নিভৃত পল্লীতে কালো মুরগির বিপ্লব

ঢাকা, বুধবার   ২০ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৬ ১৪২৭,   ০৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নিভৃত পল্লীতে কালো মুরগির বিপ্লব

নরসিংদী প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৩৯ ৩ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:১৫ ৪ ডিসেম্বর ২০২০

খামারের মাঠে কালো মোরগ-মুরগির বিচরণ

খামারের মাঠে কালো মোরগ-মুরগির বিচরণ

নরসিংদীর শিবপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পশ্চিম উত্তরে মজলিশপুর গ্রাম। নিভৃত পল্লী এলাকা হিসেবেই গ্রামটি পরিচিত। এই মজলিশপুরেই কামরুল ইসলাম মাসুদ ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ৮ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন ‘লামস বার্ড এন্ড হ্যাচারী’ নামে বিভিন্ন প্রজাতির একটি মুরগির খামার। আর এই খামারের বিশেষত্ব হলো এখানে চাষ করা হচ্ছে বিরল প্রজাতির কালো মুরগি। খামারে টার্কি, তিতির, সিল্কীসহ আরো বিভিন্ন জাতের মুরগি থাকলেও মানুষের মাঝে কৌতূহল কাদাকনাথ বা এই কালো মুরগিকে ঘিরেই।

এরই মধ্যে কামরুল ইসলাম মাসুদকে অনুসরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় কালো মুরগির চাষ শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয় এর বিপণন ও বাণিজ্যিক উৎপাদন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। 

সরেজমিনে খামারে দেখা যায় কামরুল ইসলাম মাসুদের চাচাতো ভাই রায়হানুল ইসলাম খামার তদারকি করছেন। কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন মনির হোসেন, আব্দুল বাছেদ, মো. হাসিম, শামসুল ও মিঠু নামে কয়েকজন।

ঝুড়িতে ১০ দিন বয়সী কালো মুরগির বাচ্চা

রায়হানুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সালে তার ভাই কামরুল ইসলাম মাসুদ ভারত সফরে যান। সেখান থেকে তিনি কাদাকনাথ বা কালো মুরগির ৩০০টি বাচ্চা (দুই মাস বয়সী) কিনে আনেন এবং প্রতিটি বাচ্চার দাম পড়ে প্রায় দেড় হাজার টাকা। এই ৩০০টি বাচ্চা দিয়েই গড়ে তুলেন ‘লামস বার্ড এন্ড হ্যাচারী’ নামে মুরগির খামার। বর্তমানে এই খামারে বিভিন্ন জাতের ও বিভিন্ন আকৃতির প্রায় ৬ শতাধিক মুরগি রয়েছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক মুরগি নিয়মিত ডিম দিচ্ছে এবং এই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানো হচ্ছে। প্রতি মাসে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে। ১ মাস বয়সী প্রতিটি বাচ্চার মূল্য ৩০০ টাকা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক এক জোড়া মুরগির বিক্রি মূল্য ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা।

তিনি আরো জানান, কামরুল ইসলাম মাসুদ খামার দেখাশোনা করেন মাঝে মধ্যে। তিনি সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় থাকেন চট্টগ্রামে। কাজ করেন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। সেই কাজের সূত্রে ভারত সফরে যান। সফরকালীন তার এক সহকর্মীর আপ্যায়নে ভারতের চেন্নাইতে একটি রেস্টুরেন্টে প্রথম এই কালো মুরগির মাংস খান। এই মাংস খাওয়ার স্বাদ থেকেই কৌতূহলী হয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে তিনি ৩০০টি বাচ্চা ক্রয় করে দেশে আনেন। এখন পর্যায়ক্রমে তার খামার থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই কালো মুরগির বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে, বিপণন হচ্ছে এবং উৎপাদন হচ্ছে।

কামরুল ইসলাম মাসুদ মুঠোফোনে জানান, তিনি দেশের উন্নয়নে ব্যতিক্রম কিছু করতে পছন্দ এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিদেশ থেকে আনা কালো মুরগির উৎপাদন তার কর্মের একটি ব্যতিক্রম উদ্যোগ। এ উদ্যোগ গ্রহণ করে তিনি বেশ লাভবান।

কামরুল ইসলাম মাসুদের খামার

দেখতে কুচকুচে কালো। শুধু পাখনা-পশমই কালো নয়; মাংস এবং মাংসের ভেতর হাড়ের রঙও কালো। তবে, ডিমের রঙ ব্রাউন বা বাদামি। ভারতে এর নাম কাদাকনাথ। কিন্তু আমাদের দেশে স্থানীয়ভাবে ‘বিদেশি কালো মুরগি’ বা শুধু ‘কালো মুরগি’ নামেই পরিচিত।

বিরল প্রজাতির এই কালো মুরগির মাংস যারা খেয়েছেন তাদের ভাষ্যমতে, এর স্বাদ খুবই সু-স্বাদু। শুধু সু-স্বাদুই নয়, ওষধি গুণে ভরপুর। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় এই কাদাকনাথ বা কালো মুরগির মাংস মূলত ওষুধ হিসেবেই খাওয়া হয়। বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। তুলনামূলকভাবে অন্য সব জাতের মুরগি থেকে এর দাম বেশি।

বিদেশি এই মুরগি আমাদের দেশে সখের বশে কেউ এনে থাকতে পারেন। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে এর প্রথম আমদানি করেছেন কামরুল ইসলাম মাসুদ। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, শিবপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. সজল কুমার দাস বলেন, এ মুরগির বিশেষত্ব হলো এর মাংসও কালো। এছাড়া এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য মুরগির তুলনায় বেশি। বংশবৃদ্ধি ও ডিমের উৎপাদনও ভালো। একটি দেশি মুরগি বৎসরে যেখানে ডিম দেয় ৫০টি। সেখানে এই কাদাকনাথ দেয় ১০০ থেকে ১২০টি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ