‘চলো বদলে যাই’ বলে নিজেই বদলে গেলেন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৫ ১৪২৭,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘চলো বদলে যাই’ বলে নিজেই বদলে গেলেন

আদনান সাকিব, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১১ ১৮ অক্টোবর ২০২০  

আইয়ুব বাচ্চু

আইয়ুব বাচ্চু

‘চলো বদলে যাই’, বলে যেন নিজেই বদলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু। ছেড়ে গেলেন সবাইকে। কাঁদালেন লাখো ভক্তকে। আজ সেই রুপালি গিটারের জাদুকরের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী।

দীর্ঘ কয়েক দশকে অসংখ্য কালজয়ী, জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘রুপালি গিটার’, ‘মেয়ে’, ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘সুখের এ পৃথিবী’, ‘ফেরারী মন’, ‘উড়াল দেবো আকাশে’, ‘বাংলাদেশ’, ‘আমি বারো মাস তোমায় ভালোবাসি’, ‘এক আকাশের তারা’, ‘সেই তারা ভরা রাতে’  ‘কবিতা’, ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’, ‘যেওনা চলে বন্ধু’, ‘বেলা শেষে ফিরে এসে’  ‘তিন পুরুষ’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি।

তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, লিড-গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী। এলআরবি ব্যান্ড দলের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল আইয়ূব বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের একজন। এর আগে তিনি দশ বছর সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গীতজগতে যাত্রা শুরু হয় ফিলিংস ব্যান্ডের সঙ্গে ১৯৭৮ সালে। তার কণ্ঠ দেয়া প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’।

১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে তিনি সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম রক্তগোলাপ নামে একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন। অ্যালবামটি তেমন সাফল্য না পেলেও সফলতার শুরু তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ময়না’ দিয়ে ১৯৮৮ সালে ।

১৯৯১ সালে আইয়ুব বাচ্চু এল আর বি ব্যান্ড গঠন করেন। ব্যান্ড গঠনের পর ১৯৯২ সালে ব্যান্ডের নামেই প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এই অ্যালবামের ‘শেষ চিঠি কেন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হকার’ গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরে ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যান্ড অ্যালবাম ‘সুখ’ ও ‘তবুও’ বের হয়। সুখ অ্যালবামের ‘সুখ’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘রূপালি গিটার’, ‘গতকাল রাতে’ উল্লেখযোগ্য গান। এর মাঝে ‘চলো বদলে যাই’ বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান। গানটির কথা ও সুর করেছেন বাচ্চু নিজেই।

১৯৯৫ সালে তিনি বের করেন তৃতীয় একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’। এটি সর্বকালের সেরা একক অ্যালবাম বলে অভিহিত করা হয়। অ্যালবামটির প্রায় সবগুলো গানই জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’, ও ‘আমিও মানুষ’।

সে বছরই প্রকাশিত হয় তার চতুর্থ ব্যান্ড অ্যালবাম ‘ঘুমন্ত শহর’। ঘুমন্ত শহরের ‘টাইটেল ট্রাক’  ‘ভ্রান্ত পথিক’, ‘বেইলি রোডে’ গানগুলোও মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন আইয়ুব বাচ্চু। ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ বাংলা ছবির অন্যতম একটি জনপ্রিয় গান। এটি তার গাওয়া প্রথম চলচ্চিত্রের গান।

যদিও বাচ্চু সোলস ছেড়ে দিয়েছিলেন হার্ড রক গান করার জন্যে, তবে একজন একক শিল্পী হিসেবে মূলত পপ রক ও সফট রক ঘরানার গান করতেন বাচ্চু। সংগীত জীবনের শুরু থেকেই আইয়ুব বাচ্চুর ব্লুজ, জ্যাজ ও ফাংক ঘরানার গানের প্রতি ছিলো প্রচণ্ড আগ্রহ৷

১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে এবি কিচেন নামের একটি স্টুডিও ঢাকার মগবাজারে গড়ে তোলেন তিনি, যা পরবর্তীকালে একটি রেকর্ড লেবেলে পরিণত হয়। আইয়ুব বাচ্চু একজন একক শিল্পী হিসেবে একটি ডাবল অ্যালবাম বের করতে চেয়েছিল।

১৯৯৯ সালের শুরুর দিকে ‘সময়’ ও ‘একা’ নামে দুটি ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ করে এলআরবি, যা সাউন্ডটেকের ব্যানারে প্রকাশ হয় ।

২০০০ সালে এলআরবি প্রকাশ করে ‘মন চাইলে মন পাবে’ অ্যালবাম। ‘গগনের তারা’, ‘স্বার্থের কাছে বন্দী মন’, ‘আপন কেউ নয়’সহ সবগুলো গানই সারাদেশের অলিগলিতে বাজতে থাকে। এছাড়া ২০০২ সালে ‘প্রেম তুমি কি’ নামে একক অ্যালবাম করেন। এছাড়াও ‘দুটি মন’ ও ‘কাফেলা’ নামে একক অ্যালবামও বের করেন তিনি।

২০০৩ সালে এলআরবি বের করে ‘অচেনা জীবন’ এবং আইয়ুব বাচ্চুর একক অ্যালবাম ‘প্রেম প্রেমের মতো’ বের হয়।

২০০৪ সালে বের করেন একক অ্যালবাম ‘পথের গান’। ২০০৫ সালে এলআরবি বের করে ‘মনে আছে নাকি নেই’ এবং একক হিসেবে ২০০৬ সালে বের হয় ‘ভাটির টানে মাটির গানে জীবন’ এবং ‘জীবন’।

২০০৭ সালে আইয়ুব বাচ্চু ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ নামে একটি ইন্সট্রুমেন্টাল মুক্তি দেন। ২০০৮ সালে বের করেন ‘রিমঝিম বৃষ্টি’। ২০০৯ সালে তার একক অ্যালবাম ‘বলিনি কখনো’ প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালে এলআরবি ব্যান্ড থেকে বের করেন ব্যান্ড অ্যালবাম ‘যুদ্ধ’। এই অ্যালবামে ১০টি গান রয়েছে। ছয় বছর পর তার পরবর্তী একক অ্যালবাম ‘জীবনের গল্প’ (২০১৫) বাজারে আসে। এই অ্যালবামেও রয়েছে ১০টি গান। গানের কথা লিখেছেন সাজ্জাদ হোসাইন এবং সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন আইয়ুব বাচ্চু নিজে।

বাচ্চু তার বান্ধবী ফেরদৌস চন্দনাকে বিয়ে করেছিলেন ১৯৯১ সালের ৩১ জানুয়ারি। তাদের দু'টি সন্তান আছে। মেয়ে ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব এবং ছেলে আহনাফ তাজওযার আইয়ুব। ছয় বছর ধরে ফুসফুসে পানি জমার অসুস্থতায় ভোগার পর ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় তার নিজ বাসভবনে মারা যান তিনি। মৃত্যুর দুইদিন আগে তিনি রংপুরে তার শেষ কনসার্ট করেন।

তাকে চট্টগ্রামের চৈতন্য গলিতে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে, তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস