বিশ্বে চার মাসে দ্বিগুণ বেড়েছে করোনার সংক্রমণ

ঢাকা, রোববার   ২৯ নভেম্বর ২০২০,   অগ্রহায়ণ ১৫ ১৪২৭,   ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

বিশ্বে চার মাসে দ্বিগুণ বেড়েছে করোনার সংক্রমণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৪৭ ১৮ নভেম্বর ২০২০  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বে ফের বেড়েছে মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। অনেক দেশেই ভাইরাসটির দ্বিতীয় ঢেউ পেরিয়ে তৃতীয় ঢেউও দেখা দিয়েছে। এদিকে কার্যকর টিকার সন্ধান মিললেও শিগগিরই করোনা মহামারি থেকে মুক্তি নিয়ে সংশয় কাটছে না।

আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যানুযায়ী, গত চার মাসে বিশ্বে দৈনিক সংক্রমণ দ্বিগুণ হয়ে পাঁচ-ছয় লাখের কোঠায় ঠেকেছে। তবে এর মধ্যে স্বস্তির খবর হলো, সংক্রমণ বৃদ্ধির অনুপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়েনি। বৈশ্বিক গড় মৃত্যুহার ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মৃত্যু কমার পেছনে ভাইরাসটি যে দুর্বল হয়ে পড়েছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে বেশি বেশি পরীক্ষা এবং করোনার সঙ্গে মানুষ অনেকটা খাপ খাওয়ায় পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটেছে।

গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে প্রথমবারের মতো মানবদেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর সাড়ে ১০ মাস কেটে গেলেও এখনো ভাইরাসটির উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। যদিও ডিসেম্বরের আগেই চীনে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে মার্কিন জৈব-প্রযুক্তি কম্পানি মডার্না গত সোমবার জানিয়েছে, তাদের করোনার টিকা ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কার্যকর বলে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার প্রাথমিক ফলে উঠে এসেছে। এর আগে মার্কিন ওষুধ কম্পানি ফাইজার এবং জার্মান জৈব-প্রযুক্তি কম্পানি বায়োএনটেক তাদের উদ্ভাবিত করোনা টিকা ৯০ শতাংশ কার্যকর বলে জানায়।

মডার্না ও ফাইজার নিজেদের টিকার অনুমোদনের জন্য শিগগিরই আবেদন করবে। আর রাশিয়ার টিকা স্পুৎনিক ভি ৯২ শতাংশ কার্যকর বলে বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে। এদিকে অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও অক্সফোর্ডের টিকাও শিগগিরই অনুমোদন পেতে পারে। চীনের কয়েকটি টিকাও একই অবস্থায় আছে। তবে সংকটের বিষয় হলো, টিকা উৎপাদন ও সংরক্ষণের পরিকাঠামো সব দেশে নেই। যেমন ফাইজারের টিকা সংরক্ষণের জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রার পরিকাঠামো প্রয়োজন। তা ছাড়া এগিয়ে থাকা টিকার কম্পানির সঙ্গে অনেক দেশের চুক্তি যেমন নেই, তেমনই উৎপাদনের সক্ষমতা নেই।

অন্যদিকে সবার জন্য টিকা নিশ্চিতকরণের বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সে ১৭২টি দেশ নাম লেখালেও তা বেশ সময়সাপেক্ষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন এ উদ্যোগের সঙ্গে আছে কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশন (সিইপিআই) এবং দাতব্য সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গাভি)। এ উদ্যোগের সদস্য রাষ্ট্রগুলো জনসংখ্যার ৩ শতাংশের জন্য টিকা পাবে।

কার্যকর ও নিরাপদ টিকা পাওয়া মাত্রই এ সুবিধা পাবে দেশগুলো। এসব টিকা করোনার লড়াইয়ে সামনের সারিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীসহ সামাজিক বিভিন্ন সেবার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। প্রতিটি দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিকা সরবরাহের এ হার ২০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সাল শেষ হওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটি ডোজ টিকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

উন্নত দেশ ও কোভ্যাক্সের মাধ্যমে উৎপাদিত টিকা দিয়ে বিশ্বের ৭৮০ কোটি জনসংখ্যার চাহিদা আগামী বছরের মধ্যে কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। সবার টিকা নিশ্চিতকরণে বেশ কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ফলে মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ সময় লেগে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে স্বল্প মেয়াদে পরিস্থিতি খারাপের দিকে আগালেও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি বলেছেন, ‘ভ্যাকসিন উদ্ভাবিত হওয়ার কারণে বিশ্বে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আর খুব বেশি দিন মহামারি হিসেবে থাকবে না। কারণ আমি মনে করি, টিকা পরিস্থিতি পাল্টে দেবে।’

ড. ফাউচি বলেন, ‘করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে টিকাকরণের পর। কয়েক দিন আগে যেহেতু স্পষ্ট হয়েছে সত্যিকার অর্থে কার্যকর টিকা প্রস্তুত হচ্ছে। কিন্তু টিকা এলেই আমাদের লড়াই থামানো যাবে না।’

চলমান মহামারির শুরু থেকে করোনা পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক তথ্য জানাচ্ছেন ওয়ার্ল্ডোমিটারের একদল স্বেচ্ছাসেবক। ওয়েবসাইটটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০ মে দৈনিক সংক্রমণ এক লাখের কোঠা পার হয়। অর্থাৎ উহানে গুচ্ছ সংক্রমণ ধরা পড়ার ১৪১ দিন পর প্রথমবারের মতো এই সংখ্যা এক লাখ ছোঁয়। এর ৪২ দিন পর ১ জুলাই দৈনিক সংক্রমণ দুই লাখে পৌঁছে। এর সংক্রমণের গতি কিছুটা স্থির ছিল। ৬৫ দিন পর ৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংক্রমণসংখ্যা তিন লাখ ছাড়ায়। এর ৪১ দিন পর ১৫ অক্টোবর আরো এক লাখের কোঠা অতিক্রম হয়। এরপর খুব দ্রুতই সংক্রমণ বাড়তে থাকে।

১৩ দিনের ব্যবধানে ২৮ অক্টোবর দৈনিক সংক্রমণ পাঁচ লাখে পৌঁছে। আট দিনের মাথায় এই সংখ্যা ছয় লাখের কোঠাও ছাড়ায়। পরের আট দিনের মাথায় ১৩ নভেম্বর সংক্রমণে রেকর্ড তৈরি হয়। এদিন বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক ছয় লাখ ৫৭ হাজার নতুন রোগী নথিবদ্ধ হয়।

এর আগে ১৬ জুলাই এই সংখ্যা ছিল আড়াই লাখের চেয়ে কিছুটা বেশি। অর্থাৎ মাত্র চার মাসের ব্যবধানে দৈনিক সংক্রমণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। সাম্প্রতিক এই উল্লম্ফনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বড় ভূমিকা রেখেছে।

ওয়ার্ল্ডোমিটার বলছে, বুধবার পর্যন্ত বিশ্বের ২১৪টি দেশ ও অঞ্চলে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ কোটি ৬০ লাখে। এ সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়েছে তিন কোটি ৯০ লাখ রোগী আর প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৪৫ হাজারে।

ডেইলি বাংলাদেশ/মাহাদী