‘থ্রি এঙ্গেল’ ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে গজারিয়াবাসীর অস্তিত্বের লড়াই

ঢাকা, বুধবার   ২১ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৬ ১৪২৭,   ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘থ্রি এঙ্গেল’ ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে গজারিয়াবাসীর অস্তিত্বের লড়াই

আবদুর রহমান রাহাদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:০৫ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ২০:০৬ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

দখলকৃত জমি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দখলকৃত জমি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় ‘থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড’ শিপ ইয়ার্ড কোম্পানির বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। 

ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির নকল দলিল বানিয়ে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক এসব জমি দখল করছে শিপ ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। মাত্র ৩৭ একর ৮০০ শতাংশ জমি ক্রয় করে বর্তমানে তারা দখলে আছে প্রায় ১১০ একরেরও বেশি জমি। এর মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীনের পাশাপাশি রয়েছে সরকারি খাস জমি, খাল, নদী, রাস্তা এবং ভূমিহীনদের জন্য বরাদ্দকৃত জমি।

ফুলদী নদী তিন ফসলি জমি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি মো. হাবিবুল্লাহ মোল্লা বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, মেঘনা নদীর পার্শ্ববর্তী কুমিরা খালের পশ্চিমে এবং বরুচক খালের দক্ষিণের কিছু জমি ক্রয় করে স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রভাব খাটিয়ে পুরো খাল এবং তার আশপাশের জমি দখলে নিয়েছে থ্রি এঙ্গেল কর্তৃপক্ষ।

থ্রি এঙ্গেলের মালিক ও ভূমি-দস্যুদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল

এদিকে, গত মঙ্গলবার তিন দিনব্যাপী কর্মসূচির প্রথম দিনে থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের মালিক ইঞ্জিনিয়ার আমিরুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট ভূমি দস্যুদের বিচার চেয়ে শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করছে এলাকাবাসী। এদিন সকালে সোনালী মার্কেট ফেরিঘাট থেকে গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে পর্যন্ত এ মানববন্ধনে অংশ নেয় উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার প্রায় দুই হাজার মানুষ।

‘ভূমিদস্যুদের আস্তানা গজারিয়ায় থাকবে না’ এই স্লোগানে তিন ফসলি জমি ও নদী রক্ষায় শিগগিরই ‘থ্রি এঙ্গেল’ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণকারী বিক্ষুব্ধ জনতা।

জমি দখলের বিষয়ে নয়ানগর গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক হানিফ প্রামাণিক বলেন, থ্রি-এঙ্গেল কর্তৃপক্ষ জোর পূর্বক আমাদের পৈত্রিক জমি দখল করেছে। আমাদের তিন ফসলি জমি যেগুলোতে সারা বছর আলু, ভুট্টা, আর ধান চাষ করতাম সেসব জমি তারা অবৈধভাবে রাতের আধারে ভরাট করেছে।

থ্রি এঙ্গেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নকল দলিল তৈরির অভিযোগ এনে আরেক ভুক্তভোগী কৃষক  মোস্তফা রারী বলেন, আমি আমার জমি তাদের কাছে বিক্রি করিনি। কিন্তু তারা আমার জমির নকল দলিল বানিয়ে উল্টো আমাকেই এখন জমিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে হত্যার হুমকি দিয়েছে।

প্রতীকী বালুর বস্তা ও প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ভুক্তভোগী কৃষক

এদিকে থ্রি এঙ্গেল কোম্পানির অসঙ্গতির ব্যাপারে প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় হতাশ এলাকাবাসী। বিষয়টি উপজেলায় নিযুক্ত এসি ল্যান্ডকে জানানোর পর তিনি জমি ভরাট বন্ধের ব্যাপারে আশ্বস্ত করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

থ্রি এঙ্গেল ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে কৃষকেরা ‘আমরণ অনশন’ করবেন বলে জানিয়েছেন ফুলদী নদী তিন ফসলি জমি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য আতাউর রহমান আরজু।

গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তালেব ভূঁইয়া বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা কয়েক দফা চেষ্টা করেছি। কিন্তু থ্রি এঙ্গেল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আমিরুল ইসলাম এবং কর্মকর্তা লোকমান হোসেন মিটিংয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন তারিখ দিয়েও উপস্থিত থাকেননি। জমির দলিল ও কাগজপত্র নিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিশোধ অনেক বার থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে জনগণের আন্দোলনকে যৌক্তিক দাবি করে আবু তালেব ভূঁইয়া আরো বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি সব সময় আমার জনগণের পাশে আছি। ভূমি-দস্যুদের বিরুদ্ধে তাদের এই লড়াইয়ে তারা সব সময় আমাকে তাদের পাশে পাবে।

এদিকে থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড কর্মকর্তা লোকমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এমন অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। থ্রি এঙ্গেল কোম্পানির কার্যক্রমের সম্প্রসারণ দেখে হিংসার বশবর্তী হয়ে একদল লোক আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

তবে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে থ্রি এঙ্গেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আমিরুল ইসলাম, পরিচালক সাবিনূর রশিদসহ একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় মেঘনা নদীর তীরবর্তী নয়ানগর, বালুরচর, ও দৌলতপুর গ্রামের পাশে ২০১২ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড। কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে তারা কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় অবৈধভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

জানা গেছে, থ্রি এঙ্গেল মেরিন লিমিটেড কোম্পানি ও এর নয়জন পরিচালকের বিরুদ্ধে ঋণ সংক্রান্ত একটি মামলাও রয়েছে। তবে এই মামলায় থ্রি এঙ্গেল কর্তৃপক্ষ হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএইচ