আধুনিকতা পৌঁছেছে বেদে পল্লীতে

ঢাকা, বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৮,   ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

আধুনিকতা পৌঁছেছে বেদে পল্লীতে

খায়রুল বাশার আশিক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৫০ ২৫ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১১:১৮ ২৫ নভেম্বর ২০২১

বেদে বহরের একটি পরিবার। যেখানে শত কষ্টের মধ্যেও আছে সুখের হাসি। ছবিটি বরিশালের কর্ণকাঠি থেকে তোলা।  ছবি : খায়রুল বাশার আশিক

বেদে বহরের একটি পরিবার। যেখানে শত কষ্টের মধ্যেও আছে সুখের হাসি। ছবিটি বরিশালের কর্ণকাঠি থেকে তোলা। ছবি : খায়রুল বাশার আশিক

সমাজে আজও চোখে পড়ে খোলা যায়গায় অস্থায়ী ঘরে বসতি গড়া একদল জনগোষ্ঠীকে, যারা আমাদের কাছে ‘বেদে’ নামে পরিচিত। আচরণে ও পেশায় ভিন্নতা থাকলেও বেদেরা এ দেশেরই নাগরিক। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভোটাধিকারসহ রাষ্ট্রীয় সব নাগরিক সুবিধা তাদের প্রাপ্য। এসব সুবিধা থেকে অনেকটা বঞ্চিত ছিলো এই বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী। তবে সচেতনতা আর সমাজ পরিবর্তনে বেদেদের জীবনে এসেছে ইতিবাচক সব পরিবর্তন।

চিকিৎসা ব্যবসা ও ওষুধ বিক্রিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে নিজস্ব ভাবধারায় রচিত হতো বেদেদের জীবন। গত দুই দশক আগেও বেদেদের যে অবস্থা ছিলো, আজ তা নেই। আধুনিকতার ছোঁয়া তাদের সমস্ত জীবন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। যাযাবর বৃত্তি পরিহার করে স্থায়ী বসতির চিন্তা এখন সব বেদেদের স্বপ্ন। শিশু শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধিসহ গাওয়ালি (ভ্রমণরত) বেদেদের নানামুখী পরিবর্তন এখন দৃশ্যমান।

গাওয়ালে আসা বেদে পরিবারের শিশুরা। ছবি : খায়রুল বাশার আশিকবাংলাদেশে ক্রমহ্রাসমান একটি জনগোষ্ঠী বেদে। বেদে মানেই ভ্রমণশীল বা ভবঘুরে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসেবে এ দেশে বেদেরে সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ হলেও ক্রমে ক্রমে তা কমতে চলেছে। সময়ের পরিবর্তনে বেদেদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষা ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে বদলে নিয়েছে পেশা ও পরিচয়। চাল-চুলোহীন জীবনের ইতি টেনে স্থায়ী বসতিতে বসবাসের ইচ্ছা অধিকাংশ বেদের নিত্যদিনের প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে। জীবনের তাগিদে বেদেরাই তাদের জীবনে ঘটিয়েছে নানামুখী পরিবর্তন। সামাজিকতার অনুকরণে এসেছে চাল-চলনের পরিবর্তন। কেউবা অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে স্থানান্তর হয়েছে নতুন সামাজিকতায়।

বেদেদের সার্বজনীন পেশা ছিলো চিকিৎসা ব্যবসা ও ওষুধ বিক্রি। নানা রকমের বুনো শেকড়, লতাপাতা এরা  ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। এদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে ঝাড়ফুঁক অর্থাৎ মন্ত্রের প্রয়োগ অত্যন্ত বেশি। বাত ও দাঁতের ব্যথার চিকিৎসা, শিশু চিকিৎসা, মালিশ প্রভৃতিতে বেদেরা অভিজ্ঞ বলে বিশ্বাস প্রচলিত ছিলো। বর্তমানে বেদে চিকিৎসা গ্রহণে আধুনিক সমাজ অধিকতর সজাগ ও সচেতন। গ্রামীণ সমাজেও এখন আর বেদে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা নেই। তাইতো বেদেরা বাধ্য হয়েই পেশা পরিবর্তন করে চলছে প্রতিনিয়ত। পুরানো এই পেশা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নতুন পেশা খুঁজে নিয়েছে অনেক বেদেরাই। গ্রামে ঘুরে ঘুরে অনেক বেদেরাই ফেরি করে বিক্রি করছেন সিরামিক পণ্য, বাচ্চাদের খেলনা, মহিলাদের শাড়ী কাপড়।

বেদেরা সাধারণত ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে গ্রামে গঞ্জে ভ্রমণ করতেন। এই ভ্রমণকে তাদের ভাষায় বলে ‘গাওয়াল’। উপকূলীয় জেলা বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশালের একাধিক অস্থায়ী বেদে পল্লীরে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে যানা গেছে, বেদেদের ব্যবসায়িক পরিবেশ আস্তে আস্তে মন্দা হয়ে আসছে। তাই তারা গাওয়াল জীবন ছেড়ে অন্য কিছু করার চেষ্টা করছে। তারা এখন স্থায়ী জমি কিনে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করছে। স্থায়ী নিবাসের ব্যবস্থা বাড়ায় পরিবর্তন হয়ে আসছে তাদের জীবনতন্ত্র।

বেদে ঘরে পৌঁছেছে সৌর বাতি। ছবিটি পটুয়াখালির একটি বেদে বহর থেকে তোলা। ছবি : খায়রুল বাশার আশিক  স্বস্তির সন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে বেদে পল্লীতে। গত এক দশক আগের বেদে পল্লীতে দেখা যেত, কুপির আলোই ছিলো তাদের একমাত্র ভরসা। তবে বর্তমানের গাওয়ালি বেদে পল্লীতেও দেখা যায় সৌর প্ল্যানেট ব্যবহার করে তারা ডেরায় বাতি জ্বালায়। সোলার বাতির ব্যবহার বেদেদের জীবন পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।

সমগ্র সমাজব্যবস্থা উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও অধুনিকায়ন ঘটেছে। বৃদ্ধি পেয়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বেদেদের প্রতিটি পরিবার এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। প্রতিটি ডেরায় স্বামী-স্ত্রী দুজনের না হলেও কমপক্ষে একজন মোবাইল ব্যবহার করে।

বেদেরা সাধারণত গাওয়ালে বের হলে নৌকা ব্যবহার করত। নদীনির্ভর বাংলাদেশে বেদেদের প্রধান বাহন ছিলো নৌকা। নৌকায় সংসার নিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো ছিলো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য। এখন বেদেরা গাওয়ালে বের হলে নৌকার ব্যবহার ততটা করে না। বর্তমানে স্থান বদলে ব্যবহার করে সড়ক পথ। বাসের ছাদে প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য মালামাল তুলে নিয়ে তারা চলে আসে দূর দূরান্তে। কিংবা বহরের সবাই মিলে মাহিন্দ্র বা মিনি ট্রাক ভাড়া করে চলে যায় তাদের গন্তব্যে। তাদের জীবন ব্যবস্থায় নৌকার উপস্থিতি এখন নেই বললেই চলে। নৌকার ব্যবহার হ্রাস বেদে সমাজের অন্যতম পরিবর্তনের নিদর্শন।

বরগুনা সদরের একটি বেদে বহর। ছবি : খায়রুল বাশার আশিক

সামাজিকতার পিছিয়ে নেই বেদে সমাজ। আনুমানিক এক দশক আগেও বেদে পল্লীতে ছিলো না ততটা সামাজিকতার ছোঁয়া। তবে এখনকার বেদে বহরে বাইরের কোনো অতিথি গেরে তাকে চেয়ারে বসানোর ব্যবস্থা করে। খাবারের আপ্যায়ন করে। তাদের শিশুগুলোকে মিসতে দেয় সবার সঙ্গে। সব আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে সমাজকে গতিশীল করতে তাদের জীবনেও এসেছে সামাজিকতা।

এমন শত পরিবর্তন সাধিত হলেও তাদের জীবন এখনও অমানবিক। বেদেরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নেই নাগরিক অধিকার লাভের পন্থা। জন্ম নিবন্ধন করা হয় না বেদে বহরের শিশুদের। জন্মের পর টিকা দেওয়া হয় না এসব শিশুদের। বহরের কাছাকাছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও স্কুলের বারান্দায় ওরা যায় না। এ শিশুরা সারাক্ষণ দুরন্তপনায় দিন কাটায় তাঁবুর আশেপাশে। ফলে শিক্ষার আলো থেকে প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে ওরা। শিক্ষা বিচ্ছিন্ন এসব শিশুরা দেশের বোঝা হয়ে বেড়ে উঠছে। এই উপলব্ধি কেবল সুশীল সমাজের নয়। খোদ বেদে পরিবারগুলোও বোঝে তাদের শিশুদের আগামীর করুণ পরিণতি। তবে কিছুটা হলেও শিশু শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে বেদে পরিবারগুলো। পরিবারগুলো আজকাল প্রতিটি সন্তানকে না হলেও, মেধা বিবেচনায় দুই-একজনকে পড়ালেখা শেখাচ্ছে। গাওয়ালে বেড় হলেও তারা সব সন্তানকে সঙ্গে আনে না। সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে বেদেরা এখন চিন্তা করে।

ঘরের পাশেই চলছে বেদে শিশুদের খুনসুটি। ছবি : খায়রুল বাশার আশিক  বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কর্ণকাঠি বেদে বহরের এমন একজন বেদে নসাই। তিনি বলেন,‘এই কামে এখন আর পয়সা নাই, বাপ দাদারা কইরে গেছে তাই এই জীবনের লগে জড়াইয়ে আছি। একটুখানি জমিন কিনতে পারলেই পরিবার লইয়ে এই গাওয়ালি (ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা) ছাইড়ে দেব।’

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করা মানেই জীবন ব্যবস্থার উন্নতি নয়। অন্য পেশা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বেদেরা ভিক্ষাবৃত্তির মতো পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। বিয়ের সাহায্য চেয়ে দল বেধে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেদেরা।

সমাজের অঙ্গ হিসেবে বেদেদের বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেদে জীবন ও জীবিকায় বংশগত পেশার টান আস্তে আস্তে নাজুক হয়ে এসেছে নানা কারণে। ফলে তাদের জীবন ব্যবস্থায় এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। বেদেদের জীবন ব্যবস্থায় পরিবর্তন, দেশের সার্বিক উন্নয়নের একটি প্রতিচ্ছবি।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেবি