আমনে রঙিন কৃষকের মাঠ

ঢাকা, বুধবার   ২০ জানুয়ারি ২০২১,   মাঘ ৭ ১৪২৭,   ০৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আমনে রঙিন কৃষকের মাঠ

নরসিংদী প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:২২ ১৮ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৯:৫১ ১৮ নভেম্বর ২০২০

আমন ধান কাটায় ব্যস্ত কৃষকরা

আমন ধান কাটায় ব্যস্ত কৃষকরা

‘ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কি দেখেছি মধুর হাসি’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতার এ অংশটুকুর বাস্তবতার পুরোপুরি দেখা মেলে যদি কৃষকের পাকা ধানক্ষেতের খুব কাছাকাছি যাওয়া যায়। বিশেষ করে এই অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে। নবান্নের আমেজ থাকতে থাকতে।

নরসিংদীর গ্রামপর্যায়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আমন ধানের সবুজ-শ্যামল দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে এখন সোনালি রঙ ধারণ করেছে। কোথাও পাকা, কোথাও আধাপাকা। মাঠজুড়ে কৃষকের আবাদ করা আমন ধানক্ষেতের এমন দৃশ্য সত্যিই মুখে হাসি ফোটানোর মতো। যেন দৃষ্টিজুড়ে রঙিন কৃষকের মাঠ। যেদিকে তাকাই, যেন দেখি শুধু অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। থোকা থোকা বাড়িঘর, মানুষের বসতি। এরই ফাঁকে ফাঁকে ধানের ক্ষেত। যে ক্ষেতে ফুটে উঠেছে কৃষকের হাসি, কৃষকের স্বপ্ন।

অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে নতুন ধান ঘরে আসে। এ সময় কৃষকের ঘরে থাকে আনন্দ। কৃষকবধূরা তৈরি করেন নতুন চালের হরেক রকম পিঠা। তৈরি হয় নবান্নের উৎসব, আমেজ।

কৃষকের ঘরে পিঠা তৈরির রেওয়াজ নতুন নয়, পুরোনো। কিন্তু এ বছর নরসিংদীর কৃষকের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। নতুন ধানের আগমন লগ্নে ভাতের অভাব ঘুচে গেলেও অনেকে খড়ের অভাব পূরণে ব্যস্ত। টানা বারো মাস কীভাবে গরুর প্রধান খাদ্য খড়ের চাহিদা মিটবে, আমন ধানের পাকা ধানক্ষেতে সেই স্বপ্নই দেখছেন নরসিংদীর অধিকাংশ কৃষক।

বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বোরো মৌসুমে অর্থাৎ বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে অতি বৃষ্টির কারণে তারা খড় শুকাতে পারেননি। যেকারণে গরুর খাদ্য চাহিদা অনুযায়ী তারা প্রয়োজনীয় খড় মজুত করতে পারেননি। 

কৃষকের ভাষায়, ‘আমরার কানির কানি ক্ষেতের খ্যাড় (খড়) মেঘে (বৃষ্টিতে) ক্ষেতেই পইচ্ছা (পচে) গেছে, বাইত (বাড়িতে) আনতে পারছি না’। এজন্যই এই শুকনো মৌসুমে অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মাসের আমন ক্ষেতের খড়ই আগামী এক বছরের জন্য মজুত করে আগামী অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ব পর্যন্ত এই খড় দিয়ে গবাদি পশু অর্থাৎ গো-খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে চাচ্ছেন। কারণ, বোরো মৌসুমের খড় সংগ্রহ করাটা হবে অনিশ্চিত। বোরো মৌসুমের ধান যখন কাটার সময় হয় তখন থাকে বর্ষা মৌসুম। ওই সময় অতি বৃষ্টির কারণে রোদে খড় শুকানোর সুযোগ হয় না। যে কারণে আমন ধানের খড়ের উপরই নির্ভরশীল হতে হচ্ছে আগামী এক বছরের খোরাক।

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার ডৌকারচর ইউনিয়নের তেলিপাড়া গ্রামের রোমান মিয়া, আবুল কালাম এবং ফারুক মিয়াসহ বেশ কয়েকজন কৃষক জানান, ধান পুরোপুরিভাবে এখনো কাটা শুরু হয়নি। কারণ, ধান পরিপূর্ণ হয়ে এখনো পাকেনি। সম্পূর্ণভাবে পাকতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে। কিন্তু এরই মধ্যে কেউ কেউ ধান কাটছেন শুধু গরুর খাদ্য সংকটের কারণে। তারা জানান, এখন যারা ধান কাটছেন তাদের ঘরে ভাতের অভাব নেই। কিন্তু অভাব রয়েছে গরুর খাদ্যের।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতেই এক বা একাধিক গাভি ও বাছুর রয়েছে। আর এসব গরু ও বাছুরের প্রধান খাবার হচ্ছে খড়। গত প্রায় দু’মাস ধরে খড়ের পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় অনেকের গরু-বাছুরই হাড্ডিসার হয়ে গেছে। খড় না থাকায় কেউ কেউ গরু বিক্রিও করে দিয়েছেন। গরুর খামারিদের চড়া দামে খাদ্য কিনে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয়েছে।

তবে যেসব কৃষকেরা আমন ধান আবাদ করেছেন তাদের কারোরই লোকসান গুনতে হবে না। প্রায় সব চাষিরাই লাভবান হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, একদিকে ধানের ফলন ভালো হয়েছে এবং অপরদিকে ধানের খড় বিক্রির চাহিদা প্রচুর।

কৃষক রোমান মিয়া জানান, ধানের দাম যা-ই হোক খড়ের দাম চড়া। ধান কাটার আগেই খড় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অনেকের। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতি কানি জমির খড় বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। এতে করে কোনো কোনো কৃষকের ধান উৎপাদন খরচ মিটে যাচ্ছে শুধু খড় বিক্রি করেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাদের গরুর খামার রয়েছে তাদের অধিকাংশ খামারিদের খড়ের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করে। যে কারণে ধানের চেয়ে খড়ের চাহিদা অধিক।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন ভূঁইয়া জানান, এ বছর নরসিংদীর ছয়টি উপজেলায় রোপা-আমন ধানের আবাদ হয়েছে মোট ৪১ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে, নরসিংদী সদর উপজেলায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর, পলাশে ৩ হাজার ৬০০ হেক্টর, শিবপুরে ৯ হাজার ৭৩২ হেক্টর, মনোহরদীতে ১০ হাজার ৫০০ হেক্টর, বেলাবতে ৫ হাজার ৬৬৮ হেক্টর, রায়পুরায় ৮ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে চাষ বা আবাদ হয়েছে।

আবাদ করা ধানের জাতের মধ্যে রয়েছে, হাইব্রিড, উফশী এবং স্থানীয় জাত। এরমধ্যে অধিক পরিমাণে চাষ হয়েছে উফশীর ব্রি-৪৯। এছাড়া, স্থানীয় জাতের মধ্যে রয়েছে, কালিজিরা, নাইজারশাইল, গান্ধিশাইল, মালতিশাইল, লালধান, তুলশীমালা, বালাম, বিনাশাইল ও চিনিগুঁড়া।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ/এইচএন