অভিশাপ আর কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত মুক্তা, নষ্ট করেছে বহু দাম্পত্যজীবন

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

অভিশাপ আর কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত মুক্তা, নষ্ট করেছে বহু দাম্পত্যজীবন

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১২ ৪ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ১৬:২২ ৪ অক্টোবর ২০২১

রানি ব্ল্যাডি মেরির অভিশপ্ত সেই মুক্তা লা পেরেগ্রিনা

রানি ব্ল্যাডি মেরির অভিশপ্ত সেই মুক্তা লা পেরেগ্রিনা

‘মেরি মেরি কুইট কন্ট্রারি’ ছড়াটি নিশ্চয় মনে আছে? তবে এর সঙ্গে যে অন্ধকার ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে তা অনেকেরই অজানা। মেরি টুডোরের ব্যবহৃত সব জিনিসই অভিশপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কেবল একটি জিনিস বাদে। অন্যান্য জিনিসগুলো পরবর্তিতে কেউ কখনো ব্যবহার করেননি। তবে সেই জিনিসটি  আজো মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে। এমনকি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোর একটি এটি। জিনিসটি হচ্ছে একটি ১ ইঞ্চি মাপের মুক্তা, যার নাম লা পেরেগ্রিনা। অভিশপ্ত হলেও এর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয় মানুষ। 

শোনা যায় ১০ হাজার ঝিনুকের মধ্যে নাকি মাত্র একটিতে মুক্তার সন্ধান পাওয়া যায়। তাও সেসব কয়েক মিলিমিটার ব্যাসের। সেটারই দাম অনেক। আর যে মুক্তার ব্যাস ১ ইঞ্চি, তার দামের নাগাল পাওয়া তো কঠিন হবেই। প্রায় ৫০০ বছর ধরে এই মুক্তার সমান আর কোনো মুক্তা পাওয়া যায়নি। শোনা যায় ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে পানামা উপসাগরের বুকে পাওয়া যায় এই মুক্তোটি। গোটা লাতিন আমেরিকাজুড়ে তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে স্প্যানিয়াড বাহিনী। সেখানকার স্থানীয় মানুষরা প্রত্যেকেই ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছেন। তেমনই এক ক্রীতদাস ঝিনুকের বুক থেকে খুঁজে পায় মুক্তাটি। পুরোপুরি গোল নয় এই মুক্তা। বরং দেখতে ঠিক একটি অশ্রু ফোঁটার মতো। মুক্তাটি দেখে স্প্যানিয়াডরা এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে সেই ক্রীতদাসকে নাকি বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়।

রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ রানি মেরিকে প্রথম এই মুক্তাটি উপহার দেন এরপর পানামার শাসক ডন পেদ্রো দি টেমেজের হাত থেকে মুক্তাটি এসে পৌঁছায় স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের হাতে। তিনি এই মুক্তা একটি নেকলেসে বাঁধিয়ে উপহার দেন তার স্ত্রী ইংল্যান্ডের রানি মেরিকে। তিনিই ইতিহাসের সেই কুখ্যাত মেরি টুডোর। যার গর্ভে নাকি দুবার শয়তানের জন্ম হয়েছিল। তবে সেইসব কাহিনি নিতান্তই মনগড়া হতে পারে। কিন্তু মেরি টুডোরের বৈবাহিক জীবন যে সুখের হয়নি, সে-কথা ঐতিহাসিক সত্য। আর অদ্ভুতভাবে এই কথাও সত্যি, লা পেরেগ্রিনা যখন যার কাছে থেকেছে, কারোরই জীবন সুখের হয়নি। মেরি টুডোরের মৃত্যুর পর আবারও স্পেনের রাজবংশে ফিরে আসে মুক্তোটি। বলা বাহুল্য, এমন একটা মুক্তোকে ঐশ্বর্যের প্রতীক হিসাবেই মেনে নিয়েছিল স্পেনের রাজপরিবার। অভিশাপের কথা তাদের মাথায় ছিল না।

৫০০ বছর ধরে এই মুক্তার সমান আর কোনো মুক্তা পাওয়া যায়নিস্পেনের প্রায় সমস্ত রানির ছবিতেই দেখা যায় এই মুক্তোখচিত নেকলেস। এমনিতে সবসময় যে পরে থাকতেন, এমন নয়। কিন্তু কোনো অভিজাত মণ্ডলীর সভা বা আন্তর্জাতিক সমাবেশ থাকলেই রাণিদের গলায় ঝুলত এই লকেট। এর মধ্যে স্পেনের রানি ইসাবেলের বিবাহবহির্ভূত প্রেম এক কিংবদন্তি কাহিনি হয়ে ওঠে। তবে সেই প্রেমিককেও হত্যা করেন কোনো অজ্ঞাত আততায়ী। রানি ইসাবেলের হাত থেকে এই মুক্তো আসে রানি মারিয়ানার হাতে। তার ৫ সন্তানের মধ্যে ৩ জন শৈশবেই মারা যায়। বাকি দুই সন্তানও শারীরিক অসুখে ভুগতে থাকেন। শেষপর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিলেন প্রজনন ক্ষমতা। এইসব ঘটনার পরেই যেন একটু নড়েচড়ে বসে স্পেনের রাজপরিবার। লুকিয়ে ফেলা হয় মুক্তোটি। আবার তার সন্ধান পাওয়া যায় ১৮০৮ সালে নেপোলিয়ানের স্পেন আক্রমণের সময়।

এলিজাবেথকে বিখ্যাত অভিনেতা রিচার্ড বার্টন এই নেকলেসটি উপহার দেন, তারপরই তাদের দাম্পত্যজীবনের অবসান হয় স্পেন জয় করে নেপোলিয়ান তার ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে সিংহাসনে বসান। ১৮১৩ সালে জোসেফ বোনাপার্টকে স্পেন ছাড়তে হয়। কিন্তু তিনি লা পেরেগ্রিনাকে নিয়ে আসেন ফ্রান্সে। তারপর সেটা তৃতীয় নেপোলিয়ানকে উপহার হিসাবে দান করেছিলেন। তৃতীয় নেপোলিয়ান যখন এর অভিশাপের কথা জানতে পারলেন, তখনই ঠিক করলেন তা আর সঙ্গে রাখবেন না। তাই শেষ পর্যন্ত লন্ডনের ডিউক অফ অ্যাবারকর্নকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন মুক্তাটি। লন্ডনের অসংখ্য অভিজাত পরিবারের মধ্যে এই একটি পরিবারের কলহের কথা তখন সারা ইংল্যান্ড জেনে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বীতশ্রদ্ধ ডিউক ১৯৬৯ সালে মুক্তাটি নিলামে তোলেন।

নেপোলিয়ান তার ভাই জোসেফকে এই মুক্তা উপহার দিয়েছিলেন, কিন্তু এর অভিশাপের কথা শুনে তা তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন সথেবি’জ আয়োজিত সেই নিলামে ৩৭ হাজার ডলার দিয়ে মুক্তাটি কিনে নেন বিখ্যাত অভিনেতা রিচার্ড বার্টন। সেই বছরই ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে এই মুক্তাটি লকেটে বাঁধিয়ে উপহার হিসেবে পাঠালেন তার তৎকালীন স্ত্রী এলিজাবেথ টেলরের হাতে। টেলরেরও পছন্দ হয়েছিল মুক্তাটি। এরপর তার প্রায় সমস্ত ফটোতেই দেখা যায় সেই লকেট। একাধিক সিনেমাতেও সেটি পড়েছেন। তবে টেলর আর বার্টনের দাম্পত্যকলহও বলিউডের সবচেয়ে মুখোরোচক কাহিনি হয়ে উঠতে সময় লাগেনি। এমনকি প্রকাশ্যে ক্যামেরার সামনে হাতাহাতি করতেও দেখা গিয়েছে তাদের। বলা বাহুল্য, বহু মানুষের বিশ্বাস এই সবকিছুর পিছনে দায়ী মেরি টুডোরের অভিশাপ।

লা পেরেগ্রিনা যার কাছেই গিয়েছে রানির অভিশাপ তাকেই গ্রাস করেছে ২০১১ সালে এলিজাবেথ টেলরের মৃত্যুর পর আবারও নিলামে ওঠে মুক্তাটি। এবারে দাম ওঠে ১ কোটি ১৮ লাখ মার্কিন ডলার। তবে ক্রেতার নাম জানা যায়নি এখনও অবধি। তিনি কি শান্তিতে আছেন? নাকি এখনও এই মুক্তার পিছনে ধাওয়া করে যাচ্ছে মেরি টুডোরের অভিশাপ! হয়তো তাই। রানির অভিশাপ এখনো ভর করে আছে মুক্তাটিতে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে