অদৃশ্য ভয়ে বগুড়ার যে গ্রামে ৪৫ বছর ধরে মানুষ নেই

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২০ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৫ ১৪২৭,   ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অদৃশ্য ভয়ে বগুড়ার যে গ্রামে ৪৫ বছর ধরে মানুষ নেই

বগুড়া প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:১১ ১৮ অক্টোবর ২০২০  

৪৫ বছর ধরে মানবশূন্য গ্রাম

৪৫ বছর ধরে মানবশূন্য গ্রাম

সন্ধ্যা নামলেই গ্রামটিতে ডাকাত আতঙ্কে থাকতো সবাই। কিছুদিন পর পরই সন্ধ্যায় পর ডাকাত দল ঢুকতো গ্রামটিতে। ডাকাতরা টাকা, ধান, চালসহ যাবতীয় জিনিস নিয়ে যেতো। আর এসব না দিলে গ্রামবাসীর ওপর চলতো অত্যাচার। এভাবেই ডাকাতদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতো গ্রামবাসী।

আর ডাকাত বাহিনীর হাতেই খুন হন গ্রামের মাতব্বর নান্নু মণ্ডল। এরপর এক বছরের মধ্যেই মানবশূন্য হয়ে পড়ে গ্রামটি। এখানকার মানুষ পাশের তারোইল গ্রামে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। ডাকাত আসবে আসবে বলে অদৃশ্য সেই ভয়ে ৪৫ বছর ধরে ওই গ্রামে কোনো মানুষ নেই।

গ্রামটির নাম পিচলগাড়ী। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল ইউপির একটি গ্রাম এটি। রোববার দুপুরে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, মরিচের আবাদ পরিচর্যা করছেন ৬৮ বছর বয়সী এক কৃষক। তার নাম মজিবর রহমান মণ্ডল। তিনি ওই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। কথা হয় তার সঙ্গে।

তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পরে এ গ্রাম থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তারোইল গ্রামে পার হয়েছি। পিচলগাড়ী গ্রামে থাকার সময়ে ডাকাতরা খুব অত্যাচার করতো। বেলা ডুবলেই গ্রামে ডাকাত দল ঢুকতো। তখন আমরা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়তাম। ডাকাতরা টাকা ও ধান-চাল নিয়ে যেতো। সেই সময় আমাদের গ্রামের মাতব্বর ছিলেন নান্নু মণ্ডল। তার কাছে ডাকাতরা টাকা চেয়েছিল। নান্নু মণ্ডল টাকা দিতে চাননি। এ কারণে তাকে হত্যা করে ডাকাতরা চলে যায়। যাওয়ার সময় ডাকাতরা বলে যায়, নান্নু জান দিল তবু টাকা দিল না।

মজিবর রহমান বলেন, নান্নু মণ্ডলকে ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে হত্যা করে ডাকাত দল। পরে ডাকাতদের অত্যাচার আরো বেড়ে যায়। বাড়ির মেয়েদেরও তারা অত্যাচার শুরু করেছিল। পরে ১৯৭৫ সালের দিকে আমরা পিচলগাড়ী গ্রামটি ছেড়ে পাশের তারোইল গ্রামে চলে আসি। এখন আমরা তারোইল গ্রামেই থাকছি।

একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মজিবর বলেন, ডাকাতরা আমার কাছে টাকা দাবি করেছিল। আমি টাকা দেইনি, বলেছিলাম আমার কাছে টাকা নেই। এ ঘটনার কয়েকদিন পরে আমি একটি গরু কিনে আনি। ডাকাতরা গরু দেখে বলে, আমাদের টাকা না দিয়ে গরু কিনে আনলি তুই; তোকে এবারের মতো ছেড়ে দিলাম।

মজিবরের সঙ্গে কথা বলার সময় শাহজাহান নামের এক ৬৫ বছর বয়সী কৃষক এগিয়ে এলেন। তিনি বলেন, আমার ঘরবাড়ি সবই ছিল পিচলগাড়ী গ্রামে। ডাকাতদের অত্যাচারে এখানে থাকতে পারিনি। ডাকাতরা নান্নু মণ্ডলকে খুন করার এক বছর পরেই আমরা গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছি।

শাহজাহান বলেন, আমাদের পিচলগাড়ী গ্রামে ১৬টি বাড়ি ছিল। আমরা সবগুলো পরিবারই পাশের তারোইল গ্রামে চলে এসে থাকতে শুরু করি। এখন আমরা তারোইল গ্রামের বাসিন্দা।

গ্রামটি ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। যেখানে ঘরবাড়ি ছিল সেই জায়গাগুলো উঁচু হয়ে আছে। কোনো ঘরবাড়ির চিহ্ন পর্যন্ত নেই। তবে একটি মসজিদ এখনো রয়েছে গ্রামটিতে। ওই মসজিদটি মাটির ছিল। বছর দুয়েক হলো সেটি পাকা করা হয়েছে। প্রতি শুক্রবার সেখানে জুমার নামাজ পড়তে আসেন গ্রামবাসীরা। এছাড়া আবাদি জমিতে কাজ করতে আসা কৃষকরা মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করেন।

পিচলগাড়ী গ্রাম থেকে উঠে আসা পরিবারগুলো গ্রামে আবার ফিরবে কি-না জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা তারোইল গ্রামে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেছি। এ গ্রামে ফিরে আসার আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

মজিবর রহমান বলেন, আমার চোখের সামনে এখনো ওই দিনগুলো ভেসে ওঠে। আজও মনে হয় বেলা ডুবলেই এ গ্রামে ডাকাত ঢুকবে। আমি গ্রামটিতে আর ফিরে আসতে পারব না।

পিচলগাড়ী গ্রাম থেকে তারোইল গ্রামে গিয়ে কথা হয় সেখানকার গ্রামবাসীর সঙ্গে। তারা বলেন, পিচলগাড়ীর বাসিন্দারা প্রায় ৪৫ বছর আগে তারোইল গ্রামে চলে আসে। এরপর থেকে তারা এ গ্রামেই থাকছেন।

তারোইল গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, আমি তারোইল গ্রামের জামাই। ওই গ্রামটির সবাই আমাদের গ্রামে থাকে। ডাকাত দলের অত্যাচারে তারা এ গ্রামে এসে বাড়ি করেছেন। আমাদের তারোইল গ্রামেও মাঝে মধ্যে ওই সময় ডাকাতি হয়েছে। তবে এখন ঘনবসতি হওয়ার কারণে ডাকাত আর নেই।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর