২৬ টাকার জন্য খেটেছেন জেল, লাদাখ দখলে অসামান্য কৃতিত্ব তার

ঢাকা, বুধবার   ০১ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ১৭ ১৪২৮,   ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

২৬ টাকার জন্য খেটেছেন জেল, লাদাখ দখলে অসামান্য কৃতিত্ব তার

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৮ ২১ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:৩৪ ২১ নভেম্বর ২০২১

২৬ টাকার জন্য খেটেছেন জেল, লাদাখ দখলে অসামান্য কৃতিত্ব তার। ছবি সংগৃহীত

২৬ টাকার জন্য খেটেছেন জেল, লাদাখ দখলে অসামান্য কৃতিত্ব তার। ছবি সংগৃহীত

যদি সেতান ফুন্টসোগ নাম এই ব্যক্তি না থাকতেন, তাহলে লাদাখে থ্রি ইডিয়টসের শ্যুটিং হতো না, হয়তো কোনো ফুংশুক ওয়াংড়ু ও তৈরি হতো না। লাদাখ যে আজও ভারতে তার কারণ তিনিই। পাকিস্তানের লাদাখ দখল আটকেছিলেন। তার সাহায্য পেয়েই লাদাখ সীমান্তে চরম বিপদের মুহূর্তে বলবৃদ্ধি হয়েছিল ভারতীয় সেনার। তারপরও সেতানকে খুব কম মানুষই চেনেন। 

সেতান ফুন্টসোগভারতীয় সেনা অবশ্য সেতানের ঋণ ভোলেনি। যুদ্ধের সময়ে ভারতীয় বাহিনীর দায়িত্বে থাকা এক মেজর জেনারেল কর্নেল ঠাকুর পৃথিবী চাঁদ তার বইয়ে লিখে গিয়েছেন, কীভাবে সেতান সাহায্য করেছিলেন, পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কঠিন সময়ে। ১৯৪৮ সালে ভারতভুক্তি আইনে কিছুদিন আগেই স্বাক্ষর করেছেন কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিংহ। সেই পদক্ষেপে ক্ষিপ্ত পাকিস্তান লাদাখ দখল করতে আসে। গিলগিট বাল্টিস্তানের স্কার্ডু ততদিনে পাকিস্তানের দখলে। লাদাখ নিয়েও বেশ অনিশ্চিত সরকার। শেষ চেষ্টা হিসেবেই সেনা পাঠানো হয় নুব্রা ভ্যালিতে।

কর্নেল ঠাকুর পৃথিবী চাঁদপাকিস্তান থেকে লাদাখের প্রবেশ পথ নুব্রা। সেতান সেখানকার প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন। পেশায় সরকারি আধিকারিক। অথচ এই ঘটনার কয়েক বছর আগে সরকারই জেলে ভরেছিল সেতানকে। মাত্র ২৬ টাকা চুরির দায়ে শাস্তি হয়েছিল। পরে অবশ্য নির্দোষ প্রমাণিত হন তিনি। তাকে সসম্মানে ফিরিয়েও আনা হয় কাজে। তবে সেতানের জীবন বরাবরই ঘটনাবহুল। নানা ওঠাপড়ার সমাবেশ। বারবার ধাক্কা খেয়েছেন। আবার উঠে দাঁড়িয়েওছেন।

মাত্র ২৬ টাকা চুরির দায়ে শাস্তি হয়েছিল তার লাদাখের অভিজাত পরিবারের সন্তান। লাদাখি রাজার মন্ত্রী-সান্ত্রীরা সব সেতানেরই পরিবারের সদস্য। যদিও সেতান নিজে রাজকাজে আগ্রহী ছিলেন না। সেতানের বাবা ছিলেন বৌদ্ধ গুম্ফা রিজংয়ের প্রধান শিষ্য। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছে ছিল সেতানেরও। ছোট থেকেই গুম্ফায় শুরু হয় তার সন্ন্যাসী হওয়ার প্রশিক্ষণ। সেতানের প্রশিক্ষণ ততদিনে অনেকদূর এগিয়েছে। জ্ঞানী বলে নামও হয়েছে লাদাখে। তার সঙ্গে আলোচনা করতে প্রায়শই আসছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। 

জোসেফ গারগাঁরঠিক এই সময়েই তার দেখা হয় জোসেফ গারগাঁর সঙ্গে। লাদাখের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। তবে খ্রিস্টান ধর্মীয়। সেতানের জীবন দর্শন বদলে যায় জোসেফের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর। জোসেফের কন্য়ার প্রেমেও পড়েন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তবে বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম। জোসেফ জেদ ধরেন বিয়ে করতে হলে সেতানকে ধর্মান্তরিত হতে হবে। বাধ্য হয়েই খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন সেতান। বিয়ে হয়। তবে নিজের পরিবারের কোপে পড়েন সেতান। তাকে সব সম্পত্তি এবং সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেয় তার পরিবার। তবে সেতান হাল ছাড়েননি। এরপরেই সরকারি কাজে যোগ দেন তিনি। দেশের হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও অংশ নেন।

জোসেফের কন্য়ার সঙ্গে বিয়ে হয় সেতান ফুন্টসোগসেতান প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধে স্কার্ডু জয়ের পর তখন পাকিস্তানের হামলাকারীরা ক্রমশ এগোচ্ছে লাদাখ লক্ষ্য করে। পাকিস্তানের আক্রমণকারীদের ঠেকাতে কর্নেল পৃথিবীকে পাঠানো হয়েছে নুব্রায়। তার সঙ্গে মাত্র ১৪ জনের একটি দল। আর রাজ্যের এক প্লাটুন অর্থাৎ ৩০ জন সৈন্য। তবে এই কয়েকজন সৈন্য নিয়ে কীভাবে আক্রমণ ঠেকাবেন, তার কূল কিনারা পাচ্ছেন না পৃথিবী। নুব্রায় তখন বেশ প্রতিপত্তি সেতানের। পৃথিবী তার বইয়ে লিখেছেন, সেতানের কথায় নুব্রার গ্রামের ছেলেরা যোগ দিয়েছিলেন বাহিনীতে। তৈরি হয়েছিল প্রায় ২০০ জনের নুব্রা গার্ডস বা নুব্রা সুরক্ষা বাহিনী। সেতান সেই বাহিনীর দিনরাত খেয়াল রাখতেন। তারা ঠিক মতো খাবার পাচ্ছে কিনা, অস্ত্র পাচ্ছে কিনা, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা সব দেখতেন সেতান।

 তার সঙ্গে মাত্র ১৪ জনের একটি দলপৃথিবী লিখেছেন, ‘সকালে হয়তো দেখলাম তিনি সেনা শিবিরে কাজ করছেন। বিকেলে দেখা গেল যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের যানবাহনের বিষয়গুলো দেখা শোনা করছেন।’এমনকি বহুবার সেতানের যোগাযোগ মারফত পাওয়া খবরেই অনেক বড় হামলার হাত থেকে বেঁচেছেন বলেও ঐ বইয়ে লিখেছেন পৃথ্বী। শেষপর্যন্ত যুদ্ধ জিতেছে ভারতীয় সেনা। যার অনেকটা কৃতিত্ব পৃথিবীকে দিয়েছেন সেতানকেই। এরপরেও অনেক কিছু হয়েছে সেতানের জীবনে। জন ব্রে নামের এক ঐতিহাসিক তার কথা লিখেছেন।

 কখনো তিব্বতের শরণার্থীরা তার থেকে উপকৃত হয়েছেন তো কখনো খ্রিস্টান মিশনারিরাজন জানান, যখনই সুযোগ পেয়েছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন সেতান। কখনো তিব্বতের শরণার্থীরা তার থেকে উপকৃত হয়েছেন তো কখনো খ্রিস্টান মিশনারিরা। সেতানের সাহায্য রথ থামেনি। পরে ছোটদের জন্য বিনামূল্যের স্কুলও খুলেছেন। ১৯৭৩ সালে মৃত্যু হয় সেতানের। পৃথিবী লিখেছেন,‘আমার কাছে সেতান সেরা লাদাখি। তার মতো মানুষ দেখিনি। সেতানের মৃ্ত্যু অনেকের কাছেই দুঃখের। তবে আমি আমার এক বন্ধু আর একইসঙ্গে একজন আদর্শ মানুষকে হারিয়েছিলাম।’

সূত্র: আনন্দবাজার 

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএ