রাজপরিবারের উইল ৯০ বছর গোপন কুঠুরিতে বন্দি রাখার রহস্য 

ঢাকা, রোববার   ২৪ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৯ ১৪২৮,   ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

রাজপরিবারের উইল ৯০ বছর গোপন কুঠুরিতে বন্দি রাখার রহস্য 

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০০ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৫:০৪ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

ব্রিটিশ রাজপরিবার

ব্রিটিশ রাজপরিবার

১০৬৬ সালে যাত্রা শুরু ব্রিটিশ রাজ পরিবারের। তবে এর আগেও তারা বিভিন্ন দেশের (ছোট ছোট) রাজত্ব করেছে। এই রাজ পরিবারের গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নানান রহস্যের জাল তারা বিছিয়ে রেখেছে নিজের চারপাশে। যা শত শত বছরেও যেন শেষ হচ্ছে না। একের পর এক তথ্য মানুষকে অবাক করছে। 

এই রাজ পরিবারের সদস্যদের চলতে হয় একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে। যার সব কিছুই থাকে আগে থেকে ঠিক করা। রাজ পরিবারের একজন সদস্য কখন কোথায় কি করবেন, বলবেন সবকিছু আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়েছে। এমনকি তাদের মৃত্যুর কতদিন পর সমাহিত করা হবে তাও আগেই ঠিক করে রাখা। এবার আপনাদের আরো একটি বিষয় জানাবো। সেটা হচ্ছে- সম্প্রতি লন্ডনের হাই কোর্টের এক বিচারকের রায়ে  জানা যায়, অন্তত ৯০ বছর গোপন থাকবে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রয়াত স্বামী প্রিন্স ফিলিপের করা উইল। চলুন জেনে নেয়া যাক এমন সিদ্ধান্তের রহস্য-

প্রিন্স ফিলিপের করা উইল গোপন রাখা হবে অন্তত ৯০ বছর রাজপরিবারের মর্যাদা রক্ষায় এই উইল গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান হয়েছে। ৯৯ বছর বয়সে গত ৯ এপ্রিল উইন্ডসর প্রাসাদে মৃত্যু হয় প্রিন্স ফিলিপের। বিচারক অ্যান্ড্রু ম্যাকফারলেন জানান, প্রিন্সই সর্বপ্রথম রাজ পরিবারের যে সদস্যের উইল গোপন রাখেন। প্রিন্স ফ্রান্সিসের মৃত্যুর পর উইলের সঙ্গে ৩০টি খামও গোপন রাখা হয়, এমনটাও জানা যায়। 

ম্যাকফারলেন প্রকাশিত এক রায়ে বলেছিলেন, সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এও বলা হয়, উইল সিল করার আবেদনটি পরিবারের তরফে জানান হয়েছে। সর্বশেষ যার উইল গোপন করা হয়েছে তিনি হলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মা এলিজাবেথ এবং তার বোন প্রিন্সেস মার্গারেটের।

প্রিন্স ফিলিপ ও রানি এলিজাবেথের প্রেমের উপাখ্যানও বেশ সুপরিচিত সবার কাছে ৯৫ বছর বয়সী রানি এলিজাবেথ প্রায় ৭০ বছর একসঙ্গে জীবন কাটান প্রিন্স ফিলিপ। তাদের প্রেম, সম্পর্কও আরেক ইতিহাস। ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে তিনি কোনো রাজা বা রানির সবচেয়ে দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী ছিলেন। এই রাজপরিবারের প্রথম উইলিয়াম যিনি উইলিয়াম দ্য কনকোয়েরার নামে পরিচিত, প্রথম রাজা হিসেবে নরম্যান অঞ্চল জয় করেন। তার সন্তান সংখ্যা অনেক থাকলেও তারা সকলেই সমান গুরুত্ব পেতো না। উইলিয়ামের সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত তথা জনপ্রিয় ছিলেন তিন জন। তারা হচ্ছেন দ্বিতীয় উইলিয়াম, প্রথম হেনরী ও অ্যাডেলা।

উইলিয়ামের মৃত্যুর পর সিংহাসনে কে বসবে তা নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা চলতে থাকে। তখন সাধারণত রাজার বড় ছেলেকেই সিংহাসনে বসানো হতো। উইলিয়ামের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় উইলিয়াম সিংহাসনে বসেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্বিতীয় উইলিয়াম কখনো বিয়ে করেননি। তিনি একবার তারই ভাই হেনরীর সঙ্গে শিকারে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান।পরবর্তীতে হেনরী তার স্থানে স্থলাভিষিক্ত হন। হেনরীর সন্তান সংখ্যা ছিলো ২৬। তাদের মধ্যে সিংহাসনের দাবীদার ছিলেন দু’জন। তার ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেলে তিনি তার মেয়ে মাতিলদাকে পরবর্তী সম্রাজ্ঞী হিসেবে ঘোষণা করেন।

রানি প্রথম এলিজাবেথ তবে হেনরীর মৃত্যুর সময় মাতিলদা ফ্রান্সে ছিল। তাই তখন অনেকে ভেবে নেন তার কাজিন স্টিফেন নতুন রাজা হবেন। কারণ তার সামরিক ক্ষমতা ছিল। তা-ই হয়। স্টিফেনের ছেলে মেয়ে সবাই মারা গিয়েছিল। তাই  স্টিফেনের মৃত্যুর পর তার সিংসাহনে বসেন তার ভাতিজা দ্বিতীয় হেনরী। উনার ছিল ৪ ছেলে- হেনরী দ্য ইয়ং, জোফরি, প্রথম রিচার্ড ও জন। এদের চারজনই পালাক্রমে রাজা হন। প্রশ্ন আসতেই পারে চারজনই কীভাবে? একজনের মৃত্যুর পর আরেকজন রাজা হয়েছেন। এদের সকলেই কম বয়সে মারা যান। এই ভাইদের সকলের শেষে রাজা হন জন।

জন মারা যাওয়ার পর রাজত্য গিয়েছিল তৃতীয় হেনরীর দখলে। তারপর রাজা হন প্রথন, দ্বিতীয় ও তার ছেলে তৃতীয় এডওয়ার্ড। এরপর পরিবারের কলহের কারণে বিভিন্নভাবে রাজা পরিবর্তন হতে থাকে। এক পর্যায়ে রাজসিংহাসনে বসেন রাজা অষ্টম হেনরী। তার ছিল তিন সন্তান- মেরি, এলিজাবেথ ও ৮ম হেনরীর পর সিংহাসনে বসেন ষষ্ঠ এডওয়ার্ড। তার মৃত্যুর পর লেডি জেন রানি হন। তবে তাকে ৯ম দিনে শাস্তি দিয়ে মাথা কেটে নেন মেরি। এদিকে, মেরির কোনো সন্তান ছিল না।তার মৃত্যুর পর এলিজাবেথ সম্রাজ্ঞী হন।

রাজপরিবারের প্রথম উইলিয়াম যিনি উইলিয়াম দ্য কনকোয়েরার নামে পরিচিত, প্রথম রাজা হিসেবে নরম্যান অঞ্চল জয় করেনরানি প্রথম এলিজাবেথ ছিলেন রাজা হেনরীর মেয়ে। তার জন্মের সময়ে হেনরী একজন পুত্রসন্তান কামনা করেন। তবে তার স্ত্রী একজন কন্যা সন্তানের জন্ম দিলে হেনরী তার স্ত্রীর মাথা কেটে নেয়ার আদেশ দেন। এই এলিজাবেথই ছিলেন কুমারী রানি। তিনি কোনোদিন বিয়ে করেননি। যে সাম্রাজ্য পুরুষরাও সামলাতে সমস্যায় পড়েছিল, তিনি নারী হয়ে একাই সেই সাম্রাজ্যের দেখাশোনা করেন। তারও কোনো সন্তান না থাকায় আবার বিপাকে পড়তে হয়।

এলিজাবেথের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে বিপাকে পড়তে হয় রাজ পরিবারকে। তখন স্কটল্যান্ডের রাজা জেমস পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের জেমস তথা চতুর্থ জেমস রাজপরিবারের মার্গারেট টিউডরকে বিয়ে করেন এবং রাজপরিবারের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন। এরপর কয়েক প্রজন্ম পর ষষ্ঠ জেমস ক্ষমতায় বসেন। তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন তার ছেলে প্রথম চার্লস। এসবের পরে ক্রমওয়েল নামে একজন চার্লসকে হত্যা করে তার ক্ষমতা দখল করেন। যদিও ক্রমওয়েল রাজ পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না।

প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে বিয়ে হয় ডায়নার অনেক ঝামেলার পর ১৭০১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নেয় সিংহাসনে যেনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের কারো পুনরুত্থান হয়।এই নিয়মে সকল ক্যাথলিক ও যারা ক্যাথলিকদের বিয়ে করেছেন তাদেরকে বাদ দেয়া হয়।পরবর্তীতে রানি হন সোফিয়া। ১৭০৭ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড এক হয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। মাঝে কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে ক্ষমতায় আসেন রানি ভিক্টোরিয়া। তিনি ১৮ শতকের মাঝের দিকে ক্ষমতায় আসেন। তার আমলে ব্রিটিশরা সারা বিশ্ব দখল করা শুরু করে। তার কারণেই ব্রিটিশরা বলতো “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনো অস্ত যায় না।” 

ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার পর ক্ষমতায় আসেন সপ্তম এডওয়ার্ড এবং তার পরে তার পুত্র পঞ্চম জর্জ। পঞ্চম জর্জের ছেলে ছিলেন অষ্টম এডওয়ার্ড। তিনি এক মার্কিন ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করেন। ওই নারী একবার না, দু’বার ডিভোর্সি ছিলেন। কিন্তু অষ্টম এডওয়ার্ড তাকে এতোটাই ভালোবাসতেন যে তার কাছে এসব কোনো সমস্যাই ছিল না। ব্রিটিশ রাজ পরিবারের ছেলে ও সম্ভাব্য রাজা ছিলেন তিনি। সেই সময় নিয়ম অনুযায়ী ওই নারীকে বিয়ে করলে এডওয়ার্ড রাজা হতে পারতেন না। তবুও তিনি তার ভালোবাসার জন্য সাম্রাজ্যের মায়া ত্যাগ করেন।

রানি এলিজাবেথ প্রায় ৭০ বছর একসঙ্গে জীবন কাটান প্রিন্স ফিলিপঅষ্টম এডওয়ার্ড ওয়ালিসকেই বিয়ে করেন এবং তার জায়গায় অন্য কাউকে রাজা বানানোর কথা চিন্তা করা হয়। এডওয়ার্ডের জায়গায় অভিষেক ঘটে তার ভাই ষষ্ঠ জর্জের।সেসময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পাল্টে যায়। ষষ্ঠ জর্জের পর ক্ষমতায় আসেন তারই মেয়ে দ্বিতীয় এলিজাবেথ। যিনি ১৯৫২ সালে ২৫ বছর বয়সে রানি হন। বর্তমানেও তিনি ব্রিটিশ রানি। তিনিই বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী রানি। তার মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজা হবেন তার পুত্র চার্লস। যিনি সিংহাসনের জন্য সবচেয়ে বেশি বছর অপেক্ষা করেছেন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে