মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র যখন টর্চার সেল

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১,   ফাল্গুন ১৩ ১৪২৭,   ১২ রজব ১৪৪২

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র যখন টর্চার সেল

রংপুর প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৭ ২৭ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৬:৪২ ২৭ জানুয়ারি ২০২১

রংপুর নগরীর প্রধান মাদকাসক্তি নিরাময় ও চিকিৎসা কেন্দ্র

রংপুর নগরীর প্রধান মাদকাসক্তি নিরাময় ও চিকিৎসা কেন্দ্র

রংপুর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে নেই অভিজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণ। চিকিৎসার নামে সেখানে মাদকাসক্তদের ওপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

সম্প্রতি এমন একটি টর্চার সেলের সন্ধান মিলেছে নগরীর মেডিকেল পূর্ব গেট এলাকায়। নাম প্রধান মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। মঙ্গলবার মধ্যরাতে সেখানে হঠাৎ পাওয়া যায় কান্নার আওয়াজ। বিষয়টি টের পেয়ে সেখানে হাজির হয় স্থানীয়রা। কিন্তু তাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি নিরাময় কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে ও পুলিশে খবর দেয়া হলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে নিজেদের ওপর চলা নির্যাতনের ক্ষত দেখিয়ে উদ্ধারের আকুতি জানান সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীরা।

এক রোগী জানান, কেন্দ্রের ইনচার্জ আকিল ও মোহন মিলে তাদেরকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করে। ইলেকট্রিক শক দেয়া ছাড়াও বিবস্ত্র করে শরীরের বিভিন্ন অংশে মরিচের গুড়া লাগিয়ে দেয়া হয়। তিন বেলা ঠিকমতো খাবার দেয়া হয় না। শীতের মধ্যে তিনটা রুমে একসঙ্গে ৩০-৩৫ জনকে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়। কখনো কখনো রাতের বেলা দাঁড় করিয়ে রাখা হয় রোগীদের। কথায় কথায় মারধর আর ঘুমের ওষুধ খাওয়াানোই এখানকার চিকিৎসা পদ্ধতি।

তিনি আরো জানান, আসক্তির কারণে অস্থির হয়ে উঠলে কর্মীরা তাদের লাঠি দিয়ে পেটায়। গোপনাঙ্গে মেরে জখম করে দেয়। কিল ঘুষি তো আছেই। মাঝেমধ্যে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সবাই চিৎকার করে। কিন্তু কেউ তাদের বাঁচাতে আসে না। সবাই মনে করে এখানে চিকিৎসা হচ্ছে।

প্রধান মাদকাসক্তি নিরাময়  কেন্দ্র থেকে উদ্ধার হওয়া রোগীরা

স্থানীয়রা জানায়, প্রধান মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নামে ওই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার নামে প্রতিদিনই রোগীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হয় মোটা অংকের টাকা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সীমাহীন অনিয়ম, চরম অব্যবস্থাপনার প্রমাণ মেলে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসার বাহানা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই সেখানে মাদক সেবন করে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও পুলিশ হাজির হওয়ার আগেই নামসর্বস্ব ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক আদিব বসুনিয়া, ইনচার্জ আকিল, কর্মচারী মোহনসহ অন্যরা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে রাতেই সেখানে হাজির হন রোগীদের স্বজনরা। তারা অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সাব ইন্সপেক্টর তাহেদুল আলম সোহাগ বলেন, আমরা এখানে রোগীদের ওপর নির্যাতনের সত্যতা পেয়েছি। এখানকার খাবারের মান খুবই খারাপ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বেশকিছু অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করেছি। ১০ জন রোগীর চিকিৎসার অনুমতি থাকলেও এখানে আছে প্রায় ৪০ জন। প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স থাকলেও তা নবায়ন করা হয়নি।

রংপুর জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, আমরা রোগীদের ওপর নির্যাতনের আলামত পেয়েছি। সব রোগীর শরীরে জখম রয়েছে। সব রোগীকে তাদের স্বজন ও অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বুধবার দুপুরে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।

রংপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শহিদুল্লাহ কায়সার জানান, ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর