ভয়ঙ্কর দ্বীপের রাজকুমারীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাঁচলো প্রাণ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১ ১৪২৮,   ০৭ সফর ১৪৪৩

ভয়ঙ্কর দ্বীপের রাজকুমারীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বাঁচলো প্রাণ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪৬ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৪:৫১ ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

দুর্ভাগ্যবশত নিজের লোকদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে হাওয়াইয়ের এক দ্বীপে আটকে পড়েন ব্রিটিশ ম্যারিনার জন ইয়ংকে। ছবি: প্রতীকী

দুর্ভাগ্যবশত নিজের লোকদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে হাওয়াইয়ের এক দ্বীপে আটকে পড়েন ব্রিটিশ ম্যারিনার জন ইয়ংকে। ছবি: প্রতীকী

সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপ। যার মধ্যে কিছু মহাদেশীয়, কিছু মহাসাগরীয় এবং কিছু আছে কৃত্রিম। শুধু রোডোস, লেসবসহ সব মিলিয়ে একা গ্রিসেরই দখলে রয়েছে আনুমানিক ছয় হাজার দ্বীপ। এইজিয়ান সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের কারণে এই দ্বীপগুলোতে ভিড় করেন পর্যটক। 

তবে যেসব দ্বীপে এখনো মানুষের বসতি গড়ে ওঠে নি সেগুলোর চিত্র একটু মনে করার চেষ্টা করুন তো। অ্যাডভেঞ্চার সিনেমাগুলোতে এসব দ্বীপ নিয়ে নানান জল্পনা কল্পনার চিত্র দেখতে পাই। তবে আসলেই কি এগুলো এতোটা ভয়ঙ্কর নাকি সবই দর্শক ধরে রাখার উপায়। নাহ এখনো এমন অনেক দ্বীপ রয়েছে, সেখানে দুর্গম পথ, বিষাক্ত প্রাণীর অভায়রন্য হওয়ায় মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি। তবে যেগুলোতে মানুষ বসবাস করছেন। সেগুলোর অনেকটা আবার জড়িয়ে গেছে নানান অপকর্মে।    

অপরাধ-নৈরাজ্যের কারণে কুখ্যাত এক দ্বীপ হাওয়াইতেমনই অপরাধ-নৈরাজ্যের কারণে কুখ্যাত এক দ্বীপ হাওয়াই দ্বীপ। অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করা ক্যাপ্টেন কুক ১৭৭৯ সালে খুন হয়েছিলেন এখানেই। দুর্ভাগ্যবশত নিজের লোকদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে হাওয়াইয়ের এক দ্বীপে আটকে পড়েন ব্রিটিশ ম্যারিনার জন ইয়ংকে। ল্যাঙ্কাশায়ারে বেড়ে ওঠা ইয়ং ব্রিটিশ জাহাজে ইলিনরে কাজ করতেন। পশমের ব্যবসা করা জাহাজটিতে করে হাওয়াইতে এসে পৌঁছান ১৭৯০ সালে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেখানকার মনোলোভা রমণীরা ছিল দেশ-বিদেশের নাবিকদের কাছে দারুণ আকর্ষণের বিষয়। দ্বীপে থাকাকালীন সময়ে এক আমেরিকান জাহাজের ওপরে হাওয়াইয়ানদের আক্রমণের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হন ইয়ং। এই কথা যাতে বাইরে না যায়, সেজন্য রাজা কামেহামেহা আটকে ফেলার আদেশ দেন ইয়ংকে। ফলে তার জাহাজ তখন তাকে ঐ দ্বীপে ফেলেই চলে যায়।

এতে ভাগ্য ঘুরে যায় ইয়ং এর। ১৭৯৩ সালে ক্যাপ্টেন ভ্যাঙ্কুভার যখন ইয়ংকে দেশে ফিরে যাবার প্রস্তাব দেন, তখন সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন তিনি। জাহাজে নাবিকগিরি করার চাইতে বহুগুণ উন্নত তার হাওয়াইয়ের জীবনযাত্রা। ইতিমধ্যেই রাজার সভাসদদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে বসেছেন তিনি। তাই তিনি ফিরিয়ে দিলেন ভ্যাঙ্কুভারকে। ইয়ং ১৭৯৫ সালে বিয়ে করেন রাজকুমারী ন্যামোকিউলুয়াকে। তার বংশধরেরা এখনো হাওয়াইতেই বসবাস করে।

 সঙ্গীদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে হাওয়াইয়ের এক দ্বীপে আটকে পড়েন ব্রিটিশ ম্যারিনারআরেকজন ভাগ্যবান মানুষ সেলকার্ক। কেপ হর্নের কাছাকাছি সিংক পোর্ট নামের এক জাহাজে ১৭০৪ সালে নেভিগেট করছিলেন সেলকার্ক। হঠাৎ ধেয়ে আসলো বিপর্যয়। জাহাজের ক্রুরা  আক্রান্ত হলেন প্লেগ রোগে। খাবার পচে নষ্ট হতে লাগলো। জাহাজের কাঠগুলোতে পোকা ধরে গেল। অবশেষে প্রশান্ত মহাসাগরের হুয়ান ফার্নান্দেজ নামক দ্বীপে নোঙর ফেলা হলো কিছুদিনের জন্য। উদ্দেশ্য বিশ্রাম এবং খাদ্য সংগ্রহ।

সেলকার্কের জাহাজের আশা ছেড়ে দিয়ে অন্য জাহাজের সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করার প্রস্তাবে জাহাজের ক্যাপ্টেন বেঁকে বসলেন। দুইজনের মধ্যে তর্কাতর্কি একসময় হাতাহাতিতে রূপ নিলো। কোনো খাবার কিংবা পানি ছাড়াই জোর করে দ্বীপের একাংশ ‘মাস এ তিয়েরা’য় ফেলে আসা হলো সেলকার্ককে। সৈকত থেকে প্রাণপণে চিৎকার করে মাফ চাইতে লাগলেন সেলকার্ক। কিন্তু নির্দয় ক্যাপ্টেনের মন গললো না তাতে। বাকি ক্রুরাও উপেক্ষা করলেন তার আকুতিকে।

চরম নিঃসঙ্গতায় পাগল হবার দশা হয়েছিল সেলকার্কেরহুয়ান ফার্নান্দেজ থেকে পালানো এক কথায় অসম্ভব। কাছাকাছি দ্বীপটি ছিলো প্রায় ছয়শো মাইল দূরে, অথৈ সাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে যাবার আশাই দূরাশা। ভাগ্য ভালো, সেলকার্ক সহজেই ঝর্ণা খুঁজে বিশুদ্ধ পানির অভাব মেটালেন। তাছাড়া দ্বীপটিতে নানাধরনের ফলগাছে ভরা ছিল। হাত বাড়ালেই ধরা যেত নানা ধরনের মাছ। শুরুতে চরম নিঃসঙ্গতায় অবশ্য পাগল হবার দশা হয়েছিল সেলকার্কের। দ্বীপের বড় বড় ইঁদুরগুলো রাতে গায়ের কাপড় কাটতে গিয়ে বারবার ঘুম ভাঙিয়ে দিতো তার। বুদ্ধি করে বিড়াল পোষা শুরু করলেন। এছাড়াও তার সঙ্গী ছিল ছাগলের পাল। নিজেকে অন্যমনস্ক রাখার জন্য তাদের সঙ্গে নেচেগেয়ে সময় কাটাতেন সেলকার্ক!

এভাবে একাকী ৫২ মাস কাটানোর পর দ্বীপে এসে ভিড়লো ব্রিটিশ জাহাজ ‘ডিউক’। ক্যাপ্টেন উডস রজারের নেতৃত্বে চলা ঐ জাহাজের উদ্দেশ্য ছিল জলদস্যুদের খুঁজে বের করা। ডিউকের নাবিকেরা খাবার পানির খোঁজে দ্বীপের কাছাকাছি এসে লাফাতে লাফাতে আগুন ধরানো গাছের ডাল নাড়তে থাকা এক অর্ধপাগলের দেখা পান। সেলকার্ক তখন লজ্জা নিবারণ করছিলেন কেবলমাত্র ছাগলের চামড়া দিয়ে। গল্পটা নিশ্চয় পরিচিত মনে হচ্ছে আপনার কাছে? হ্যাঁ, সেই বিখ্যাত সিনেমার কাহিনী এটি। রবিনসন ক্রুসো প্রকাশিত হবার দুইবছর পর ১৭২১ সালে সেলকার্ক মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৬৬ সালে মাস এ তিয়েরার নামকরণ করা হয় ‘রবিনসন ক্রুসো আইল্যান্ড’। 

পরবর্তীতে সেলকার্কের দ্বীপে কাটানো অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি হয় রবিনসন ক্রুশো সিনেমাটি ভয়ঙ্কর এমন আরো অনেক দ্বীপ রয়েছে। যেখানে আটকা পড়ে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছরও কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকে। রবিনসন ক্রুশোর কথা জানা থাকলেও অনেকের কথাই চাপা পড়েছে নতুন ইতিহাসের পাতার ভাঁজে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে