ফেরারি জীবনের দুর্বিষহ বর্ণনা দিলেন আত্মসমর্পণ করা জঙ্গিরা

ঢাকা, শনিবার   ১৬ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ২ ১৪২৭,   ০১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ফেরারি জীবনের দুর্বিষহ বর্ণনা দিলেন আত্মসমর্পণ করা জঙ্গিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১২ ১৪ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৫:১৫ ১৪ জানুয়ারি ২০২১

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন ৯ জঙ্গি সদস্য। বৃহস্পতিবার সকালে র‌্যাব সদর দফতরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তারা আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তারা ফুল দিয়ে পরিবারের কাছে ফেরত যান।

৯ জঙ্গির মধ্যে ছয়জন জেএমবি এবং তিনজন আনসার আল ইসলামের সদস্য। এরা হলেন- সিলেটের শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত (৩৪), ডা. নুসরাত আলী জুহি (২৯), কুমিল্লার আবিদা জান্নাত আসমা ওরফে তারাদ ওরফে রামিসা (১৮), আবদুর রহমান সোহেল (২৮), চাঁদপুরের মোহাম্মদ হোসেন ওরফে হাসান গাজী (২৩), মো. সাইফুল্লাহ (৩৭), ঝিনাইদহের মো. সাইফুল ইসলাম (৩১), চুয়াডাঙ্গার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন (২৬) ও মো. সাইদুর রহমান (২২)।

র‌্যাব জানিয়েছে, এসব জঙ্গি সদস্যদের জঙ্গি বিষয়ক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছে। তাদের সংগঠনের সঙ্গীরা বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়ার কারণে তাদের পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। কিন্তু পালিয়ে বেড়ানোর জীবন সহজ নয়। আইন-শৃংখলা বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী অব্যাহত অভিযানে তারা প্রতিনিয়ত গ্রেফতার আতংকে থাকতেন। কর্মক্ষেত্রে বা আবাসিক এলাকায় নিজের নাম পরিচয় ব্যবহার করার সাহস পেতেন না। পারিবারিক অশান্তি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। সকলেই একপর্যায়ে তাদের ভুল বুঝতে পারেন। এরই একপর্যায়ে র‌্যাবের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে তারা সবাই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে র‌্যাব তাদেরকে উৎসাহী করে তোলে। বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।

র‍্যাব সদর দফতরে আয়োজিত এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ এই ব্যক্তিরা তাদের জীবন সম্পর্কে নানা দিক তুলে ধরেন।

শাওন মুনতাহা ইবনে শওকত:
সিলেটের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হিযবুত তাহরিরে যুক্ত হন তিনি। পরবর্তীতে তিনি হিযবুত তাহরিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় শীর্ষ পর্যায়ে চলে যান। তিনি ২০০৯ সালে আনসার আল ইসলামে যোগ দেন। পরে ২০১১ সালে মেডিকেল শিক্ষার্থী ডা. নুসরাতকে বিয়ে করেন। স্ত্রী নুসরাতও জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সংগঠনের নির্দেশনায় তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ২০১৭ সাল থেকে তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোড়ালো অভিযানে গ্রেফতার আতঙ্কে তিনি ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় বাসা বদল করতে থাকেন।

ডা. নুসরাত আলী জুহি:

সিলেটের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রী থাকাবস্থায় উল্লেখিত আনসার আল ইসলাম -এর সদস্য শাওনের সঙ্গে বিবাহ হয়। বিবাহটি সাংগঠনিক অনুমোদনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। মূলত স্বামী শাওন তাকে উগ্রবাদের দিকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। স্বামীর সঙ্গে সে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেন। জঙ্গিবাদে জড়িত হওয়ার কারণে ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে পরিচয় গোপন করে খন্ডকালীনভাবে চাকুরি করতে হয়েছে তাকে।

জঙ্গিবাদের অনুসারী হওয়ার কারণে শাওন ও ডা. নুসরাতকে দীর্ঘদিন ফেরারি জীবন যাপন করতে হতো। এতে তাদের দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে সৃষ্টি হয় দূরত্ব। পারিবারিক জীবনেও অশান্তির সূত্রপাত হয়। এক পর্যায়ে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারেন। ফলে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তারা র‍্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

আবিদা জান্নাত আসমা ওরফে তারাদা রামিসা:
উগ্রবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পর বাবা-মাকে না জানিয়ে ২০১৮ সালে আনসার আল ইসলামের এক সদস্যকে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে বিয়ে করেন। শুরু হয় স্বামীর সঙ্গে আত্মগোপনের জীবন। আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে থেকে ফেরারি জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। ফলে সাংগঠনিকভাবে পরিচিত স্বজনের কাছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন

মো. সাইফুল্লাহ:
মাদ্রাসায় অধ্যায়ণকালীন তার সহপাঠীর মাধ্যমে জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। তিনি মূলত দাওয়াতী কার্যক্রম ও অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তার কিছু সঙ্গী গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। ফেরারি জীবনের কারণে তার পারিবারিক জীবনে অশান্তি শুরু হয়। তিনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং এক পর্যায়ে তার ভুল বুঝতে পারেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য র‍্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং পরবর্তীতে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

মো. হোসেন:
পেশায় রাজমিস্ত্রি। ২০১২ সালে ঢাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত হন। সাইফুল্লাহ তাকে জেএমবির আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। সাইফুল্লার সঙ্গে জেএমবির সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু ফেরারী জীবনের অনিশ্চয়তায় ও পারিবারিক জীবনে অশান্তির কারণে এক পর্যায়ে তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন। পরে সাইফুল্লাহর সঙ্গে আলোচনা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য র‍্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং পরবর্তীতে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

মো. সাইফুল:
২০১৩ সালে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স পাস করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি জেএমবিতে যোগ দেন। তিনি নিজ এলাকায় ব্যাপক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালান। পরে জঙ্গি হিসেবে সে এলাকায় পরিচিতি পায়। এরই মধ্যে জঙ্গি সংগঠনের কিছু সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ায় ভয়ে আত্মগোপনে চলে যান। তাকে দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে হয়। তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয় এবং মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। এরূপ জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। তাই র‍্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং পরবর্তীতে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন:
সাইদুর রহমানের (২২) সঙ্গে উগ্রবাদী ভিডিও দেখে জেএমবির আদর্শে অনুপ্রাণিত হন তিনি। নিজ এলাকার একটি বাড়িতে তারা বায়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে আত্মগোপন করেন। জঙ্গিবিরোধী অব্যাহত অভিযানে তাদের অনেক সঙ্গী আত্মগোপনে চলে যায়। ফলে সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। আত্মগোপনে থেকে তিনি উপলব্ধি করেন যে, এ জীবন কোনো সুস্থ মানুষের হতে পারে না। অবশেষে   ভুল বুঝতে পারেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে র‍্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন। 

আব্দুর রহমান সোহেল:
পেশায় একজন শিক্ষক  ছিলেন। তিনি জেএমবির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি জঙ্গি মামলাতে গ্রেফতার হন। ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় জঙ্গি সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। তবে ফের ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু তার এই ফেরারী জীবনে পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করলে মানসিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েন। ফলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে উদ্যোগী হয়ে র‍্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/টিআরএইচ/এসআর