প্রাণ ফিরছে কুমিল্লা বিসিকে

ঢাকা, শনিবার   ১০ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ২৮ ১৪২৭,   ২৬ শা'বান ১৪৪২

প্রাণ ফিরছে কুমিল্লা বিসিকে

কুমিল্লা প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪২ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

বিসিক এলাকায় ব্যস্ত শ্রমিকরা

বিসিক এলাকায় ব্যস্ত শ্রমিকরা

করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে কুমিল্লায় বন্ধ হতে থাকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায় ধস নামায় শ্রমিকদের বেতন দিতে হিমশিম খাওয়ায় তারা ব্যবসা বন্ধ করে দেন। ১৩০টি সচল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৮টিই বন্ধ হয়ে যায়। তবে বর্তমানে কুমিল্লা বিসিকের ১৩০টি সচল প্রতিষ্ঠানে পুনরায় উৎপাদন শুরু হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সংকট কাটাতে ২০ হাজার কোটি টাকার শিল্প ঋণের প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। কম সুদে দেয়া ওই ঋণের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২০০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে কুমিল্লা জেলা। চট্টগ্রাম বিভাগে চট্টগ্রামের পর এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ওই ঋণ কার্যক্রম কমিটিতে কুমিল্লা বিসিককে রাখা হয়েছে।

ওই ঋণের বাইরে সম্প্রতি কুমিল্লা বিসিকের জন্য ১০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দিচ্ছে সরকার, যা কুমিল্লা বিসিক কর্তৃপক্ষ সরাসরি বণ্টন করবে। ব্যাংকের সঙ্গে লিঁয়াজো করে তারা এ ঋণ সহায়তা দেবেন। সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়া, বড় ঋণ সহায়তার আশ্বাস এবং করোনা পরিস্থিতির উন্নয়ন হওয়ায় পুনরায় সচল হয়েছে এসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান।

মেসার্স আক্তার ট্রেডার্সের মালিক আক্তার হোসেন বলেন, খুব সহজে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্য বিসিক কর্তৃপক্ষ সহায়তা করছে। তাই প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে সমস্যা হচ্ছে না।

আশেক ফুড অ্যান্ড মিলিং ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপক শরীফুল ইসলাম বলেন, করোনার সময়ে আমাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়নি। বিসিক কর্তৃপক্ষ নিয়মিত মনিটরিং করেছে।

১৯৬০-১৯৬১ সালে ৫৪ দশমিক ৩৫ একর এলাকায় স্থাপিত হয় কুমিল্লা বিসিক অঞ্চল। এতে ব্যয় হয় ৮৪ দশমিক ১৮ লাখ টাকা। এখানে মোট প্লট সংখ্যা ১৫৫টি। ছয়টি প্লটের মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক ভবন ও  ওয়াটার ট্যাংক। বাকি ১৪৯টি শিল্প প্লটে ১৪২টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠান রুগ্ণর তালিকায়, একটি নির্মাণাধীন। তিনটিতে রয়েছে মামলা জটিলতা। সচল থাকা ১৩০টি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজ করছেন সাত হাজার ৭১৪ জন। এর মধ্যে তিন হাজার ৯৪৩ জন পুরুষ ও  তিন হাজার ৭১১ জন নারী রয়েছেন। দেশের আটটি পুরনো বিসিকের মধ্যে কুমিল্লা একটি। এ,বি,সি,ডি ও এস ক্যাটাগরির প্লট বরাদ্দ রয়েছে। বিসিকে রয়েছে সর্বনিম্ন ৩ হাজার ও সর্বোচ্চ ২৫ হাজার বর্গফুটের প্লট। প্রতি বর্গফুট ৬৫৬ টাকা করে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয় জেলা প্রশাসন।

কুমিল্লা বিসিকে রয়েছে একাধিক স্টিল মিল, বেকারি, আয়ুর্বেদিক তৈরির কারখানা, আটা ও পাটজাত পণ্য তৈরির কারখানা, অ্যালুমিনিয়াম, সিলভার ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কারখানা এবং কয়েকটি টেক্সটাইল।

কুমিল্লা বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রোকন উদ্দিন বলেন, বন্ধ থাকা রুগ্ণ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু হলে এবং বিসিকের জন্য বরাদ্দ ঋণ কার্যক্রম দ্রুত শুরু করে দিতে পারলে কুমিল্লা বিসিকে সর্বসাকুল্যে ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এটি বিশাল ব্যাপার।

তিনি আরো বলেন, যে ১০০ কোটি টাকা বিসিক কর্তৃপক্ষ সরাসরি বিতরণ করবে, তা অল্প সময়ের মধ্যে শুরু করা যাবে। কার্যকরী কমিটির মিটিংয়ের পর রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরো কমে আসবে। সুতরাং খুব সহসাই বিসিক কুমিল্লার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।

এদিকে বিসিকে ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ যারা নিয়েছেন, তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ দেয়া হচ্ছে। দুই থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত এ ঋণ সহায়তা দেয়া হবে। কুমিল্লা বিসিকের সুপারিশের ভিত্তিতে এ ঋণ দেয় কর্মসংস্থান ব্যাংক। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে এ ঋণ সহায়তা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মসংস্থান ব্যাংক কুমিল্লা শাখার ব্যবস্থাপক খায়রুল আলম কবির।

তিনি বলেন, ২০২০ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু যুব ঋণ দেয়া শুরু হয়েছে। প্রশিক্ষণ নেয়া ১৮-৩৫ বছর বয়সীরা শর্তসাপেক্ষে ঋণ নিতে পারবেন। শুরুতে আমরা দুই লাখ টাকা দিয়ে থাকি। শর্ত ঠিকভাবে পূরণ করতে পারলে ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হয়।

কুমিল্লা বিসিক থেকে এ পর্যন্ত ৩৬২ জন ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কুমিল্লা বিসিকের সুপারিশের প্রেক্ষিতে প্রশিক্ষণ নেয়া ব্যক্তিরা পাচ্ছেন কর্মসংস্থান ব্যাংকের ঋণ। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ৩৩২ জন। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে ৬ মাস মেয়াদি কম্পিউটার অ্যান্ড গ্রাফিক্স ডিজাইনিং কোর্স; যেখানে ফি দিতে হয় এক হাজার ২৫টাকা, ৪ মাস মেয়াদি ইলেকট্রিক অ্যান্ড হাউস ওয়্যারিং কোর্স; যেখানে ফি ৬২৫ এবং ৩ মাস মেয়াদি ফ্যাশন ডিজাইন ও ফুড; ফি দিতে হয় ৫২৫ টাকা। পাশাপাশি ৫০ টাকা খরচে পাঁচদিনের উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে বিসিক কর্তৃপক্ষ।

১৯৬০-১৯৬১ সালে পুরনো কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠাতে কুমিল্লা বিসিকের আয়তন বাড়েনি। দ্রুত নগরায়ণের ফলে আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য বহুতল ভবন। ভবিষ্যতে আয়তন বাড়ানোর চিন্তা আপাতত বিসিককে বাদ দিতে হয়েছে।

এদিকে সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে গড়ে উঠলেও কুমিল্লা বিসিক একটি স্বতন্ত্র শিল্পাঞ্চল। এ কারণে বিসিকের উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না সিটি কর্পোরেশন। বরং বিসিকের পরিবেশ ক্ষতি করছে সিটি কর্পোরেশনের বাসিন্দারা। এখানে পরিবেশ দূষণের নিয়ম না থাকলেও মোট চারটি ডাস্টবিন থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে নিয়মিত। এসব ডাস্টবিন পরিষ্কারে কারো কোনো উদ্যোগ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক। ভারী বর্ষায় বিসিকের দক্ষিণাঞ্চল প্লাবিত হয়। এতে যান চলাচল ও শ্রমিকদের যাতায়াতে মারাত্মক দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়।

কুমিল্লা বিসিকের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রোকন উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণের সমস্যাটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসনে ছয় কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ হয়েছে। কাজ শুরু হলে জলাবদ্ধতা কমে আসবে। তবে নগরায়ণ যেভাবে হয়েছে, আমরা চাইলেও পানিগুলো বের করে দিতে পারবো না। কারণ, বিসিকের বাইরে অশোকতলা ও ধর্মপুর এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে কয়েকটি হাউজিং গড়ে উঠেছে। সেখানে পানি বাধাপ্রাপ্ত হবে। পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে সিটি কর্পোরেশনকে সহায়তার অনুরোধ করেছি। আমরা সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে বিসিকের সমস্যা সমাধান করতে পারবো।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, আমার জানামতে বিসিক এলাকায় একটি ডাস্টবিন রয়েছে। এটি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। অন্য কোথাও ডাস্টবিন থাকার বিষয়টি কেউ আমাকে জানাননি। জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা ব্যাপক কাজ করছি। বিসিকের পানি ধর্মপুর তোহা হাউজিংয়ে এসে আটকা পড়ে। মে মাস পর্যন্ত আমরা ড্রেনের কাজ চালিয়ে যাব। আশা করি এবার কোনো জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর