২৬২ বছরের ঐতিহ্যবাহী হুম গুটি খেলায় জনসমুদ্র

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ মার্চ ২০২১,   ফাল্গুন ১৭ ১৪২৭,   ১৭ রজব ১৪৪২

২৬২ বছরের ঐতিহ্যবাহী হুম গুটি খেলায় জনসমুদ্র

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:২৩ ১৫ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৮:৩৪ ১৫ জানুয়ারি ২০২১

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

হাজার হাজার খেলোয়াড় ১ মণ ওজনের গুটি টানাহেঁচড়া করে। একপর্যায়ে সেটি জনসমুদ্রে হারিয়ে যায়। গুটিটি আর চোখে পড়ে না। শুধু মানুষ আর মানুষের ভিড় দেখা যায়। এ কারণে খেলাটির নামকরণ হয়েছে হুম গুটি। 

ময়মনসিংহের ফুলাবাড়িয়া উপজেলায় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী হুম গুটি খেলা। ২৬২ বছরের ঐতিহ্যবাহী হুম গুটি খেলায় জনসমুদ্রে রুপ নেয়। ২৬২তম আসরের এই খেলায় বিজয়ী দল পুব্বা (পূর্ব এলাকার মানুষজন)। 

হোম গুটি খেলায় ত্রিশালের একমাত্র দল কাটাখালী (পূর্ব) দল (ওরফে পুব্বা) কাটাখালী দল বিজয়ী হওয়ায় উচ্ছ্বসিত ত্রিশালবাসী। 

ফুলবাড়ীয়ার লক্ষীপুরের ঐতিহ্যবাহী হুম’গুটি এখন ত্রিশালের ধানীখোলা কাটাখালীতে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ৪ নম্বর বালিয়ান ইউপির তেলীগ্রামের বরইআটার বিশাল এলাকাজুড়ে ধানখেতে এ খেলা হয়। 

ধানকাটা শেষে বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ফাঁকা। সেখানে ১ মণ ওজনের একটি বল দখলের এই খেলায় অংশ নেয় ২০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ। খেলা চলে বিকেল ৩টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। 

স্থানীয় সূত্রমতে, প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির দিন জমিদার আমলের তালুক-পরগনার সীমানায় এই খেলা হয়। এ খেলার নেই কোনো আয়োজক, নেই পুরস্কার। তার পরও এই খেলা ঘিরে এলাকার মানুষের আবেগের অন্ত নেই। লক্ষ্মীপুর গ্রামে দিনভর বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। প্রতিবছর একই স্থানে পৌষের শেষ বিকেলে সমবেত হয় হাজার হাজার গুটি খেলোয়াড়। তাদের মুখে শোনা যায় ‘জিততই আবা দিয়া গুটি ধররে...হেইও’ স্লোগান। 

স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে জানা গেছে, মুক্তাগাছার তৎকালীন জমিদার রাজা শশীকান্তের সঙ্গে ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের হেমচন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, আর পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ করা হতো সাড়ে ৬ শতাংশে। 

কথিত আছে, একই জমিদারের ভূখন্ডে দুই নীতির তীব্র প্রতিবাদ হয়। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসায় তেলীগ্রামের বড়ইআটা এলাকায়, তালুক-পরগনার সীমানায় এ গুটি খেলার আয়োজন করা হয়। শর্ত ছিল গুটিটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক, আর পরাজিত অংশ হবে পরগনা। আজও তালুক-পরগনার জমির পরিমাপ একই ভাবে চলছে। 

১ মণ ওজনের পিতলের গুটি ঢাক- ঢোলের তালে-তালে নেচে গেয়ে তালুক-পরগনার সীমানায় আনা হয়। এরপর শুরু হয় গুটি কারা দখলে নিয়ে সেই চেষ্টা। এই খেলাকে ঘিরে লক্ষ্মীপুর, বড়ইআটা, ভাটিপাড়া বালাশ্বর, শুভরিয়া, কালীবাজাইল, চামারবাজাইল, তেলিগ্রাম, সারুটিয়া, গড়বাজাইল, বাসনা, দেওখোলা, কুকরাইল, বরুকা, আন্ধারিয়াপাড়া, দাসবাড়ী, কাতলাসেনসহ আশপাশের গ্রামে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। 

ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা পরে নতুন নতুন জামা কাপড়। শতাধিক গরু জবাই হয় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে। গুটি খেলা এক নজর দেখার জন্য দূরান্তের আত্মীয়স্বজনরা বেড়াতে আসে। এসব গ্রামের মেয়েরা নায়র আসে তাদের বাবার বাড়ি। খেলা শুরু হয় দুপুরে। কিন্তু সকাল থেকে পার্শ্ববর্তী মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, ভালুকা উপজেলা থেকে শত শত মানুষ সমবেত হয়। 

তালুক-পরগনার সীমানা লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ইআটা নতুন ব্রিজ। সেখানে এক সময় জমিদারের প্রজারা শক্তি প্রদর্শনের এই খেলায় মেতেছিল। আজও তাই করা হয়। হাজার হাজার খেলোয়াড় ১ মণ ওজনের গুটি টানাহেঁচড়া করে। একপর্যায়ে সেটি জনসমুদ্রে হারিয়ে যায়। গুটিটি আর চোখে পড়ে না। শুধু মানুষ আর মানুষের ভিড় দেখা যায়। এ কারণে খেলাটির নামকরণ হয়েছে হুম গুটি। 

স্থানীয়রা জানান, অন্তত ২৬২ বছর আগে থেকে চলে আসছে এই খেলা। এই খেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের সব গ্রামে উৎসব হয়। 

তিনি বলেন, ছোটবেলা থাইক্যাই এই খেলা দেখে আসতাছি। আমার মনে অয়, এই খেলা আমরার আবেগের জায়গা। মজার ঘটনা, এত এত মানুষ আসে। কাড়াকাড়ি করে। কিন্তু এই নিয়ে মারামারি অয় না। বরং সব ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া শক্তিপরীক্ষায় অংশ লই। খুব মজা হয়।’ 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে