‘কমান্ডো’ স্টাইলে চলাফেরা করতেন এসআই আকবর

ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১৩ ১৪২৭,   ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘কমান্ডো’ স্টাইলে চলাফেরা করতেন এসআই আকবর

সিলেট প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:০৪ ১৬ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ২০:০৩ ১৬ অক্টোবর ২০২০

এসআই আকবর

এসআই আকবর

নিজেকে কমান্ডো পরিচয় দিতেন সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) এসআই আকবর। চলতেনও কমান্ডো স্টাইলে। অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন নগরের এখানে ওখানে। পুলিশি দায়িত্ব ছাড়া সামজিক অনুষ্ঠানে গেলেও কোমরে অস্ত্র দেখিয়ে নানা ভঙ্গিমায় ঘুরতেন।

সিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান উদ্দিন আহম্মেদের মৃত্যুর ঘটনায় এসআই আকবরসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

আরো পড়ুন>> ‘আকবর দ্য ব্যাড’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজেকে কমান্ডো ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এসআই আকবর। বন্দরবাজার এলাকায় কোনো ছিনতাইকারী পেলে অনেটা কমান্ডো স্টাইলে মারতেন। ছিনতাইকারী ধরতে পারলেই আকবরের মাথা গরম হয়ে যেতো। হকি স্টিকসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে আনন্দ পেতেন তিনি। তারপর উৎকোচ আদায় করে তাদের ছেড়ে দিতেন। পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনার ২-৩ দিন আগেও কয়েকজন ছিনতাইকারীকে কমান্ডো স্টাইলে মারধর করেছেন। এরপর তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।

আরো পড়ুন>> ‘ভিআইপি রুম’টিই ছিল এসআই আকবরের টর্চার সেল

রায়হান হত্যাকাণ্ডে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর গা ঢাকা দেন এসআই আকবর। এরপরই প্রকাশ্যে আসে তার একের পর এক অপকর্ম। বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ভেতরে নিজস্ব টর্চার সেল বানিয়েছিলেন তিনি। নাম দিয়েছিলেন ভিআইপি রুম। সেই টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নিরীহ অনেকেই। বিনা অপরাধে অনেককেই ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে মারধর করেছেন আকবর। আবার টাকা না পেয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন নিরপরাধ অনেককে। তেমনই একজন নগরীর খাদিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা লিসাত লিজা। তিনি অভিযোগ করেন, ১০ হাজার টাকা চাঁদা না পেয়ে তাকে, তার স্বামী ও স্বামীর ভাগ্নেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন এসআই আকবর।

লিজা বলেন, সম্প্রতি এক ঘটনায় ৯৯৯-এ কল করি। তখন এসআই আকবর আমাদের রক্ষা না করে হামলাকারীদের পক্ষ নেন। এছাড়া গ্রিনবাংলা নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে কাজ করতাম। সেই চ্যানেলের এক শিল্পীর কাছে পাচ লাখ টাকা চেয়েছিলেন আকবর।

আরো পড়ুন>> ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথায় যা বললেন এসআই আকবর

২০০৭ সালে কনস্টেবল পদে চাকরি নেন  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের বেড়তলা বগৈর গ্রামের স্কুলশিক্ষক জাফর আলী ভূঁইয়ার ছেলে আকবর। পুরো নাম আকবর হোসেন ভূঁইয়া। ২০১৪ সালে এসআই পদে নিয়োগ পাওয়ার পরই অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তিনি। নির্যাতন করেছেন নিরীহ অনেককে, গড়েছেন সম্পদের পাহাড়, বানিয়েছেন প্রাসাদসম বাড়ি।

সিলেট মহানগর পুলিশের এডিশনাল ডিসি (মিডিয়া) বিএম আশরাফ উল্ল্যাহ তাহের জানান, সিলেট মহানগর পুলিশের বিশেষ ইউনিট ক্রাইসিস রেসপন্স টিমের (সিআরটি) সদস্য ছিলেন এসআই আকবর। সিআরটি’র বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি।

আরো পড়ুন>> সিলেট বন্দরের ‘ত্রাস’ আকবরের ভয়ংকর কাহিনি

এর আগে, রোববার সকালে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে রায়হান নামে ওই যুবকের মৃত্যু হয়। তিনি নগরীর আখালিয়া নেহারিপাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে।

নিহতের পরিবারের দাবি, ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করে রায়হানকে হত্যা করেছে পুলিশ। তবে, পুলিশের দাবি, নগরীর কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন রায়হান।

এ ঘটনায় রোববার রাতে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করেছেন তিনি। মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে।

আরো পড়ুন>> রায়হান হত্যা: পালিয়ে গেছেন সেই এসআই আকবর

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রতিদিনের মতো শনিবার বিকেলে রায়হান নিজ কর্মস্থল স্টেডিয়াম মার্কেটের ডা. গোলাম কিবরিয়া ও ডা. শান্তা রাণীর চেম্বারে যান। পরদিন ভোরে ০১৭৮৩৫৬১১১১ নম্বর থেকে রায়হানের মা সালমা বেগমের মোবাইলে একটি কল আসে। কলটি রিসিভ করেন রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ।

ওই সময় মোবাইলের অন্যদিক থেকে রায়হান আর্তনাদ করে বলেন, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন। ছাড়া পেতে ১০ হাজার টাকা লাগবে। হাবিবুল্লাহ তাৎক্ষণিক ৫ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে গেলে এক পুলীশ সদস্য বলে, ’১০ হাজার চাওয়া হয়েছিল, পাঁচ হাজার কেন?’ ওই সময় রায়হানের খোঁজ জানতে চাইলে ওই পুলিশ সদস্য বলে, ‘সে ঘুমিয়ে গেছে। পুরো ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকালে আসেন’।

আরো পড়ুন>> ‘মানবিক’ আকবরের অমানবিক নির্যাতন রায়হানের ওপর

কথামতো ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফাঁড়িতে গেলে হাবিবুল্লাহকে জানানো হয়, রায়হানকে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর হাসপাতালে গিয়ে হাবিবুল্লাহ জানতে পারেন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে রায়হানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা হাসপাতালের মর্গে গিয়ে রায়হানের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ দেখতে পান।

নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বলেন, আমার স্বামীকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে হাত-পায়ে আঘাত ও নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। রাতভর নির্যাতনেই তার মৃত্যু হয়েছে।

আরো পড়ুন>> বেরিয়ে এলো পুলিশ ফাঁড়িতে যুবকের মৃত্যুর রহস্য

এদিকে, রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আকবর হোসেনসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরো তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বরখাস্তের পর থেকেই এসআই আকবর লাপাত্তা।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া বাকি তিন পুলিশ সদস্য হলেন- এএসআই তৌহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাশ, হারুনুর রশিদ। প্রত্যাহার হয়েছেন, এএসআই আশিক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী, কনস্টেবল সজীব হোসেন।

আরো পড়ুন>> সোয়া ৩ ঘণ্টার রহস্য: ফাঁড়িতে ঢোকেন জীবিত রায়হান, বের হন মৃত

রোববার রায়হানের মৃত্যুর পর তিনদিন ধরে খোঁজ মিলছে না এসআই আকবরের। জনশ্রুতি রয়েছে, আকবর সিলেট সীমান্ত দিয়ে মেঘালয়ে পালিয়ে গেছেন।

পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, এসআই আকবর যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সে জন্য সব ইমিগ্রেশনে চিঠি দেয়া হয়েছে। তাকে ধরার জন্য টিম গঠন করা হয়েছে।

আরো পড়ুন>> কী ঘটেছিল সেই রাতে? ভয়ঙ্কর বর্ণনা দিলেন অটোচালক

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর