একটি নেকলেসের কারণেই প্রাণ যায় ভোগবিলাসে মত্ত রানির

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১ ১৪২৮,   ০৭ সফর ১৪৪৩

একটি নেকলেসের কারণেই প্রাণ যায় ভোগবিলাসে মত্ত রানির

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৬ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১  

রানি মারি অ্যান্টোনেট

রানি মারি অ্যান্টোনেট

১৮ শতাব্দীতে ফ্রান্সের রানি ছিলেন মারি অ্যান্টোনেট। তিনি ছিলেন ফরাসি বিপ্লবে নিহত ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুই-এর স্ত্রী। এই রানি ইতিহাসে নানান কারণে আজো চর্চিত হন। ষোড়শ লুইয়ের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি হন ফ্রান্সের কুইন কনসর্ট। প্রথমে ফরাসি জনগণের প্রিয় হলেও পরে তার অমিতব্যয়িতা এবং বহুগামিতার জন্য অপ্রিয় হন।

অলংকার, পোশাক, জুয়া, ঘোড়দৌড় বাজি ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় কাজে তিনি এতো বেশি খরচ করতেন যে কারণে রাজ কোষাগার খালি হয়ে সময় লাগেনি। ফ্রান্সের শেষ রানি মেরি অ্যান্টনিয়েট কখনো একটি পোশাক দুইবার পড়েননি।  ধারণা করা হয়, রানির পোশাকের জন্য বছরে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হত, তার বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। 

নেকলেসটি ৬৪৭টি বড় হীরা বসানো রয়েছে সেসময় ফ্রান্সে শরীরের চামড়ার উপরে দৃশ্যমান রক্তের শিরাকে নীল রঙে রাঙানো হত। তখনকার জনপ্রিয় এই ফ্যাশনের অনুসারীও ছিলেন রানি মেরি।  তখন ফ্রান্সের নারীদের মাঝে কে কতটা কৃশকায় হতে পারে তাও একটা ফ্যাশনে রূপ নিয়েছিল। তারা নিজেদের শিরাগুলোকে নীল রঙের পেন্সিল দিয়ে আঁকতেন। এর মাধমে নিজেদেরকে মেদহীন ও আকর্ষণীয় দেখানোর চেষ্টা করা হত। এ সবই পুরুষদের আকৃষ্ট করার জন্য তারা করতেন। 

অলংকার নিয়ে রানির আগ্রহের ব্যাপারটা জানতেন পুরো দেশের মানুষই। এজন্য প্যারিসিয়ান জুয়েলারি কারিগর বাসেঞ্জ এবং বোহেমার রানির কাছে একটি হীরার নেকলেস নিয়ে হাজির হন। হারটিতে মোট ৬৪৭টি বড় হীরা ছিল। এছাড়াও হারটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন আকারের ছোট বড় অসংখ্য হীরা বসানো ছিল।

জ্যানি দে লা মোত্তে ছিলেন সেই ষড়যন্ত্রকারী নেকলেসটি সেসময় পুরো ফ্রান্সের সবচেয়ে দামি গয়না হিসেবে বিবেচিত হত। নেকলেসটি দাম ছিল সেসময়কার হিসাবে ১.৬ মিলিয়ন লিভার (আজকের টাকায় ১২ মিলিয়ন ডলার)। এই হীরার নেকলেসটি আসলে ১৫তম লুইয়ের উপপত্নী ম্যাডাম ডু ব্যারিকে উপহার দিতে তৈরি করা হচ্ছিল। তবে গয়না তৈরি আগেই মারা যায় ১৫তম লুই। তাই সেটা আর ম্যাডাম ডু ব্যারিকের কাছে পৌঁছায়নি। তবে এতো দামি আর তৈরি করা ব্য্যবহুল হওয়ায় এর কারিগর নেকলেসটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এতো দাম দিয়ে একটি নেকলেস কেনার মতো কেউ ছিল না সেসময় ফ্রান্সে। অবশেষে রানি মেরি অ্যান্টনিয়েট কিনে নেন সেটি।  

তবে এই নেকলেস কেনাই যে রানির জীবনের কাল হবে, তা খুনাক্ষরেও টের পাননি ভোগবিলাসে মত্ত এই রানি। যাই হোক নেকলেসটি কেনার পর রানি কিছুটা ইতস্তত করেছিলেন বটে। এতো দাম দিয়ে তার গয়না কেনা যে উচিত হয়নি তাও বুঝতে পারছিলেন তিনি। এই অর্থ দিয়ে রাজ্যের অনেক কাজ করা যেত এই অনুশোচনা কাজ করছিল তার মধ্যে। তাই তো তিনিও নেকলেসটি বিক্রি করার করা ভাবতে থাকেন। কিন্তু কে কিনবে এতো দামি হার। কে আছে এতো ধনী!

১৭৮৪ সালে কার্ডিনাল ডি রোহানের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে রানিরমেরি অ্যান্টনিয়েট ১৭৫৫ সালের ২ নভেম্বর অস্ট্রিয়া ভিয়েনায় হফবুর্গ প্যালেসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের শাসক সম্রাজ্ঞী মারিয়া তেরেসা ও পবিত্র রোমান সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিসের ছোট কন্যা। তার ধর্মপিতা হলেন প্রথম জোসেফ এবং ধর্মমাতা হলেন মারিয়ানা ভিক্টোরিয়া। তারা পর্তুগালের রাজা ও রানী। মেরি অ্যান্টনিয়েট তার তিন বছরের বড় বোন মারিয়া কারোলিনার সঙ্গে ফ্রান্সের রাজবাড়িতে বেড়ে ওঠেন। ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুই-এর সঙ্গে মেরির বিয়ে হয়। 

১৭৮৪ সালে কার্ডিনাল ডি রোহানের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে রানির। এই রোহান ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ পাদ্রী এবং একজন কূটনীতিক। রোহানের সঙ্গে রানির এই সখ্যতা ভালো চোখে দেখেনি কেউই। তবে রোহান রানির মনোযোগ পেতে নানান কাণ্ড করতেন। রানিকে বিভিন্ন চিঠি লিখতে শুরু করেন। রানিকে বোঝাতে থাকেন তিনি তার কতটা অনগ্রহ। রানিও এসবে গলতে শুরু করেন। তবে এর পরিণতি কি তা তিনি হয়তো ভাবেন নি একটিবারও। 

এক পোশাক রানি কখনো দুইবার পরেননি রানি যখন রোহানের চিঠির জবাব দেওয়া শুরু করলেন তখন রোহান ভাবেন রানি বুঝি তার প্রেমে পড়েই গেছেন। রোহান রানির সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে থাকেন। রোহান টাকা ধার করে উচ্চবিত্তদের সঙ্গে সখ্যতা গড়তে থাকেন রানির মনোযোগ পাওয়ার জন্য। এদিকে জ্যানি দে লা মোত্তে নামে এক প্রাক্তম ফরাসি রাজপরিবারের নারী রোহানকে পরিচয় দেন তিনি রানির গুপ্তচর। ধীরে ধীরে রোহানও তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। কেননা জ্যান রোহানকে রানির সঙ্গে দেখা করতে সহায়তা করতেন। এমনকি জ্যান রোহানকে এক রাতে এক পতিতাকে এনে দেন। যার সাজ পোশাক ছিল একেবারে রানির মতোই। এতে রোহানের আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে জ্যান রানির গুপ্তচর। 

আসলে জ্যান এই রাজপরিবারের উপর প্রতিশোধ নিতেই এতো কিছু করছিলেন। একসময় রোহান ছাড়াও হীরার গহনার কারিগর বাসেঞ্জ এবং বোহেমারও জ্যানকে বিশ্বাস করেন। জ্যান রানির হয়ে গয়নার কারিগরদের কাছে আরো গয়নার অর্ডার দেন। এসময় জ্যান কিছু জাল কাগজপত্রও তৈরি করেন, যাতে রানির নকল স্বাক্ষরও ছিল। কিছুদিন পর কারিগররা যখন রানির কাছে টাকা চাইতে যায় তখনই সব মিথ্যা ফাস হয়। রানি এসবের কিছুই জানেন না জানালে পুরো শহর তাকে গালমন্দ করতে শুরু করে। বেশ বড় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন রানি। এদিকে রোহানও পালিয়েছে সব জেনে। 

 রাজা, রানি, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের প্রমোদভ্রমণের জন্য রাজদরবারে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ও ২০০ অশ্বশকট সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতএক হিসাবে বলা হয়, রানি মেরি অ্যান্টনিয়টের নিজস্ব সহচরীর সংখ্যা ছিল ৫০০। তাই জ্যান যে মিথ্যা বলেছে তার প্রমাণ বের করা প্রাসাদের বাইরে খুব কঠিনই ছিল। রাজা, রানী, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের প্রমোদভ্রমণের জন্য রাজদরবারে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ও ২০০ অশ্বশকট সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকত। এসব বিষয় ফরাসি জনগণের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। 

এরপর ১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিস থেকে নারীদের ভুখামিছিল বা হাঙ্গার মার্চ অব দ্য ওমেন শুরু হয়। তারা ভার্সাই রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে রুটির দাম কমানোর দাবি জানায়। তখন রানি মেরি অ্যান্টনিয়েট অবাক হয়ে মিছিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, এরা কী চায়? তার সহচরী উত্তর দেন, এরা রুটির দাম কমাতে বলছে, রুটি চায়। রানি অবাক হয়ে বললেন, রুটি কেন? এরা কেক খেতে পারে না! প্রকৃতপক্ষে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিলাস জীবনযাপন করে রানি নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি।

১৭৯৩ সালে রাজা ষোড়শ লুই এবং রানিকে জনতার সম্মুখে শিরোচ্ছেদ করা হয়রানি হয়েও দেশের মানুষের কথা তিনি কখনো ভাবেননি। ইতিহাসবিদদের মতে, তার কারনেই ফ্রান্স ফকির হয়, শুরু হয় ফরাসি বিপ্লব। ষোড়শ লুই ও তার স্ত্রী মেরি অ্যান্টনিয়েটকে ঘিরেই শুরু হয় ফরাসি বিপ্লব। রাজা ও রানির স্বৈরাচারিতা, বিলাসিতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্নীতি পুরো রাজপরিবারকে সাধারণ জনগণের প্রতিপক্ষ করে তোলে। 

বিদ্রোহীদের কাছে শেষ পর্যন্ত বন্দী অবস্থায় উপনীত হন রাজা ষোড়শ লুই। ক্ষমতা হারানোর সুবাস পেতে শুরু করেন। ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি শতসহস্র জনতার সম্মুখে রাজা ষোড়শ লুইসকে গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ করা হয়। অন্যদিকে রানিকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। ফ্রান্সের এই রানিকে বিলাসিতার জন্য অনেকেই অপছন্দ করতেন। সেইসঙ্গে দুর্নীতির কলকাঠি আড়ালে থেকে তিনিই নাড়তেন বলে জনগণের অভিযোগ ছিল। বিচারের পর ১৬ অক্টোবর রানিকেও একই শাস্তি কার্যকর করা হত্যা করা হয়।

সূত্র: অ্যান্সাইন্ট অরিজিন 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে