যেভাবে অনুশোচনার বেড়াজালে আটকা পড়েন জঙ্গি শাওন

ঢাকা, রোববার   ১৭ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৩ ১৪২৭,   ০২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

যেভাবে অনুশোচনার বেড়াজালে আটকা পড়েন জঙ্গি শাওন

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৪৩ ১৪ জানুয়ারি ২০২১  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত। ছাত্র থাকাকালীন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মেধাবী এই তরুণ। অবশেষে জীবনের বড় ভুল বুঝতে পেরে স্বাভাবিক জীবনের জন্য র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। আর আত্মসমর্পণ করেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া থেকে শুরু করে দুঃসহ যন্ত্রণার কথা জানিয়েছেন শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত।

জঙ্গিবাদ থেকে ফেরা মেধাবী তরুণ শাওন মুনতাহা বলেন, ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায় আমি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মীয় বিভিন্ন পোস্ট দেখে আকৃষ্ট হই। ওই সময় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি।  ২০০৯ সালে জঙ্গি সংগঠনটির দাওয়াতি শাখায় কাজ শুরু করি। পরবর্তীতে হিযবুত তাহরীরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় শীর্ষ পর্যায়ে চলে আসি। তবে ২০০৯ সালে আনসার আল ইসলামে যোগ দেই। পরে ২০১১ সালে মেডিকেল শিক্ষার্থী ডা. নুসরাতকে বিয়ে করি, যিনি নিজেও জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আমি সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকি। এক পর্যায়ে আমি আমার কয়েকজন বন্ধুকে মোটিভেট করতে সক্ষম হই। তবে এখন পর্যন্ত আমি নিজে কখনও কোনো ধরণের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হইনি।

তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে সংগঠনের নির্দেশনায় ২০১৭ সাল থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরালো অভিযানে গ্রেফতার আতঙ্কে ঢাকাতে বিভিন্ন জায়গায় বাসা বদল করি। এক পর্যায়ে ঢাকার আশেপাশের এলাকায় বসবাস শুরু করি। আমার দায়িত্বশীলের নির্দেশনায় দাওয়াতি শাখা থেকে বিচ্ছিন্ন হই এবং জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষণের ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে নিয়োজিত হই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে আমি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারছিলাম না। এরপর আমি বাধ্য হয়ে নিজেকে জঙ্গি সংগঠন থেকে বের করার চেষ্টা করি। এ সময় আমি ও আমার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগতে শুরু করি। 

শাওন বলেন, আমি যখন হিজরতে (এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়া) ছিলাম তখন আমার এবং পরিবারের ওপর অনেক দুর্ভোগ নেমে আসে। তখন পুরো সমাজ থেকেই আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আমার স্ত্রী একজন চিকিৎসক। কিন্তু জঙ্গিবাদে জড়ানোর কারণে তার জীবনে চরম গ্লানি নেমে আসে। আমার সন্তানের জীবনেও অন্ধকারের কালোছায়া নেমে আসে। এক কথায় আমাদের নিজের কোনো সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু ছিল না। 

তিনি আরো বলেন, অনেক সময় গ্রেফতারের ভয়ে মসজিদে গিয়ে ঠিক মতো নামাজ পড়তে পারতাম না। ঘরেই নামাজ আদায় করতে হতো। এসবের পর একটা সময় আমি আমার ভুল বুঝতে পারি। আমি ধর্মীয় অপ ব্যাখ্যার শিকার হয়েছিলাম তা বুঝতে পারি। তখন নিজেই অনুশোচনার বেড়াজালে আটকা পড়ে যাই। তখন আমার ভেতরে নতুন বোধ উদয় হয়। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। পরিবার বন্ধুদের নিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখি। 

এরপরও আমি ভয় পেয়ে যাই। তারপর পরিবারের মাধ্যমে র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করি। শুরুতে কিছুটা দ্বিধার মধ্যে থাকলেও র‌্যাব ভয়-ভীতি, দ্বিধা সব দূর করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। র‌্যাব আমাকে ও আমার পরিবারকে স্বাভাবিক জীবনে আসার জন্য সাহস দেয়। আমি র‌্যাবের কাছে কৃতজ্ঞ।

শাওনের দাবি, তিনি এক নতুন জীবন পেয়েছেন। শাওন বলেন, বাংলাদেশ সরকারের জঙ্গি পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে আমি নিজেকে আবার ফিরে পাচ্ছি। আমাদের আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেয়া ও আমার কাছে আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই।

সবার উদ্দেশ্যে আমি একটি কথা বলতে চাই- আমি যে পথে হেঁটেছি, তা ভুল পথ। তরবারির ঝনঝনানি আগেরকার যুগের কথা। এখন জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগ। শিক্ষার যুগ। মননশীলতা, চিন্তা সৃষ্টিশীলতার যুগ। ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবী গড়ে তোলার যুগ। আমরা কেউ যেন ইসলাম নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা প্রভাবিত না হই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। আসুন আমরা ইসলাম অনুসরণ করি, একটা সত্য সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলি। সবাইকে ধন্যবাদ।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/এমকেএ