ব্যাগপ্যাক নিয়ে রোজ নিজের বাজার নিজেই করত লালা 

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

ব্যাগপ্যাক নিয়ে রোজ নিজের বাজার নিজেই করত লালা 

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০১:৫২ ৩ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ০২:০৯ ৩ অক্টোবর ২০২১

মাছের জালের সঙ্গে জাহাজে উঠে এসেছিল পেঙ্গুইনটি ছবি: সংগৃহীত

মাছের জালের সঙ্গে জাহাজে উঠে এসেছিল পেঙ্গুইনটি ছবি: সংগৃহীত

১৯৮৬ সালের কথা। সেসময় জাপানের শিবুশি শহরে প্রতিদিন সকালে একটি পেঙ্গুইনকে ব্যাগপ্যাক নিয়ে হাঁটতে দেখা যেত। নাহ, সিনেমার কোনো দৃশ্য বর্ণনা করছি না। বাস্তবেই এমন ঘটনা ঘটেছিল এই শহরে। জাপানের সব থেকে দক্ষিণে আছে কিউশু দ্বীপ। এই দ্বীপের একটি উপকূলবর্তী শহর হল শিবুশি। শহরটি থেকে কিছু দূরে থাকা চান রোডে, স্ত্রী ও দুই কন্যা নিয়ে আশির দশকে বাস করতেন ইউকিও নিশিমোতো। পেশায় তিনি একজন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার। তার প্রিয় বন্ধু ছিলেন আকিহিরো। তিনি পেশায় মৎস্যজীবী। তবে সাধারণ মৎস্যজীবী নন। মাঝ ধরার ছোট জাহাজ ছিল তার। সেই জাহাজ নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে ব্লু-ফিন টুনা ধরে বেড়াতেন। বছরে ছ’মাস কাটত সমুদ্রেই।

একবার পারিবারিক আড্ডায় ইউকিও তার বন্ধু আকিহিরোকে বলেছিলেন, তার সবচেয়ে প্রিয় সামুদ্রিক জীব হল পেঙ্গুইন। তার খুব ইচ্ছা, একটি স্টাফ করা পেঙ্গুইনের দেহ তিনি তার ড্রইং রুমে রাখবেন। আকিহিরো বলেছিলেন, স্টাফ করা পেঙ্গুইন পাওয়া খুবই কঠিন। তবে অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডে খোঁজ করলে পাওয়া যেতে পারে। তিনি জাহাজ নিয়ে ওদিকে গেলে খোঁজ করবেন।

জাপানের কিউশু দ্বীপের একটি উপকূলবর্তী শহর হল শিবুশিপ্রত্যেক বছরের মতো ১৯৮৬ সালেও জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে ভেসেছিলেন আকিহিরো। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে মাছ ধরতে ধরতে পৌঁছে গিয়েছিলেন দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে। একদিন বিকেলে জাল টেনে তোলার পর নাবিকেরা দেখেছিলেন, টুনা মাছের সঙ্গে জালে আটকা পড়েছে একটি কিং পেঙ্গুইন। জালের সঙ্গে লাগানো তারের আঘাতে পেঙ্গুইনটির ডানা ভেঙে গিয়েছিল। নিজেকে মুক্ত করার প্রাণপণ চেষ্টায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল ঠোঁট। নাবিকেরা পেঙ্গুইনটিকে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আকিহিরো সে কথা শোনেননি। তার মনে হয়েছিল ডানাভাঙা পেঙ্গুইনটিকে সমুদ্রে ছেড়ে দিলে হাঙড়ে খেয়ে নেবে বা পেঙ্গুইনটি এমনিই মাছ ধরতে না পেরে মারা যাবে।

জাহাজের খোলে যেখানে মাছ রাখা হত, সেই কনকনে ঠাণ্ডা ঘরে স্থান পেয়েছিল মৃতপ্রায় কিং পেঙ্গুইনটি। পেঙ্গুইনটির চিকিৎসা শুরুও হয় জাহাজেই। ছোট ছোট ম্যাকারেল, সার্ডিন মাছ রেখে দেওয়া হত তার খাওয়ার জন্য। ধীরে ধীরে পেঙ্গুইনটি সুস্থ হয়ে উঠে। দিনের বেশিরভাগ সময়েই পেঙ্গুইনটি ঠাণ্ডা ঘরের বাইরে থাকত। সারাদিন ডেকে ঘুরত ফিরত, সাগর দেখত। কিন্তু সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পালাবার চেষ্টা করত না। গরম লাগলে নেমে যেত ঠাণ্ডা ঘরে। যেন মানুষের হিংস্রতার বিপরীত দয়ালু রূপটাও দেখা হয়েছিল তার। ধীরে ধীরে সে জাহাজেরই একজন হয়ে উঠে। এইভাবে প্রায় তিনমাস কাটার পর আকিহিরোর জাহাজ ফিরে এসেছিল শিবুশির ডকে।

প্রতিদিন এভাবেই ব্যাগপ্যাক ঝুলিয়ে বাজারে যেত লালা সেই রাতেই আকিহিরোর ফোন দিয়ে ইউকিও নিশিমোতোকে জানায়, “কাল সকালেই চলে এসো। তোমার জন্য একটা জীবন্ত পেঙ্গুইন নিয়ে এসেছি। দেখো বাঁচে কিনা। না বাঁচলে স্টাফ করে ঘরে রেখে দিও।” উত্তেজনায় সে রাতে ঘুম হয়নি ইউকিওর। পরদিন সকাল হতে না হতেই গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন আকিহিরোর বাড়ি। নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন বছর দশেকের পুরুষ পেঙ্গুইনটিকে। ইউকিওর স্ত্রী পেঙ্গুইনটির নাম রেখেছিলেন ‘লালা’।

ইউকি আকিহিরোকে কথা দিয়ে এসেছিলেন, তিনি পেঙ্গুইনটিকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। হেসেছিলেন আকিহিরো, কারণ শীতের দেশের পেঙ্গুইনকে শিবুশির উষ্ণ ও আদ্র পরিবেশে পেঙ্গুইনটিকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। তবুও নিশিমোতো পরিবার, স্থানীয় পশু চিকিৎসক ও ইউকিওর বন্ধুরা মিলে পেঙ্গুইনটিকে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন।

লালার জন্য সিঁড়ির তলায় একটি কাচের ঘর বানানো হয়েছিল। সেই ঘরে লাগানো হয়েছিল এমন একটি এয়ারকন্ডিশনার, যেটির সাহায্যে ঘরের তাপমাত্রা দশ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে মাইনাস দশ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাবে। ঘরে লাগানো হয়েছিল একটি আয়না। যাতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে পেঙ্গুইনটি ভাবে ঘরে তার কোনও সঙ্গী আছে। পেঙ্গুইনদের চরিত্র আরও ভালো করে বোঝার জন্য, প্রচুর বই কিনেছিলেন ইউকিও। ধীরে ধীরে নিশিমোতো পরিবারে মানিয়ে নিয়েছিল কিং পেঙ্গুইন লালা।

লালা ছিল দশ বছর বয়সী একটা পুরুষ পেঙ্গুইন কিছুদিনের মধ্যেই লালা সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছিল। বিজ্ঞের মত হেলতে দুলতে ঘরের প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত। বাড়ির পিছনের বাগানে ইউকিও যখন কাজ করতেন, গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার কাজ দেখত। ইউকিওর দুই মেয়ের যখন সন্ধ্যাবেলা পড়তে বসতো, লালা নিয়ম করে তাদের ঘরে ঘুরে আসত। তার ভাবভঙ্গী দেখে মনে হত সে বুঝি বলতে চাইছে, “পড়ছো তো, নাকি ফাঁকি মারছো?” তার ভাবভঙ্গী দেখে হেসে লুটোপুটি খেত ইউকিওর মেয়েরা।

রোজ সকালে উঠে ইউকিও পেঙ্গুইনটির জন্য বাজারে মাছ কিনতে যেতেন। নিজের ঘর থেকে সেটা লক্ষ্য করতো লালা। একদিন ইউকিও লালার জন্য মাছ কিনতে বেরিয়েছিলেন। রাস্তার লোকজনের চিৎকার শুনে ইউকিও পিছন ফিরে দেখেছিলেন, তাঁর পিছন পিছন হন্তদন্ত হয়ে আসছে লালা। ইউকিও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু লালাকে বাড়িতে দিয়ে আসেননি। নিয়ে গিয়েছিলেন মাছের বাজারে। যে দোকান থেকে লালার জন্য মাছ কিনতেন, সেই দোকানের লোকেরা পেঙ্গুইনটিকে দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ইউকিও বলেছিলেন এই পেঙ্গুইনটির জন্যেই তিনি রোজ মাছ কিনতে আসেন।

রোজ পাঁচটি মাছ বরাদ্দ ছিল লালার জন্য। ইউকিও দোকানেই লালাকে ব্রেকফাস্ট দিয়ে দিতে বলেছিলেন। লালার মুখের সামনে ধরা হয়েছিল একটি সার্ডিন মাছ। মাছটি গিলে নিয়ে দোকানটিতে থাকা মাছগুলো ঘুরে দেখতে শুরু করেছিল লালা। অভিজ্ঞ ক্রেতার মতো। যেন পছন্দ হলেই কিনে নেবে। দোকানি চারটি মাছ ইউকিওর ব্যাকপ্যাকে ভরে দিয়েছিলেন। লালা সেটা দেখেছিল।

বাজারে গিয়ে নিজের খাবার নিজেই নিয়ে আস্ত প্রতিদিন এরপর সকাল হলেই ইউকিওর সঙ্গে বাজারে আসার জন্য উশখুশ করত লালা। রোজই লালাকে মাছ কিনতে নিয়ে যেতেন ইউকিও। লালাকে দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে থাকত পাড়ার লোকেরা। কিছুদিনের মধ্যেই এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল লালা। বাজারে যাওয়ার পথে কোনো বাড়ির দরজায় কাউকে দেখতে না পেলেই সে দাঁড়িয়ে পড়ত, যেন বলতে চাইত, মানুষগুলো গেল কোথায়! আজ তো দেখছি না!

একদিন কিছুটা মজা করেই লালার পিঠে ইউকিও বেঁধে দিয়েছিলেন ছোট মেয়ের ব্যাকপ্যাক। তাকে অবাক করে দরজা পেরিয়ে লালা নেমে পড়েছিল রাস্তায়। একাই চলেছিল বাজারের দিকে। তার পিছন পিছন চলেছিল নিশিমোতো পরিবার। তার পিছনে প্রতিবেশীরা। তাদের সবাইকে অবাক করে লালা পৌঁছে গিয়েছিল সেই দোকানে। যেখান থেকে তার জন্য মাছ কেনা হত। দোকানিও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ইউকিও সেদিন দোকানে ঢোকেননি। দোকানিকে দূর থেকে ইশারায় বলে দিয়েছিলেন, লালার ব্যাকপ্যাকে মাছ দিয়ে দিতে।

দোকানি পাঁচটি মাছ নিয়ে লালার ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু লালা কিছুতেই ব্যাকপ্যাকে মাছ ঢোকাতে দেবে না। হাঁ করে সে বোঝাতে চাইছিল, তার আগে ব্রেকফাস্ট চাই। অনেক বেলা হয়ে গেছে। দোকানি একটি ম্যাকারেল মাছ মুখের সামনে ধরতেই গব গব করে খেয়ে নিয়েছিল লালা। এরপর বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়েছিল। দোকানি তার ব্যাকপ্যাকে মাছ ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। দোকান থেকে বেরিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিল লালা। তার কাণ্ড দেখার জন্য সেদিন বিরাট ভিড় হয়ে গিয়েছিল রাস্তায়। কিন্তু লালার কোনও ভ্রুক্ষেপ ছিল না। ছাপোষা গৃহস্থের মত বাজার শেষে সোজা বাড়ির পথে রওনা হয়েছিল।

লালা বাজারে ঘুরে ঘুরে নিজের পছন্দ মতো মাছ কিনতসেই শুরু, তারপর থেকে রোজ সকালে স্নান সেরে নিজের জন্য মাছ কিনতে যেতো লালা। ইউকিও আর লালার সঙ্গে মাছ কিনতে যেতেন না। কারণ তিনি জানতেন গোটা পথে অজস্র চোখ লালার ওপর নজর রাখছে। সত্যিই এলাকায় অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল লালা। গ্রীষ্মকালে তেতে ওঠা পিচের রাস্তায় পাছে লালার হাঁটতে কষ্ট হয়, তাই পুরো রাস্তায় জল ঢেলে রাখতেন আশেপাশের বাড়িগুলির বাসিন্দারা।

রোজ নিজের জন্য বরাদ্দ মাছ কিনে বাড়ি ফিরতো লালা। মাছের দাম মাসের শেষে মিটিয়ে দিতেন ইউকিও। তবে ম্যাকারেল ও সার্ডিন মাছ ছাড়া অন্য কোনও মাছ মুখেই তুলত না লালা। দোকানিরা একবার দুবার ব্রেকফাস্টে অন্য মাছ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু লালা অন্য মাছ দেখলেই মুখ ফিরিয়ে নিতো। যেন বলতে চাইতো, “আমার পছন্দের মাছ দিলে দাও, নইলে চললুম। সক্কাল সক্কাল জ্বালিও না।” এমনই রাজকীয় ছিল তার হাবভাব।

ইউকিওর ছেলে ছিল না। লালাই ছিল তার ছেলে। ইউকিও যখন বিছানায় শুতেন। লালা তার সঙ্গে খুনশুটি করত। মাথার চুলে ঠোঁট দিয়ে বিলি কেটে দিতো। তিনফুটের লালা কখনও কখনও ইউকিওকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যেতো তার ঘরে। সেখানে গিয়ে ইউকিওকে শুয়ে থাকতে হতো হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায়। তার বুকের ওপর চুপটি করে বসে থাকত লালা। এই ভাবে কেটেছিল প্রায় বারো বছর।

ইউকি লালাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবেসে বড় করেছেন দুটি ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে এই অকৃত্রিম ভালোবাসা সংবাদ মাধ্যমের নজর এড়ায়নি। দেশি বিদেশি সাংবাদিকেরা ভিড় করতেন ইউকিওর বাড়িতে। বাড়িতে ভিড় একদম পছন্দ করতো না লালা। বিরক্ত হয়ে চলে যেতো অন্য ঘরে। তবুও সংবাদ মাধ্যমের জন্যেই পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল লালা। জাপানের অনান্য দ্বীপ থেকে তো বটেই, জাপান ঘুরতে আসা ভিনদেশী পর্যটকেরাও লালাকে দেখতে আসতেন। সঙ্গে নিয়ে আসতেন লালার পছন্দের মাছ।

বাইশ বছর বয়েসে চলে গিয়েছিল লালা। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন ইউকিও। যদিও তিনি জানতেন কিং পেঙ্গুইনদের আয়ু খুব বেশি হলে তিরিশ বছর। তবুও শোক সামলাতে পারেননি। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বন্ধু আকিহিরো বলেছিল লালার দেহটা স্টাফ করে ঘরে রেখে দিতে। কান্নাধরা ধরা গলায় ইউকিও বলেছিলেন,” কেউ কি তার সন্তানের দেহ স্টাফ করে ড্রইং রুমে সাজিয়ে রাখতে পারে!”

ফুলে ফুলে ঢাকা এক পার্কে সমাধি দেওয়া হয়েছিল লালাকে। জলভরা চোখ নিয়ে সেদিন উপস্থিত ছিলেন লালার কয়েকশো প্রতিবেশী। ইউকিওর মতোই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মাছ বিক্রেতা হিরুকি। হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে এসে মন জয় করে নেয়া লালাকে কেউ ভুলতে চাননি। তাই যে পথ দিয়ে লালা রোজ মাছ আনতে যেত, সেই রাস্তাটির নাম রাখা হয়েছিল লালা-চান রোড।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে