কুমারীত্ব প্রমাণ করেই যোগ দিতে হয় ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীতে

ঢাকা, বুধবার   ২০ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৫ ১৪২৮,   ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কুমারীত্ব প্রমাণ করেই যোগ দিতে হয় ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীতে, বাতিল হচ্ছে প্রথা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৯ ১৫ আগস্ট ২০২১  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কুমারিত্ব প্রমাণিত না হলে ইন্দোনেশিয়ায় নারীরা দেশটির সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারেন না। কয়েক দশক ধরে চালু প্রথা অনুযায়ী একাধিক আঙুল ব্যবহার তাদের কুমারীত্বের পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষাটি বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত হলেও এতে কুমারীত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে সেই নারীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

ইন্দোনেশিয়ায় কোন কোন ক্ষেত্রে এমনকি সেনাবাহিনীর অফিসার যে নারীকে বিয়ে করবেন, তাকেও একই পদ্ধতিতে প্রমাণ করতে হয় যে বিয়ের আগে তার সতীচ্ছদ ছেঁড়েনি! এই পরীক্ষা সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য নারী আবেদন প্রার্থীদের সার্বিক মেডিকেল পরীক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইন্দোনেশিয়াতে কুমারীত্বের এই পরীক্ষা দিতে হয় শুধু নারী আবেদনকারীদের। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বেশ কয়েক বছর ধরে এই প্রথাকে বৈষম্যমূলক এবং নিপীড়নমূলক বলে এর নিন্দা জানিয়ে আসছে। বিষয়টি থেকে সরে আসছে দেশটির সেনাবাহিনীও। ধারণা করা হচ্ছে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী প্রকাশ করা হবে।

ইন্দোনেশিয়ায় হিউমান রাইটস ওয়াচের গবেষক অ্যান্ড্রিয়াস হাসর্নো বলেন,  কুমারীত্ব পরীক্ষা মেয়েদের ওপর একটা লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা এবং খুবই অপমানজনক একটা প্রথা। এই পরীক্ষায় নারীর যোনিতে দুই আঙুল ব্যবহার করে তার সতীচ্ছদ বা হাইমেন অক্ষত আছে কিনা অর্থাৎ সে কুমারী কিনা তা পরীক্ষা করা হয়।  এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া বহু নারী যারা মানবাধিকার সংগঠনটির সঙ্গে কথা বলেছেন তারা বলেছেন এটি তাদের জন্য খুবই ‘কষ্টকর পদ্ধতি’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে এক রিপোর্টে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে এই পরীক্ষার মাধ্যমে কুমারীত্ব পরীক্ষা ‘বিজ্ঞানসম্মত ভাবে অপ্রমাণিত পদ্ধতি’। সংস্থাটির বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো নারীর সতীচ্ছদ অক্ষত থাকা বা না থাকার সঙ্গে যৌন সংসর্গ করেছে কি-না তার কোনো যোগসূত্র নেই।

এই সিদ্ধান্ত ইন্দোনেশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সকল শাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি। ছবি: সংগৃহীত

কবে থেকে শুরু এই পরীক্ষা

১৯৬৫ সাল থেকে শুরু হয় নারীদের জন্য এই পরীক্ষা। তখন থেকে বিষয়টি নিয়ে নানাবিধ সমালোচনা চলছে। ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর অনেক অফিসার আবার এর ‘গুরুত্ব’ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন বিশ্বকে। উচ্চপদস্থ অফিসারদের যুক্তি ছিল, একজন নারী যিনি সেনা হিসেবে দেশের সেবা করতে চান তাকে মানসিক এবং শারীরিক দিক থেকে অত্যন্ত দৃঢ় হতে হবে। তাদের দাবি, ‘সতীত্ব’ই নাকি কোনো নারীর দৃঢ় মানসিকতার পরিচয়।

১৯৯৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকার কমিশন এই নিয়মকে বেআইনি ঘোষণা করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই পরীক্ষায় নিষেধাজ্ঞা দাবি করে। কিন্তু এত কিছুর পরও চুপ ছিল ইন্দোনেশিয়া প্রশাসন। ২০১৪ সালে ইন্দোনেশিয়া পুলিশে নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি ফের ঝড় তোলে। তাতে পরিষ্কার লেখা ছিল, যোগ্যতা নির্ণায়ক পর্বে অন্যান্য পরীক্ষার পাশাপাশি নারীদের ‘সতীত্বের’ প্রমাণ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তাতে এও লেখা ছিল যে, যে সব নারী নিজেদের পুলিশ হিসেবে দেখতে চান তারা যেন ছোট থেকেই ‘সতীত্ব’ বজায় রাখার মানসিকতা তৈরি করে নেন।
 
শুধু পুলিশ এবং সেনাবাহিনীতেই নয়, ২০১৩ সাল নাগাদ ইন্দোনেশিয়ার বেশ কিছু স্কুলও ছাত্রী ভর্তির সময় এই পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেয়। এরপর ইন্দোনেশিয়ার চিকিৎসকরাও এর বিরুদ্ধে সরব হন। হাইমেন পর্দার পরিস্থিতি বৈজ্ঞানিক ভাবে কখনও কোনো নারীর সতীত্বের প্রমাণ হতে পারে না।

পরীক্ষা থেকে সরে আসছে

ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান আন্দিকা পেরকাসা এখন ঘোষণা করেছেন যে, যেসব নারী সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদোনের জন্য আবেদন করবেন, তাদের এধরনের পরীক্ষা করাতে হবে না। নির্বাচন প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য কারো স্বাস্থ্যের অবস্থা যাচাই করে দেখা। সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য এই পরীক্ষা অবাঞ্ছিত।

তিনি বলেন, এখন থেকে নারীরা শারীরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেবার জন্য সক্ষম কিনা সেটা মূল্যায়ন করেই প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করা হবে।

এই সিদ্ধান্ত শুধু সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে নাকি ইন্দোনেশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সকল শাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে