সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে শুত্রু সূর্য, কালোযাদু আশীর্বাদ

ঢাকা, শুক্রবার   ২২ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৯ ১৪২৭,   ০৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গদের কাছে শুত্রু সূর্য, কালোযাদু আশীর্বাদ

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩৪ ১৪ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৮:২৫ ১৪ জানুয়ারি ২০২১

সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গ

সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গ

সাদা ধবধবে গায়ের রং, চোখের পাপড়ি এমনকি চুলও সাদা, তারা পিটপিট করে তাকায়, কেউ বা হাতে সাদাছড়ি নিয়ে চলে। কখনো কখনো এ ধরনের ব্যতিক্রমী মানুষ হয়ত আপনাদের কারো চোখেও পড়েছে। বাস্তবে এটি একটি রোগ। রোগের নাম আলবিনিজম। এই রোগে আক্রান্তদের বলে আলবিনো। এই রোগের দরুন দেহে মেলানিন নামক এক ধরনের রঞ্জক তৈরি ব্যহত হয়। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন এরা, প্রতি ১৭ হাজারে থেকে ২০ হাজার জনের মধ্যে একজন। তবে আফ্রিকায় এই হার পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার জনের মধ্যে একজন। আফ্রিকান আলবিনোরাই সম্পর্কে  আজ জানাবো, 'সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গ'। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে যে মেলানিন আমাদের সুরক্ষা দেয়, যে অতিবেগুনি রশ্মিকে ধরা হয় জীবনঘাতী ক্যান্সারের অন্যতম কারণ, সেই মেলানিনই প্রায় অনুপস্থিত আলবিনোদের দেহে।

সাদা চামড়ার `কৃষ্ণাঙ্গ` পরিবার দেড় ডলারের কমে যেখানে ৮০ ভাগ আফ্রিকান দিন গুজরান হয়। সেখানে ইউরোপিয়ান আলবিনোদের মতো ১০ থেকে ১৫ ডলারের সানস্ক্রিন ক্রিম মেখে বাইরে বেরোনোর সৌভাগ্য এদের হয় না। ৯০ শতাংশ আফ্রিকান আলবিনো ৪০ বছরের বেশি বাঁচে না। সারা পৃথিবীতে আলবিনোদের শত্রু সূর্য। তবে আফ্রিকার আলবিনোদের অতিরিক্ত একটি শত্রু রয়েছে শিকারি। 

আলবিনোরা এই শিকারিদের কাছে প্রাণ না হারাবার প্রার্থনাতে তটস্থ থাকেন। নিশ্চয়ই ভাবছেন মানুষ শিকার করে, এমন শিকারিও হয় নাকি? হ্যাঁ, হয়। গন্ডারের শিং, হাতির দাঁত, তক্ষকের চামড়া ইত্যাদির মতো আলবিনোদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও নিষিদ্ধ বাজারে বিকোয়। তাই বনে যেমন পশু শিকার হয়, তেমনি বাসা বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বা চলার পথে দিনে-দুপুরে তুলে নিয়ে গিয়ে শিকার করা হয় আলবিনোদের।

আফ্রিকান কালোজাদুকরদের হাতে ক্বচিৎ আলবিনোর দেহাংশও `শোভা` পায়কুসংস্কারাবিষ্ট আফ্রিকায় এখনো মানুষ অর্থবিত্ত, ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কিংবা মনের মানুষকে বশে আনতে এই   উপায় অবলম্বন করে কালোজাদুকেই। তানজানিয়া, মালাউই, মোজাম্বিকসহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে কালোজাদু ও ডাকিনীবিদ্যা চর্চার একটি অনুষঙ্গ হচ্ছে আলবিনোদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কালোজাদুকর ও তাদের অনুসারীদের বিশ্বাস, আলবিনোদের কাটা অঙ্গে কিছু ভেষজ লাগিয়ে মন্ত্র পড়লেই পূরণ হবে মনের ইচ্ছা। 

শুধু তাই নয়, এইডসের মতো রোগও সেরে যাবে, এই আশায় কবর থেকে আলবিনোদের লাশ তুলে কাজে লাগানো হয় কালোজাদুতে। তানজানিয়ায় আলবিনোদের ডাকা হয় 'দিলি', ভাবার্থ যার 'টাকা-পয়সা'। কেন এই নাম? হিসেবটা সহজ। যে জিনিস দিয়ে কালোজাদু করলে বড়লোক হওয়া যায়, তার পেছনে স্বাভাবিকভাবেই কোটি টাকার বাণিজ্যও হয়। আলবিনোদের দেহের প্রমাণ সাইজের ছোট এক টুকরোর দামই ১০ থেকে ২০ হাজার ডলার।

সেখানকার এক প্রতিবন্ধী শিশু বড় একটি অঙ্গ প্রায় ৭৫ হাজার ডলার সমান। কী বীভৎস! কালোজাদুকরদের কাছে প্রত্যাদেশিত হয়ে অনেকে ভাড়াটে শিকারি দিয়ে হত্যা বা অঙ্গহানির কাজটি করান। আবার অনেক শিকারি নিজ থেকেই শিকার করে জাদুকরদের বাজারে কোটি টাকায় আলবিনোদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দারিদ্র‍্যক্লিষ্ট কিছু দিশেহারা মা-বাবাও নিজ সন্তানকে শিকারির কাছে বিক্রি করেন, এমন প্রমাণও আছে।

আফ্রিকায় আলবিনোদের সবচেয়ে বড় নরক হলো তানজানিয়া।কারণ দেশটির প্রতি ১৪০০ জনেই একজন আলবিনো! ওদিকে দেশটির ৬০ ভাগ মানুষ কালোজাদুতে বিশ্বাসী। দেশটির কতিপয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, খনি মালিক, জেলে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল হতে দ্বারস্থ হন কালোজাদুকরদের। রাজনীতিবিদরাও নির্বাচনের সময় এলে এই তালিকায় নাম লেখান। আর গবেষণামতে নির্বাচনের সময়েই আলবিনোদের ওপর আক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়।

সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গদের বন্দী জীবন তানজানিয়ানদের গড় আয় যেখানে মাসিক দেড় লাখ তানজানিয়ান শিলিং, সেখানে আলবিনোদের একটি ক্ষুদ্র দেহাংশের দাম দুই কোটি তানজানিয়ান শিলিং। জাতিসংঘের হিসেব মতে ১৮ বছরে তানজানিয়ায় ৮০ জন আলবিনোকে হত্যা করা হয়েছে। তবে এই কথা বলবার অপেক্ষা রাখে না যে, দুর্গম আফ্রিকার অপরাধের কৃষ্ণগহ্বর থেকে সবটুকু তথ্য পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। 
 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে/মাহাদী