তিব্বত থেকে বঙ্গোপসাগরে ব্রহ্মপুত্রের পথচলা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৯ মে ২০২২,   ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,   ১৮ শাওয়াল ১৪৪৩

Beximco LPG Gas

তিব্বত থেকে বঙ্গোপসাগরে ব্রহ্মপুত্রের পথচলা

সাতরং ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১৭ ১৫ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১৬:২৪ ১৫ জানুয়ারি ২০২২

তিব্বত থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রবাহিত সুদীর্ঘ ব্রহ্মপুত্র। ছবি : সংগৃহীত

তিব্বত থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রবাহিত সুদীর্ঘ ব্রহ্মপুত্র। ছবি : সংগৃহীত

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান নদ ব্রহ্মপুত্র। শত শত উপকথা প্রচলিত আছে ব্রহ্মপুত্রকে নিয়ে। ব্রহ্মপুত্র নদটি শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই নদকে ঘিরে রয়েছে সুবিস্তৃত ইতিহাস। পৌরাণিক শাস্ত্র থেকে শুরু করে ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এই নদ।

সারাবিশ্বে নদ-নদীর তালিকায় পানি নিষ্কাশনের দিক থেকে নবম এবং দৈর্ঘ্যের হিসেবে পৃথিবীর ১৫ তম বৃহত্তম ব্রহ্মপুত্র নদ। হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গ থেকে জন্ম নেওয়া এই নদ তিব্বতের বুকে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম উপত্যকা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতের আসাম হয়ে পরবর্তীতে বাংলাদেশর উপর দিয়ে বিসর্জিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের বুকে। অঞ্চলভেদে সাংপো (তিব্বত), ইয়ারলুং জাংবো (চীন), লৌহিত্য, লোহিত, দিহাং (আসাম), পুরাতন ব্রহ্মপুত্র (বাংলাদেশ) হিসেবে পরিচিত এই আন্তর্জাতিক নদটিকে সাধারণত ‘ব্রহ্মপুত্র’ নামে ডাকা হয়। ব্রহ্মপুত্র নদের দৈর্ঘ্য নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। বাংলাপিডিয়া মতে, এর দৈর্ঘ্য প্রায় দুই হাজার ৮৫০ কিলোমিটার। তবে সম্প্রতি চীনা জরিপে দেখা গেছে, এই নদের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন হাজার ৮৪৮ কিলোমিটার।

ব্রহ্মপুত্র নদ তার যাত্রাকালে বেশকিছু উপনদীর জন্ম দিয়েছে। এদের মধ্যে মানাস, রেইডাক, সঙ্কোশ, ভারেলি, তিস্তা, দিবাং এবং লুহিত প্রধান উপনদী হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এই নদের যাত্রাপথে অসংখ্য চর এবং দ্বীপের জন্ম হয়েছে। এই নদের মাজুলি দ্বীপকে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী-দ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই নদ বাংলাদেশ এবং ভারতের অর্থনৈতিক এবং ভৌগোলিক দিক থেকে অন্যতম প্রধান নদ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের পথচলা। ছবি : সংগৃহীত

ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস নিয়ে তিব্বতি এবং ভারতীয় পুরাণে বেশ কিছু কাহিনী বর্ণিত রয়েছে। তিব্বতিরা বিশ্বাস করে, পৃথিবীর বুকে মানুষের বসতি শুরু হওয়ার বহু বছর আগে চাং টান নামক একটি মালভূমিতে এক সুবিশাল হ্রদের অস্তিত্ব ছিল। তখন বোধিসত্ত্ব নামক এক স্বর্গীয় অস্তিত্ব এই অঞ্চলে আসন্ন সব মানুষের জন্য এই পানির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে হিমালয়ে দিয়ে এই পানি নির্গমনের একটি পথ তৈরি করে দেন। তারা এই নদীর পানিকে অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করে।

আবার হিন্দু পুরাণ মতে, ঋষি শান্তনুর স্ত্রী অমোঘার গর্ভে স্রষ্টা ব্রহ্মার একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। সেই পুত্র একটি জলপিণ্ড হিসেবে জন্ম নিয়েছিল।

ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তিস্থল হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের জিমা ইয়ংজং হিমবাহ। এই হিমবাহের অবস্থান তিব্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে। এখান থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হতে থাকে।  আসাম পেড়িয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল হয় বাংলাদেশ।

কৈলাস শৃঙ্গ। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের বুকে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবাহ অন্যান্য দেশের তুলনায় সংক্ষিপ্ত। এদেশে একে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ হিসেবে ডাকা হয়। মেঘনা নদী হিসেবে তা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।

নদ এবং নদীর মধ্যে পার্থক্য জিজ্ঞাসা করা হলে প্রায়ই যে উত্তর পাওয়া যায় তা হচ্ছে, নদীর শাখা আছে কিন্তু নদের নেই। বহুল প্রচলিত হলেও এই উত্তর সঠিক নয়। যেমন ধরা যাক ব্রহ্মপুত্রেরই কথা। নদ হিসেবে পরিচিত এই ব্রহ্মপুত্র থেকে যমুনা, শীতলক্ষ্যা, বানার, সাতিয়া নামক শাখা নদীর উৎপত্তি হয়েছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী কিন্তু ব্রহ্মপুত্রকে নদী বলতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা একে নদ বলি। নদ এবং নদীর মধ্যকার লিঙ্গ বিভাজন সম্ভবত পৃথিবীর এই অঞ্চল ব্যতীত অন্য কোথাও নেই। আর এই বিভাজনের কারণ শাখায় নয়, ব্যাকরণে। পুরুষবাচক নামের ক্ষেত্রের জলধারাকে আমরা নদ হিসেবে ডাকছি। আর নারীবাচক নামের জলধারাকে নদী। সেজন্য ব্রহ্মপুত্র, কপোতাক্ষ হলো নদ, কিন্তু পদ্মা, মেঘনা যমুনা হচ্ছে নদী। তবে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন, আড়িয়াল খাঁ একটি পুরুষবাচক শব্দ হলেও এটি একটি নদীর নাম।

বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের পথচলা। ছবি : সংগৃহীত

তিব্বত থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রবাহিত সুদীর্ঘ ব্রহ্মপুত্রের বুকে প্রাণের বিজয়কেতন বহন করছে শত প্রজাতির মাছ। এদের মধ্যে ভারতে প্রায় ১২৬ প্রজাতির মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে পরিচালিত এক জরিপে প্রায় ৬৭ প্রজাতির মাছ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাছ হচ্ছে পাবদা, চিতল, মৃগেল, মিরর কার্প, চীনা পুঁটি, সিলভার কার্প ইত্যাদি। ব্রহ্মপুত্রের সমৃদ্ধ্য মৎস্য সম্পদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিচিত্র জেলে সমাজ। একসময় শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের বুক থেকে জেলেরা জনপ্রতি দৈনিক ৫০ কেজির মতো মাছ ধরতে পারতো। তবে নদের পানি দূষিত হয়ে যাওয়ায় এখন তা ১৫-২০ কেজিতে নেমে এসেছে।

ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বহু হাতি, বেঙ্গল বাঘ, চিতা বাঘ, বন্য মহিষ, হরিণের মতো প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায়। এরা বেঁচে থাকার জন্য ব্রহ্মপুত্রের উপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। আসামের দিকে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এক-খড়গ বিশিষ্ট গণ্ডারের সন্ধান পাওয়া যেত। বর্তমানে এদের সংখ্যা অনেক কম। আসাম ব্যতীত পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে এই প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের পথচলা। ছবি : সংগৃহীত

এককালের প্রাণবন্ত, খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র নদ আজ মৃতপ্রায়। দখলদারি এবং বর্জ্য নিষ্কাশনের কারণে প্রশস্ত নদ আজ মৃতপ্রায় খালের ন্যায় টিকে আছে। এর ফলে নদ হারিয়েছে নাব্যতা, হুমকির মুখে আছে নদের উপর নির্ভরশীল প্রাণিসম্পদ। কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার কারণে আড়াইহাজার অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে নদের পানি বাড়লেও শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালুচরে ছেয়ে যায় নদের দুই পাড়। বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ভাটির দিকে পলি জমে নদের বড় অংশ ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে ব্রহ্মপুত্রের সাথে যমুনার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অতি দ্রুত এখানে খনন না করলে পরবর্তীতে নদকে বাঁচানো যাবে না।

তবে শুধু নদ খনন করলেই সমাধান হবে না। ইতোমধ্যে দূষিত পানি থেকে ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক নকশা প্রণয়ন করে এসব শিল্প-কারখানায় উন্নতমানের নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার বিকল্প নেই। ব্রহ্মপুত্রের সর্বনাশ মানে বাংলাদেশের সর্বনাশ। এই নদ ধ্বংস হলে আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা এবং পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের পথচলা। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ নদীমাতৃক ভূমি। শত শত ছোট-বড় নদীর সমাহারে এই বাংলা এক প্রাণবন্ত অববাহিকা। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্নার সাথে জড়িয়ে আছে এই নদ-নদীর গল্পগাথা। ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশের বুক দিয়ে বয়ে চলা দীর্ঘতম নদ। হিমালয়ের সন্তান এই নদ আমাদের দেশের ভৌগোলিক এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের অন্যতম প্রভাবক। ব্রহ্মপুত্রের প্রাণবন্ত রূপ যেন সমৃদ্ধ বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি। তাই আমাদের সকলের উচিত এই নদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা। কার্যকরী পদক্ষেপ বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে যথাসাধ্য অবদানের মাধ্যমে এই নদকে বাঁচিয়ে রাখা।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি

English HighlightsREAD MORE »