অভাব অনটনে কাটছে ঢুলি সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা

ঢাকা, সোমবার   ১২ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৯ ১৪২৭,   ২৮ শা'বান ১৪৪২

অভাব অনটনে কাটছে ঢুলি সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৫৯ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:৩৩ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউপির হামিদপুরের বায়ানপাড়ায় বসবাসরত ঢুলি সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার।

ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউপির হামিদপুরের বায়ানপাড়ায় বসবাসরত ঢুলি সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার।

বাংলা সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ঢুলি সম্প্রদায়। এ সংস্কৃতির ঐতিহ্যে বিকাশেও রয়েছে এ সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলা সংস্কৃতির যাত্রা, নাটক, বাউলগান, পালাগান হয়েছে এ সম্প্রদায়ের হাত ধরে সমৃদ্ধ।

এ সম্প্রদায়ের উর্বর ভূমি টাঙ্গাইল জেলা। যার নিদর্শন এখনও ধরে রেখেছে জেলার ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউপির হামিদপুরের বায়ানপাড়ায় বসবাসরত ঢুলি সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার।

তবে আধুনিক যন্ত্রাংশের দাপটে এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে এ সম্প্রদায়ের কার্যক্রম। এর ফলে চরম অভাব অনটনে কাটছে এ সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকা। পেটের দায়ে সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন অন্য পেশা। ঝুপড়ির ঘর, উন্মুক্ত পায়খানায় এ সম্প্রদায়ের শিশুসহ পরিবার গুলো যেমন রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে, তেমনি রয়েছে পরিবার পরিকল্পনা প্রদ্ধতি সম্পর্কে অসচেতনতা। গ্রামটিতে রয়েছে চরম পয়োনিষ্কাশন সমস্যাও। মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যেও দিনদিন বাড়ছে এ গ্রামে বসবাসরত পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা।

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউপির হামিদপুরের বায়ানপাড়ায় বসবাস করে আসছে ঢুলি সম্প্রদায়ের এ পরিবার গুলো।

জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর ধরে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দিগর ইউপির হামিদপুরের বায়ানপাড়ায় বসবাস করে আসছে ঢুলি সম্প্রদায়ের এ পরিবারগুলো। ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম এই বায়ানপাড়া বা নার্গাচিপাড়া। ব্যক্তি মালিকাধীন ৫৯ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত এ গ্রামটিতে বসবাসরত পরিবারের সংখ্যা শতাধিক হলেও এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২০০ জন। তাদের ভোটার সংখ্যা ১০৫ জন। 

এছাড়াও ইসলাম ধর্মাবলম্বী এ সম্প্রদায়ের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন এই বাদ্যযন্ত্র। পরিবারের উপার্জনক্ষম শিশু থেকে বৃদ্ধ একজন হলেও রয়েছে এ পেশায় জড়িত। গ্রামটিতে বর্তমানে এ পেশার কাজ করছে লিপ্ত রয়েছেন বাসন্তী ব্যান্ড পার্টি, মনির ব্যান্ড পার্টি, বাংলাদেশ ভান্ডারি ব্যান্ড পার্টি, স্বপন ব্যান্ড পার্টি, শাহিন ব্যান্ড পার্টি, ফখর উদ্দিন ভাই ভাই ব্যান্ড পার্টি, সুমাইয়া ব্যান্ড পার্টি, বৃষ্টি ব্যান্ড পার্টি ও হৃদয়-রিপন ব্যান্ড পার্টির মতো কয়েকটি দল। 

এক একটি দলে কাজ করছে কমপক্ষে ১২ জন সদস্য। বাংলা বছরের বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, অগ্রহায়ণ, মাঘ আর ফাল্গুন এ সম্প্রদায়ের উপার্জনের সময়। এ সব ব্যান্ড পার্টির একটি দলে কাজ করেন ৬ জন বাঁশি বাদক, ১ জন বাংলা সানাই বাদক, ১ জন জয় ঢাঁক বাদক, ১ জন ঢোল বাদক, ১ জন জুড়ি বাদক, ১ জন কারা বা ছোট জয় ঢাঁক বাদক আর ১ জন করতাল বাদক। নাটক, যাত্রা, বাউলগান, পালাগান, হিন্দু বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওরস, র‌্যালিসহ নানা ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয় তাদের বাদ্যযন্ত্র। এ ধরনের প্রতিটি দিনব্যাপি অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বাবদ জনপ্রতি পান এক হাজার টাকা। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্যক্তি মালিকাধীন মাত্র ৫৯ শতাংশ জমিতে অবস্থিত এ গ্রামটিতে গড়ে উঠেছে মাত্র একটি সেমি পাকা ঘর। বাকি সব ঘরগুলোই তোলা হয়েছে টিনের ঝুপড়ি দিয়ে। ৫৯ শতাংশ জমির গ্রামটিতে এতগুলো পরিবার বসবাসের ফলে তাদের এক একটি পরিবার এক বা আধা শতাংশ জমির মালিক। আবার অনেকেই আছেন ভূমিহীন। নেই তাদের কোনো আবাদী জমি। এদের বেশিরভাগ ঘরেই নেই থাকার মতো খাট বা চৌকি। 

সরকারিভাবে স্যানেটারি পায়খানা তৈরির রিং পাট আর স্ল্যাব বসানো হলেও সেগুলোতে টিনের বেড়া দেয়ার সাধ্যও হয়নি হতদরিদ্র এই পরিবারগুলোর। এ কারণে পলিথিন বা সিমেন্টের কাগজ দিয়ে ঘিরেই কোনো রকমে চলছে এর ব্যবহার। এর মধ্যেই চলছে গ্রামটিতে বসবাসরত শিশুদের খেলাধুলা, বৃদ্ধসহ পরিবারের সববয়সী নারী পুরুষের চলাচল। একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা প্রদ্ধতি মেনে চলার চরম অসচেতনতায় গ্রামটির প্রতিটি পরিবারেই বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য সংখ্যা। এছাড়াও ওই গ্রামের বরকত আলীর স্ত্রী খুশিরন প্রধানমন্ত্রীর দেয়া একটি ঘর পেলেও তারও নেই স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানার ব্যবস্থা।

বায়ানপাড়া গ্রামের চার সন্তানের জনক ও বয়োজ্যেষ্ঠ করনেট বাঁশি বাদক দরাজ আলী জানান, ‘আমাগো জাতিগত ব্যবসা এই ঢোল ব্যবসা। পূর্বপুরুষ থেকে আমাগো এই ব্যবসা চৈইলা আসছে। ব্যবসা বাণিজ্য নাই, তাই খুব অভাবে আছি। বছরের ছয় মাস চলে আমাগো এই ব্যবসা। যখন কাম থাকেনা তহন আমরা রিকশা বাই, কেউ কেউ আবার হাটে বাজারে ইঁদুর, তেলাপোকা, পিঁপড়া মারার ওষুধ বিক্রি কৈইরা চলে।’

বাঁশি বাদক জোয়াদ আলী, শফিকুল ইসলাম ও আহাম্মদ আলী ভান্ডারিবলেন, ‘অন্য কোনো কাম জানা নাই বৈইলা কোনো রকমে এ পেশা দিয়াই বাইচা আছি। আমরা নাটক, যাত্রা, বাউলগান, হিন্দু বিয়ে, অন্নপ্রাশন, পূঁজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ওরস, র‌্যালিসহ বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থাকেন তার। তবে দেশে এখন বিদেশি বাদ্যযন্ত্র আইসা পড়ায় আমাগো চাহিদা কৈইমা গেছে। এ কাম কৈইরা এখন কোনো রকমে চলতাছে আমাগো পেট।’ 

এ সম্প্রদায়ের দরিদ্র মানুষগুলো ছালা দিয়ে ঘেরা পায়খানা ব্যবহার করতেছে

চার সন্তানের জনক হযরত আলী বলেন, ‘আমাগো পূর্বপুরুষের ব্যবসা এই ব্যান্ডপার্টি। এ ব্যবসার উপরই আমাগো সংসার চলতাছে। এখন ডিজিটাল সব যন্ত্রপাতি আইসা পড়ায় আমাগো ব্যবসা কৈইমা গেছে। এ ব্যবসা ছাড়া আমাগো কোনো অর্থ সম্পদ নাই। বছরের ছয় মাস যখন কাম না থাকে পেটে ভাতে বেঁচে থাকার তাগিদে দিনমজুরের কাম করাসহ রিকশা চালাই।’

আপন ঢুলি বলেন, ‘আমরা খুবই দরিদ্র এ কারণে ছালা দিয়া ঘিরা পায়খানা ব্যবহার করতাছি। চেয়ারম্যান-মেম্বাররে জানাইয়া কোনো কাম হয় নাই।’

ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড ও বায়ানপাড়া গ্রামের ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, প্রায় ৩০০ বছর ধরে এ গ্রামে এই বায়ান সম্প্রদায়ের বসবাস। আধুনিক সব প্রযুক্তি আসায় এ ব্যবসায় প্রায় ধস নেমে গেছে। ব্যবসা খারাপ হওয়ায় এ পরিবারগুলোর অনেকেই এখন হাটে বাজারে মশা, মাছি ও ইঁদুরের ওষুধ বিক্রি কৈইরা পেট চালাইতাছে। এ গ্রামে বসবাসরত পরিবারগুলোর অধিকাংশেরই কারো আদা শতাংশ জমি, কারো এক পোয়া শতাংশ জমি, কারো তিন পোয়া শতাংশ জমি, কারো এক শতাংশ জমি রয়েছে। আবার অনেকেই আছেন একদম ভূমিহীন।

 

তিনি আরো জানান, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পায়খানা নির্মাণ বাবদ তাদের বেশিরভাগ পরিবারকে রিং পাট ও স্ল্যাব দেয়া হয়েছে। পায়খানা নির্মাণে কোনো টিনের বেড়া দেয়ার বরাদ্দ নেই।  

দিগর ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ (মামুন) বলেন, বায়ানপাড়ার অধিকাংশ পরিবারকে পায়খানা নির্মাণে রিং পাট ও স্ল্যাব দেয়া হয়েছে। প্রতি বছরই বন্যায় ওই গ্রামটি তলিয়ে যেত বলে মাটি ফেলে বায়ানপাড়ায় যাতায়াতের রাস্তাও করে দেয়া হয়। তবে বন্যায় ওই রাস্তাটির অনেকটাই ক্ষতি হয়েছে। এরপরও এলজিএসপির বরাদ্দ থেকে গ্রামটির রাস্তা রক্ষায় গাইডওয়াল নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। 

 পায়খানা নির্মাণে কোনো টিনের বেড়া দেয়ার বরাদ্দ নেই।

এছাড়াও গ্রামটির পানি নিস্কাশনের জন্য প্রায় দশ বিঘা জমির নিচ দিয়ে পাইপ বসিয়ে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। তবে সেটি কিছুদিন পানি চলাচল করার ফলে ও ময়লা ঢুকে বন্ধ হয়ে গেছে। পুনরায় সেটি সংস্কারের চিন্তা ভাবনা করতেছি। 

তিনি জানান, পায়খানা নির্মাণে সরকারিভাবে দেয়া রিং পাট ও স্ল্যাব দেয়ার পরও যদি কেউ বেড়া দিতে না পারেন তাহলে তিনি ব্যক্তি উদ্যোগে পায়খানার বেড়া দেয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, জমি আছে ঘর নেই প্রকল্পে বিনামূল্যে ঘর ও পায়খানা নির্মাণ করে দেয়ার বিধান রয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে আসা ওই প্রকল্পের কাজে কেন বায়ানপাড়ার খুশিরন নামের বিধবা ওই নারীকে টিনের ঘর নির্মাণ করে দেয়া হলেও পায়খানা নির্মাণ করা হয়নি বিষয়টি দেখছি। 

তিনি আরো জানান, এ প্রকল্পে উপজেলায় যে কয়টি ঘর দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে ১৬-১৭ জন পায়খানা আছে তাই পায়খানা নিবেন বলে লিখিত দেন। এ কারণে তাদের ওই পায়খানা নির্মাণ ব্যয়টি সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার জন্য রাখা হয়েছে।

এ সম্প্রদায়ের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন এই বাদ্যযন্ত্র।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. সাইফুর রহমান খান বলেন, পরিবার পরিকল্পনা প্রদ্ধতি মেনে চলার বিষয়টি দেখেন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আর স্যানিটেশনের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের। 

তিনি জানান, এ ধরণের সমস্যায় শুধু ওই গ্রামের শিশুরাই নয়, আশপাশের বিভিন্ন বয়সীরাই স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। নিশ্চয় দায়িত্বরত বিভাগগুলো বিষয়গুলো দায়িত্বের সঙ্গে দেখবেন।

এছাড়াও ওই ইউনিয়নে স্বাস্থ্য বিভাগের কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। তিনি ওই গ্রামের শিশুরা ঠিক মতো ভ্যাকসিন পাচ্ছে কিনা সে বিষয়টি দেখাসহ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ দিবেন বলেও জানান তিনি।  

এ প্রসঙ্গে ঘাটাইলের ইউএনও অঞ্জন কুমার সরকার জানান, সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যেই ঢুলি সম্প্রদায়ের বসবাসরত বায়ানপাড়া গ্রামটি পরিদর্শন করা হবে। তাদের কি দরকার সেটি নির্ণয় করাসহ স্যানিটেশন সমস্যা সমাধান এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য সাধ্যমতো সহযোগিতা করারও উদ্যোগ রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টুনির আওতায় আসা বিভিন্ন প্রকল্পে তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে