‘নরকের কূপে’ বন্দি জিন, ভেতর থেকে আসে অদ্ভুত গন্ধ

ঢাকা, শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১,   অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৮,   ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘নরকের কূপে’ বন্দি জিন, ভেতর থেকে আসে অদ্ভুত গন্ধ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০১ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৪:০৭ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১

‘নরকের কূপে’ নামও মুখে আনে না কেউ

‘নরকের কূপে’ নামও মুখে আনে না কেউ

ইয়েমেনিরা অবশ্য এর ধারে কাছে ঘেঁষেন না। এমনকি নাম করতেও ভয় পান। তাদের ধারণা, নাম উচ্চারণ করলে অভিশাপ নেমে আসতে পারে। কাছে গেলে এর বিশাল হাঁ-মুখ চোখের নিমেষে ভেতরে টেনে নেবে তাদের। এটি একটি কূপ। বিশাল এক হাঁ-মুখ তার। তার গভীর থেকেও গভীরে দেখা যায় না কিছুই। 

নাম বারহুট কূপ। তবে নামে কূপ হলেও তা জলহীন। অথচ তাকে জুজুর মতো ভয় পান ইয়েমেনের মানুষ। ঠিকানা ইয়েমেনের আল-মাহার প্রদেশের একটি মরুভূমিতে। প্রায় ১০০ ফুট চওড়া কূপটির গভীরতা ১১২ মিটার বা ৩৬৭ ফুট। একটি প্রমাণ মাপের ৩০ তলা বাড়ি অনায়াসে ঢুকে যাবে এই কূপের ভেতর। ইয়েমেনের মানুষ ঐ নাম মুখেও আনেন না। বারহুটকে তারা ডাকেন ‘ওয়েল অফ হেল’ বা 'নরকের কূপ' বলে ডাকেন। বাকি বিশ্বেও বারহুটের এই নামটিই জনপ্রিয় বেশি।

কাছে গেলে এর বিশাল হাঁ-মুখ চোখের নিমেষে ভেতরে টেনে নেবে তাদেরবারহুটকে ঘিরে তৈরি হওয়া অতিপ্রাকৃত ধারণার অবশ্য একটি ভিত্তি আছে। তা হল কয়েকশো বছর ধরে প্রচলিত ইয়েমেনের কিছু উপকথা। যেখানে বারবার এই কূপের উল্লেখ করা হয়েছে 'জিনদের কারাগার' হিসেবে। এ প্রসঙ্গে 'আরব্য রজনী'র আখ্যানে আলাদিনের ‘বন্ধু’ জিনের কথাও মনে পড়ে। আলাদিনের জিন যদিও প্রদীপে বন্দি ছিল। ইয়েমেনের উপকথায় দাবি, দুষ্ট জিনদের বন্দি করতেই এই অন্ধকূপ তৈরি হয়েছিল। এখানে এক বার ঢুকলে সাধারণ মানুষের বেঁচে ফেরা অসম্ভব।

এমনই নানা সংস্কার এবং ভয়ে বারহুটের রহস্যোদ্ঘাটন এত দিন হয়ে ওঠেনি। হাজার নাকি শত বছর ধরে এই কূপ রহস্য বয়ে বেড়াচ্ছে তার সঠিক কোনো তথ্যও নেই। ইয়েমেনিদের কখনো সাহসে কুলোয়নি কূপের রহস্য ভেদ করার। তবে মরুভূমির মাঝখানে ওই গর্তের ভেতর কী আছে, তা জানতে ভূতাত্ত্বিকেরা বরাবরই আগ্রহী ছিলেন। সম্প্রতি সেই আগ্রহ মেটানোর সুযোগও হল। ওমানের ১০ জন গুহাবিদ যাবতীয় সংস্কারকে শিকেয় তুলে বারহুট অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এদের মধ্যে আট জন কূপের ভিতর প্রবেশ করেছিলেন। বাকিরা তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন বাইরে।

ইয়েমেনের উপকথায় দাবি, দুষ্ট জিনদের বন্দি করতেই এই অন্ধকূপ তৈরি হয়েছিলভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৬৭ ফুট গভীরে বারহুটের তলদেশ। দিনের সব সময় ভাল করে আলোও পৌঁছায় না সেখানে। ওমানি গুহা বিশেষজ্ঞদের বারহুটের তলদেশ স্পর্শ করতে প্রায় অর্ধেক দিন লেগে যায়। তবে যে তথ্য তারা সংগ্রহ করেন, তার কাছে ওই পরিশ্রম লাঘব হয়ে যায়। বারহুটে কোনো ‘জিন’ বা দৈত্যের দেখা পাননি তারা। কোনো লোহার শলাকা গাঁথা কারাগারেরও নয়। তবে অদ্ভুত একটা গন্ধ পেয়েছেন।

মরুভূমির মাঝখানে ওই গর্তের ভেতর কী আছে, তা জানতে ভূতাত্ত্বিকেরা বরাবরই আগ্রহী ছিলেনগুহার ভেতরে বহু পশু পাখির মৃতদেহ পড়েছিল। গন্ধটি তার থেকেই তৈরি হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান গুহা বিশেষজ্ঞদের। তারা জানিয়েছেন, গন্ধটি পচনের নয়। অসহনীয়ও নয়। গন্ধের কারণ জানতে মৃত পশুপাখির দেহগুলো সংগ্রহ করে এনেছেন তারা। আর এনেছেন গুহার মাটি, পাথর, বৃষ্টির জমা জলের নমুনা।

গুহার নীচে এক ধরনের উজ্জ্বল সবুজ নিটোল গোল পাথরেরও সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এক ঝলকে দেখে মনে হতে পারে, পাতিলেবুর রঙের এবং আকারের মুক্তা। তবে আসলে সেগুলো মুক্তা নয়। গুহার ভেতর চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির জলের ক্যালসিয়াম থেকে এই ধরনের পাথর তৈরি হয়। নাম ‘কেভ পার্ল’ বা 'গুহা-মুক্তা'।

গুহার নীচে এক ধরনের উজ্জ্বল সবুজ নিটোল গোল পাথরেরও সন্ধান পাওয়া গিয়েছেগুহার ভেতর চুনাপাথরও পেয়েছেন ওমানিরা। তবে এ-সব কিছুর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান যে বিষয়টি তারা আবিষ্কার করেছেন, তা হল—সত্যি। এত দিন ধরে যে ভয় ইয়েমেনিদের কাবু করে রেখেছিল, তা যে আদতে ভিত্তিহীন তা প্রমাণ করে দিয়েছেন ওমানের এই গুহা বিশেষজ্ঞরা। বারহুটের কূপের সঙ্গে যে আর পাঁচটা প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি গহ্বরের গঠনগত তেমন তফাৎ নেই,  তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন।

ওমানি গুহা বিশেষজ্ঞদের বারহুটের তলদেশ স্পর্শ করতে প্রায় অর্ধেক দিন লেগে যায়গুহাবিদদের কথায়, এই ধরনের গহ্বরকে বলা হয় 'সিঙ্কহোল'। ভূপৃষ্ঠের নিচে জমে থাকা জলে পাথর ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয়ে গেলে এমন গর্ত তৈরি হয়। বাহরুটের মতো কূপ তৈরি হতে লক্ষাধিক বছর সময় লেগে থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান। তারা জানিয়েছেন, এর সঙ্গে দুর্ভাগ্য, বিপদ বা আতঙ্কের কোনো সম্পর্ক নেই।

গুহার ভেতর ‘কেভ পার্ল’ বা `গুহা-মুক্তা`ও পেয়েছেন ওমানিরাকিছুদিন আগেই ইয়েমেন সরকার জানিয়েছিল, তারা বারহুটে ৫০ মিটারের নীচে নামতে পারেননি। যারা নামছিলেন, তারা ভয় পেয়েছিলেন। ওমানি গুহাবিদরা অবশ্য জানিয়েছেন, তারা কোনো রকম ভয়কে গুরুত্বই দেননি। অজানাকে জানার অদম্য ইচ্ছেই 'নরকের কূপে'র মাটি স্পর্শ করতে তাদের সাহায্য করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত সত্যিটা জানতে এবং জানাতে পেরে তারা গর্বিত। গুহাবিদদের ধারণা, হয়তো কোনো উপকথায় কোনো দিন তাদের এই আবিষ্কারের কথাও লেখা হবে। আর সেটাই হবে তাদের পুরস্কার।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে