শুধু নদী নয় চরও মাটিখেকোদের দখলে

ঢাকা, বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১,   বৈশাখ ১ ১৪২৮,   ০১ রমজান ১৪৪২

শুধু নদী নয় চরও মাটিখেকোদের দখলে

কুমিল্লা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫৬ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:২১ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কয়েক বছর আগেও গোমতীর চরজুড়ে বিভিন্ন সবজির চাষ হতো। পুরো চরজুড়ে থাকতো সবুজের হাসি। কিন্তু এখন পুরো চরটি ক্ষতবিক্ষত ভেকু আর কোদালের আঘাতে। 

কুমিল্লা সদর উপজেলার গোমতী নদীর সামারচর এলাকায় জনি মিয়া আক্ষেপের সুরে জানান, ওরা আগে পুরো নদীটাই খেয়েছে। এরপরও ওদের পেট ভরেনি। এখন তাই গোমতীর চরও গিলে খাচ্ছে। 

নদী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, লাগামহীনভাবে লোপাট হচ্ছে গোমতী নদীর বালু আর নদীর চরের কৃষি জমির মাটি। পুরো এলাকাটি দেখলে মনে হবে, যেন বালু তোলা আর মাটি কাটার প্রতিযোগীতা চলছে। প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই প্রভাবশালীরা নদীর বালু আর চরের মাটি গিলে খাচ্ছেন। আগে শুধুই নদীর বালু তোলাই মূল উদ্দেশ্য থাকলেও নদী থেকে পর্যাপ্ত বালু তুলতে না পেরে নদীর চর ও নদী সংলগ্ন কৃষি জমিতে ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলছে তারা। 

আবার কোথাও কোথাও ভেকু ও কোদাল দিয়ে লোপাট হচ্ছে চরের কৃষি জমির মাটি। এতে গোমতী নদীর চর এলাকায় প্রতিদিনই কমছে কৃষি জমির পরিমাণ। আর অবাধে বালু তোলার ফলে গোমতী নদীর দুই পাশের প্রতিরক্ষা বাঁধও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্ষার সময় নদীতে জোয়ার আসলেই বড় ধরণের দুর্ঘটনার আশংকা করছেন স্থানীয়রা।

আর কৃষকরা এসবের প্রতিবাদ করলেই বালু-মাটি খেকোরা তাদের উপর শুরু করে নির্যাতন। এজন্য এখন ভয়ে কোন মানুষই মুখ খুলতে চায় না।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গোমতী নদীর সদর উপজেলার অংশে বৈধ ৬টি বালুমহাল রয়েছে। এর ৫টি এবার ইজারা পেয়েছেন মাহাবুবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। আরেকটি পেয়েছেন আরফানুল হক রিফাত। তবে এ উপজেলার পুরো নদী এলাকায় গেলে দেখা যায়, অন্তত ৪০টি স্থান থেকে অবাধে চলছে বালু ও চরের মাটি কাটার প্রতিযোগীতা।     

সদর উপজেলা অংশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, অর্ধশতাধিক ড্রেজার ও ট্রলার দিয়ে চলছে বালু তোলা। এসব বালু তোলার পর স্তুপ করে রাখা হয়। পরে এগুলো ট্রাকযোগ জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু মাত্র সদর উপজেলার অংশেই নয়। জেলার বুড়িচং, দেবিদ্বারসহ যেসব উপজেলার উপর দিয়ে গোমতী নদী বয়ে গেছে, সেখানেই চলছে একই অবস্থা। এতে করে দিন দিন যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে গোমতী। আর বালু-মাটি খেকোরা হয়ে পড়ছে অপ্রতিরোধ্য এবং নিয়ন্ত্রণহীন।

কুমিল্লার সদর উপজেলার গোমতী নদীর সংরাইশ, টিক্কারচর, অরণ্যপুর, ঝাকুনিপাড়া, শালধর পাঁচথুবী, জালুয়াপাড়া, বানাশুয়া, গোলাবাড়িসহ বিভিন্ন এলকা ঘুরে দেখা যায়, নদী আর চরে যেন বালু-মাটি উত্তোলনের প্রতিযোগীতা চলছে। যে যার মতো করে নদীর বালু ও চরের মাটি লোপাট করছেন। এসব এলাকায় নদীর চর ও কৃষি জমির বেশিরভাগই বালু খেকোদের দখলে। 

অরণ্যপুর এলাকার কৃষক মনিরুল হক, সংরাইশ এলাকার আবদুল মজিদসহ বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, কৃষি জমিগুলো এখন শুধু নামেই আছে, বাস্তবে নেই। বালু আর মাটি খেকেরা সব শেষ করে দিয়েছে। তারা বলে এগুলো নাকি সরকার থেকে ইজারা নিয়েছে। এখন মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না। কারণ কথা বললেই শুরু হবে নির্যাতন। 

পাউবো কুমিল্লার নির্বাহী প্রকোশলী মো.আবদুল লতিফ বলেন, গোমতী নদীর বিভিন্ন অংশের বালুমহাল জেলা প্রশাসন ইজারা দিয়ে থাকে। এখন কোন শর্তে এসব ইজারা দেয়া হয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন।

তবে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো.আবু সাঈদ বলেন, জেলা প্রশাসন মাত্র ৬টি স্থানে সরকারিভাবে বালুমহাল ইজারা দিয়েছে, কোনো মাটিমহাল ইজারা দেয়নি। আর বৈধ বালুমহালের ইজারাদাররা শুধুমাত্র নদীর প্রভাবমান মধ্যখান থেকে বালু তুলতে পারবেন। চরের মাটিতো দূরের কথা, নদীর পাড় সংলগ্ন স্থান থেকেও বালু তোলা অবৈধ। 

তিনি আর বলেন, এখন বিভিন্ন স্থানে নদীর সঙ্গে চরের জমিগুলোও শেষ করে ফেলতে চাইছে বালু-মাটি খেকোরা। তবে এসব বালু আর মাটিদস্যুরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, আমরা তাদের ছাড় দিবো না। আমরা নদী ও চরের কৃষি জমি রক্ষায় গত কয়েক মাস ধরে একের পর এক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা অভিযানকালে যেখানে অবৈধভাবে মাটি-বালু তোলা দেখছি, সেখানেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। মাটি-বালুদস্যুদের বিরুদ্ধে আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস/এআর