বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন

ঢাকা, শনিবার   ২৩ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৯ ১৪২৭,   ০৮ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন

মাকসুদা ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৫৮ ১২ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৩:০০ ১২ জানুয়ারি ২০২১

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ডেইলি বাংলাদেশ’ আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় ‘খ’ বিভাগ থেকে তৃতীয় হয়েছেন মাকসুদা ইসলাম। 

আজ তার রচনাটি প্রকাশ করা হলো- 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন

সূচনা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। টুঙ্গিপাড়া মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন রাজনীতিমনস্ক। 

রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত: রাজনীতিতে তার আগ্রহ গড়ে ওঠে সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে। এই রাজনীতি অনুরাগ প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয় তৎকালীন বাংলার ইংরেজ উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির অনুষঙ্গে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের বীজমন্ত্র ‘জয় বাংলা’ তো কিশোরকালেই নজরুলের ওই কবিতায় পেয়েই বুকের গভীরে লালন করেছিলেন তিনি। ‘পূর্ণ অভিনন্দন’, কবিতাটি বিদ্রোহী কবি তার কারামুক্তি উপলক্ষে লেখেন। আর সেটাকেই পাকিস্তানি হানাদারদের বাংলা ছাড়ানোর জীবনপণ মুক্তিযুদ্ধে শতসহস্র বজ্রের শক্তিতে ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করলেন তিনি মুক্তিকামী বাঙালিকে। মূলত ১৯৩৬ সালে মাদারীপুরের স্বদেশি আন্দোলনকারী এবং ভারতের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সমর্থকদের সঙ্গেই তার রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। বঙ্গবন্ধু এই বিষয়ে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি সুভাষ বাবুর ভক্ত হতে শুরু করলাম’। 

রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রবেশ: ১৯৩৮ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ.কে. ফজলুল হক, শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং সমবায়মন্ত্রী মুকুন্দ বিহারা মল্লিক গোপালগঞ্জ সফরে আসেন। তাদের সংবর্ধনায় তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিবের একনিষ্ঠ কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করে শহীদ সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি মুসলিম ছাত্রলীগ করেন কিনা। ওই বছরই হিন্দু সহসভার সঙ্গে এক সাংঘর্ষিক ঘটনায় শেখ মুজিব সাতদিনের জন্য কারাবরণ করেন। এর কিছুদিন পরেই সোহরাওয়ার্দী পত্র লিখে আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় একাগ্র শ্রমনিষ্ঠা ও চমৎকার নেতৃত্বের জন্য শেখ মুজিবকে ধন্যবাদ জানান এবং তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। ১৯৩৯ সালে মুজিব তার সঙ্গে দেখা করেন এবং ধীরে ধীরে সোহরাওয়ার্দী তার রাজনৈতিক গুরু হয়ে ওঠেন। মুজিব ছাত্রলীগের সম্পাদক এবং মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। 

রাজনৈতিক জীবনের প্রথম ধাপ: ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করে শেখ মুজিব ওই বছরই কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে আই.এ ক্লাসে ভর্তি হন। অল্পদিনেই তিনি কলেজ হোস্টেলের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৪২ সালে মুসলিম লীগ প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহাকুমায় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্মেলনে যোগদান করেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এ সম্মেলনে এসেছিলেন। শেখ মুজিব ফরিদপুর থেকে বিরাট দল নিয়ে যোগ দেন এ সম্মেলনে। ১৯৪৩ সালের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। পার্টির নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে তিনি বাঙালি জীবনের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের মধ্যে রাতদিন রিলিফ বিতরণের কাজ করেন। 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক যুদ্ধ: ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র। শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হলেন। ১৯৪৮-৫২’র ভাষা আন্দোলন এবং শেষোক্ত আন্দোলনের ছাত্র শ্রমিক কর্মচারী আত্মবলিদানের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতিসত্ত্বার উদ্বোধন ঘটে। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি ও সংস্কৃতি চিন্তায় এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। স্বৈরশাসনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি এবং শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে নয়া রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে রাজবন্দি ছিলেন। তাকে করা হয় যুগ্ম-সম্পাদক। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য জীবন দেয় এদেশের তরুণরা। তারপর থেকে  শুরু হয় একের পর এক আন্দোলন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সাধারণ নির্বাচন। যেখানে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে, কিন্তু ক্ষমতায় ছিল মাত্র কিছুদিনের জন্যে। ১৯৬৬ সালে তিনি যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন তখন জাতীয় মুক্তি ও স্বায়ত্তশাসনের জন্য ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের  সামরিক বাহিনী বাঙালির গণতান্ত্রিক চেতনাকে নস্যাৎ ও বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলন স্তব্ধ করার জন্য বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করে। এ মামলাটিই ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে অভিহিত। 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংঘর্ষ: ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ববাংলার গণঅভ্যুত্থান ঘটলে ষড়যন্ত্রকারীরা শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিমা শাসক কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে না দিয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে শুরু করে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতারের আগেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা হান্নানকে পাঠান। পরদিন ২৬ মার্চ হান্নান চৌধুরী চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। 

মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক বঙ্গবন্ধু: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠন হয় মুজিবনগর সরকার। এই সরকার শপথ গ্রহণ করেন ১৭ এপ্রিল। মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করাই ছিল মুজিবনগর সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের হাল ধরেন শক্ত হাতে। 

বঙ্গবন্ধুর গণপরিষদ: ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ নামে একটি আদেশ জারি করেন। এই আদেশবলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচিত সদস্যগণ গণপরিষদের সদস্য বলে পরিগণিত হয়। গণপরিষদের সদস্য ছিল ৪০৩। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১০ এপ্রিল, ১৯৭২। সংবিধান প্রণয়ন করাই ছিল গণপরিষদের মূল লক্ষ্য। 

বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন: বঙ্গবন্ধু এই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে তার শাসনামলে কিছু পদক্ষেপ নেন। তিনি বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আত্মনিয়োগ করেন- 

> ভারত থেকে ফেরা শরণার্থীদের আশ্রয় ব্যবস্থা।
> মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা।
> ভারতীয় সৈন্যদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো।
> অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান অস্ত্রসমর্পণের নির্দেশ। 
>আইন-শৃঙ্খলা সমস্যার সমাধান। 
> যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন।
> বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংস্কার। 
> সংবিধান প্রণয়ন। 
> জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী পুনর্গঠন। 
> শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মসূচি। 
> জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান। 
> সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ।
> দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ। 
> আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গঠন।
> কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়ন করা। 
> সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ব্যবস্থা করা। 
> দালাল আইন প্রণয়ন করা। 
> মৌলিক অধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। 

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে কিছু স্বাধীনতাবিরোধীরা নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা ছাড়া সবাই ঘাতকদের হাতে নিহত হন। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন শেষ হয় 

উপসংহার: রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের আদর্শ। তিনি ছিলেন ভাগ্যাহত বাঙালি জাতির মুক্তির অকুতোভয় অগ্রদূত। তার বলিষ্ঠ ও সাহসের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই বলা যায়, ব্যক্তি মুজিবের মৃত্যু হলেও মুজিব আদর্শের মৃত্যু নেই। তাই তো কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হয়-  

‘‘যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, গৌরি বহমান 
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’’

ডেইলি বাংলাদেশ/AN