেন। সেই অনুযায়ী শাহানারা প্রাইম ব্যাংকে থাকা তার হিসাব নম্বরের একটি চেকের সাদা পাতায় স্বাক্ষর করে জমা দেন। কিন্তু কুচক্রি প্রতারক মরজিনা বেগম তাকে ঋণের টাকা দেয়নি।

ওই চেকের পাতায় ৪ লাখ ৫০ হাজার ও নিজের নাম লিখে নিজ একাউন্টে জমা দেয়। কিন্তু শাহানারা খাতুনের একাউন্টে ওই পরিমাণ টাকা না থাকায় চেকটি বারবার ডিজঅনার হয়। এই বিষয়টিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মরজিনা বেগম। তিনি তার স্বামী এবং বাবা-মা সহ স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে বারবার শাহানারাকে তার ১৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একতলা বাড়িটি লিখে দিতে চাপ প্রয়োগ করে। স্থানীয় মাতবরদের মাধ্যমেও তারা নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। এ অবস্থায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শাহানারা খাতুন শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী শাখারুল ইসলাম শাকিল জানান, পুলিশ তাদের তদন্তে ঘটনাটি মিথ্যা বলে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু মামলার বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে আদালত বিষয়টি নতুন করে তদন্তের জন্যে পিবিআইকে দায়িত্ব দিলে তারা বিষয়টির সত্যতা খুঁজে পায়। ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর পিবিআই তাদের প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে মামলার যাবতীয় স্বাক্ষ্য প্রমাণাদি শেষে রোববার বিজ্ঞ বিচারক ৪ জনকে দোষী সাবস্ত করে এই রায়টি দিয়েছেন।

মামলার বাদী হাফিজুর রহমান মিন্টু বলেন, আদালতের রায়ে আমরা খুশি। কিন্তু আমার বোনকে হারিয়েছি। বোনের তিন সন্তান মা হারা হয়েছে। প্রতারক চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, বোনের মৃত্যুর পর তারা জোরপূর্বক তার বাড়িটি দখল করে নিয়েছে। প্রতারক চক্রের কবল থেকে বাড়িটি উদ্ধার হলে নিহত বোনের সন্তানেরা সেখানে বসবাস করার সুযোগ পেতে পারে। এ অবস্থায় আদালত এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে