প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে সায়ানাইড দিয়ে প্রেমিকদের হত্যা করতেন ৭৪ বছরের বৃদ্ধা

ঢাকা, শনিবার   ১৬ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ২ ১৪২৮,   ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে সায়ানাইড দিয়ে প্রেমিকদের হত্যা করতেন ৭৪ বছরের বৃদ্ধা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০০:০৩ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ০০:৩৩ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

চিসাকো কাকেহি জাপানে  `ব্ল্যাক উইডো` নামেই পরিচিত

চিসাকো কাকেহি জাপানে `ব্ল্যাক উইডো` নামেই পরিচিত

সময়টা ২০১৩ সাল। জাপানের ইসাও কাকেহির বয়স ৭৫ বছর হলেও বেশ স্বাস্থ্যবান পুরুষ। মনের মধ্যে ভালোবাসার ইচ্ছাটাও ছিল প্রবল। আর নিঃসঙ্গতা ঘুচাতে জাপানি ম্যাচমেকিং এজেন্সির শরণাপন্ন হন। তাদের মাধ্যমেই তিনি খুঁজে পান ৬৭ বছর বয়সী বিধবা নারী চিসাকো কাকেহিকে। দু'মাসের মধ্যেই প্রণয় রূপ নেয় পরিণয়ে। বিয়ে করে কিয়োটোর মুকো শহরে নিজেদের নতুন সংসার শুরু করেন এই দম্পতি।

দুজনে মিলে নতুন বছর উদযাপন উপলক্ষে রাইস কেকও বানিয়েছেন। কিন্তু নতুন বছরের আলো দেখার সৌভাগ্য হয়নি ইসাও কাকেহির!২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর রহস্যজনকভাবে তিনি খুন হন। এর মাধ্যমে জাপানের কুখ্যাত 'ব্ল্যাক উইডো' খুনির চতুর্থ ও সর্বশেষ শিকারে পরিণত হন ইসাও কাকেহি।

৬১ বছর বয়স থেকে খুন করা শুরু করেন চিসাকো ভাবছেন 'ব্ল্যাক উইডো' সিরিয়াল কিলারের সঙ্গে ইসাও কাকেহির সম্পর্ক কি? 'ব্ল্যাক উইডো' আর কেউ নয়, ইসাও কাকেহির ভালোবেসে ঘরে তোলা স্ত্রী চিসাকো কাকেহি। ইসাও ছিলেন চিসাকোর সর্বশেষ শিকার। এরপরই তিনি ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। তিন প্রেমিককে খুন ও একজনকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে ৭৪ বছর বয়সী চিসাকো কাকেহির মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অবশ্য সেই রায় এখনো কার্যকর হয়নি।

প্রতিবারই আইনের হাত ফসকে বেরিয়ে যান গেছেন চিসাকো। তবে ইসাও কাকেহির মৃত্যুর পর পুলিশের তদন্তের সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে তার নাম। ২০১৪ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জাপানের অন্যতম দীর্ঘসূত্রি একটি মামলার শেষ ফলাফল হিসেবে ২০১৭ সালে চিসাকোকে মৃত্যুদণ্ড দেন দেশটির আদালত। চলতি বছরের জুনে তার আরেকটি আপিলও খারিজ হয়ে যায়।

 ১৯৬৯ সালে ২৩ বছর বয়সে প্রথম বিয়ে করেনজাপানের পাবলিক ব্রডকাস্টার এনএইচকে সূত্র অনুযায়ী, গত জুনে বিচারক জানান, চিসাকো নামের ওই নারী ম্যাচমেকিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে বয়স্ক পুরুষদের খুঁজে নিতেন। এরপর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের বিষ খাইয়ে হত্যা করতেন। চিসাকোর এই মামলা নিয়ে জাপানে তোলপাড় শুরু হয়। বিশেষত, বয়স্ক 'সিঙ্গেল' ব্যক্তিদের জন্য অনলাইনে সঙ্গী খোঁজা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সেইসঙ্গে আরো একটি প্রশ্ন জাগে সবার মনে, কেন নিজের জীবনের সায়াহ্নে এসে প্রেমের ফাঁদে ফেলে খুন করতেন এই নারী? চলুন জেনে নেয়া যাক চিসাকোর সম্পর্কে- 

ভয়ঙ্কর কীর্তির জন্য জাপানজুড়ে কুখ্যাত হয়ে উঠলেও চিসাকো কাকেহির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায়নি। তবে চিসাকোর খুন করা শুরু হয় ৬১ বছর বয়সে। তার জন্ম জাপানের দক্ষিণপশ্চিম সাগা অঞ্চলে। বড় হয়ে একটি প্রিন্টিং কারখানায় চাকরি নেন। ১৯৬৯ সালে ২৩ বছর বয়সে প্রথম বিয়ে করেন। ২৫ বছর সংসার করার পর ১৯৯৪ সালে অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যায় চিসাকোর স্বামী।

চিসাকো নিঃসঙ্গ বয়স্ক মানুষদেরই শুধু তার প্রেমের জালে ফাসাতেন ২০০৭ সালে ৭৮ বছর বয়সী তোশিয়াকি সুহিরো নামের একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন চিসাকো। সেই বছরেরই ১৮ ডিসেম্বর প্রেমিকের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারতে যান। এ সময় প্রেমিক সুহিরোকে 'ওষুধ' খাওয়ানোর নাম করে একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল খাইয়ে দেন তিনি। ১৫ মিনিট পরেই অচেতন হয়ে পড়েন সুহিরো। অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। চিসাকো নিজেই প্রেমিকের সঙ্গে হাসপাতালে যান। তবে  এ সময় অ্যাম্বুলেন্সকর্মীদের কাছে নিজেকে 'হিরাওকা' বলে পরিচয় দেন তিনি।

সায়ানাইড খাওয়ানোর পরও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান সুহিরো। কিন্তু বিষের প্রতিক্রিয়ায় তিনি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হন এবং তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র দেড় বছর। এভাবেই প্রথম শিকার করে হাত কিছুটা পাকিয়ে নিয়েছেন এই বৃদ্ধা। এর কয়েক বছর পর আবার নতুন শিকারের দিকে নজর দেন চিসাকো।

চিসাকোর ফাঁদে পা দেওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তিটির নাম মাসানোরি হোন্ডা। ডায়াবেটিসের মাত্রা কিছুটা কমে যাওয়ায় ২০১১ সালের দিকে প্রায়ই বিভিন্ন স্পোর্টস ক্লাবে দেখা যেত তাকে। তিনি চিসাকোর সঙ্গে কীভাবে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে বন্ধুদের কাছে এই যুগল জানিয়েছিলেন, তারা শিগগিরই বিয়ে করবেন।

সর্বশেষ ইসাওকে হত্যা করেন, এরপরই তিনি ধরা পড়েন পুলিশের হাতে পরবর্তী বসন্তেই চিসাকো তার কাজটি সেরে ফেলেন! ২০১২ সালের ৯ মার্চ একটি দোকানের ভেতরে হোন্ডার সঙ্গে দেখা করেন চিসাকো। এরপর দুজনে বিদায় নিয়ে যে যার পথে রওনা দেন। বিকাল পাঁচটার দিকে মোটরসাইকেল চালানো অবস্থায়ই অজ্ঞান হয়ে যান হোন্ডা। এর দুই ঘণ্টা পর হাসপাতালের ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে হার্ট অ্যাটাকে হোন্ডা মারা যান বলেই ধরে নেয় সবাই। 

পরবর্তীকালে পুলিশি প্রমাণ থেকে জানা যায়, চিসাকোর আসলে হোন্ডাকে বিয়ে করার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। হোন্ডার মৃত্যুর দু'মাস আগে থেকেই তিনি আরেক ব্যক্তির সঙ্গে গোপনে প্রেম করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা মিনোরু হিওকি বেশ একাকী অনুভব করতেন। তবে ২০১৩ সালের দিকে তার ক্যান্সার প্রায় সেরে যায় এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। তাই ৭৫ বছর বয়সে তিনি চিসাকোর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান।

হিওকি চেয়েছিলেন চিসাকোর সঙ্গে বাকি জীবনটা কাটাতে। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। ২০১৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রেমিকা চিসাকোর সঙ্গে নৈশভোজে গিয়েই তার জীবনাবসান ঘটে। চিসাকোর দ্বিতীয় স্বামী সুহিরোর মতো হিওকিও হেলথ সাপ্লিমেন্ট হিসেবে পিল খেতেন। তাই চিসাকোর পক্ষে তাকেও সায়ানাইড ক্যাপসুল খাইয়ে দেওয়া কঠিন ছিল না। 

বেছে বেছে ধনী আর নিঃসঙ্গ মানুষদের তার সিকার বানাতেন খাবার খাওয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হিওকি অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়েন। অ্যাম্বুলেন্স আসতে আসতে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় চলে যান এবং হাঁপাতে থাকেন। এবারও অ্যাম্বুলেন্সকর্মীদের কাছে মিথ্যা বলেন চিসাকো। হিওকির সন্তান আছে এবং তার ক্যান্সার সেরে গেছে জানার পরেও তিনি অ্যাম্বুলেন্সকর্মীদের জানান, হিওকির আপনজন কেউ নেই এবং তিনি ফুসফুস ক্যান্সারের রোগী। ডাক্তাররা হিওকিকে রিসাসিটেশন প্রক্রিয়ায় (পুনরুজ্জীবন) নিতে চাইলেও চিসাকো সেই অনুমতি দেননি। দুই ঘণ্টার মধ্যেই মারা যান হিওকি।

তার মৃত্যুর মাত্র দু'মাস পরেই ইসাও কাকেহিকে টার্গেট করেন এই বৃদ্ধা। ইসাওকে বিয়ে করার এক মাসের মধ্যেই তিনি গোপনে আরও একজনের সঙ্গে প্রেম শুরু করেন। বিয়ের কয়েক সপ্তাহ পর, এক রাতে নতুন স্ত্রীর সঙ্গে ডিনার শেষে কার্ডিওপালমোনারি অ্যারেস্ট হয় ইসাও কাকেহির। চিসাকো নিজেই অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন স্বামীর জন্য। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পরেই তিনি মারা যান ইসাও।

পাঠক হয়তো এতক্ষণে বেশখানিকটা বিরক্তই হয়েছেন। কেননা এতো গুলো মানুষ মারা গেল অথচ কীভাবে মারা গেল তা কেউ বুঝতেই পারল না! আসলে জাপানে মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত করার তেমন প্রচলন নেই। শুধুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক হলেই ময়নাতদন্ত করা হয়। আর এ কারণেই চিসাকোর সঙ্গীদের খুনের রহস্য সবার নজর এড়িয়ে যায়।

কিন্তু ইসাও কাকেহির মৃত্যু রহস্যজনক বলে সন্দেহ করায় লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। তাতেই বোঝা যায়, তার হৃদযন্ত্র, রক্ত ও পাকস্থলীতে প্রচুর পরিমাণ সায়ানাইড আয়রন রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তাকে পাউডার রূপে সায়ানাইড খাওয়ানো হয়েছিল। পুলিশ চিসাকো কাকেহির ঘর থেকে সাপ্লিমেন্ট পিল ও খালি ক্যাপসুল জব্দ করে। ধারণা করা হয়, তিনি হেলথ সাপ্লিমেন্ট খালি করে তার মধ্যে সায়ানাইড ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

নিজের সব অপরাধ স্বীকার করলেও মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাননি এই নারী২০১৪ সালে চিসাকোর ফেলে দেওয়া একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ উদ্ধার করেন তদন্ত কর্মকর্তারা, যার ভেতরে সায়ানাইডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আদালত জানান, চিসাকো এই সায়ানাইডগুলো তার কর্মস্থল প্রিন্টিং কারখানা থেকে সংগ্রহ করেন। দুই মাস পর পুলিশ চিসাকো কাকেহিকে গ্রেপ্তার করে এবং তিনি তার তিন প্রেমিককে সায়ানাইড খাইয়ে হত্যার কথা স্বীকার করে নেন।

চিসাকো কাকেহির চক্রান্তের শিকার হওয়া চার ব্যক্তির মধ্যে একটিই মিল ছিল- তাদের চারজনই ছিলেন যথেষ্ট পরিমাণ টাকাপয়সা ও সম্পদের অধিকারী। সেইসঙ্গে তাদের বৃদ্ধ বয়স ও সিঙ্গেল স্ট্যাটাসের কারণে সহজেই তারা ওই নারীর পারফেক্ট নিশানায় পরিণত হয়েছেন। প্রথম টার্গেট সুহিরোর কাছ থেকে চিসাকো ৪৮ মিলিয়ন ইয়েন ধার নেন। এই টাকা পরিশোধের দায় এড়াতে তিনি তাকে খুন করেছেন বলেই ধারণা আদালতের। চিসাকোর আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট না জানা গেলেও চার শিকারের কাছ থেকে তিনি যে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, তাতে তার খুনের উদ্দেশ্য আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না।
 
আসাহি নিউজ সূত্র জানায়, চিসাকো তার সঙ্গীদের কাছ থেকে সব মিলিয়ে ৫০০ মিলিয়ন ইয়েন (প্রায় সাড়ে ৩৮ কোটি টাকা) হাতিয়ে নিয়েছেন। কোটি কোটি টাকা লুফে নেয়ার পরেও চিসাকো কাকেহি কেন খুন করা চালিয়ে গেলেন, তা এখনো অস্পষ্ট। আদালতের ধারণা, তিনি সঙ্গীদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার 'সুযোগ' নিয়েছেন।  

তবে চিসাকোর আইনজীবীরা তার সাক্ষ্য প্রমাণে ধারাবাহিকতার অভাব এবং তিনি ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন বলে আপিল দাঁড় করান। যদিও তাদের এই যুক্তি ধোপে টেকেনি; আপিলে হেরে যান তারা। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, চিসাকো এমন এক নারীর প্রতিচ্ছবি, যিনি নির্দ্বিধায় নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন; আবার অপরাধের পক্ষে যুক্তিও দিয়েছেন।

২০১৯ সালে স্থানীয় সংবাদপত্র ইয়োমিউরি নিউজ'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিসাকো বলেন, 'আপনি যতই নিজের কৃতকর্মের দিকে পেছন ফিরে তাকান না কেন, তাতে আপনার পাপ ধুয়ে যাবে না। এটা মৃতদের কাছে পৌঁছাবে না।'  তাই হয়তো নিজের সব অপরাধ স্বীকার করলেও মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাননি এই নারী। এর পেছনে তার 'আত্ম-প্রতিফলনের অভাব' রয়েছে বলে মনে করছেন আদালত।

সূত্র: সিএনএন 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে