‘ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?’, জীবনের শেষ মুহূর্তে ক্ষুদিরামের কৌতূহল

ঢাকা, বুধবার   ২০ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৫ ১৪২৮,   ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

‘ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?’, জীবনের শেষ মুহূর্তে ক্ষুদিরামের কৌতূহল

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:২৪ ১১ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৪:৩৩ ১১ আগস্ট ২০২১

ক্ষুদিরাম বসু

ক্ষুদিরাম বসু

আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/ র্স্পধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি/  এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়/ আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা/ এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য। হ্যাঁ, আঠারো জানে ভাঙতে পাথর বাধা। এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর, এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা। এ বয়স যে দুর্বার তা প্রমাণ করেছিলেন ক্ষুদিরাম।  

ক্ষুদিরাম বসু স্বাধীনতার স্বপ্নে যিনি মৃত্যুভয়কেও বশ করেছিলেন। বাংলা তথা ভারত হারিয়েছিল এক আদ্যন্ত নির্ভীক সন্তান। বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর,৭ মাস, ১১ দিন। সময়টা ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট। ফাঁসি হয় তার। ১৮ বছরেই থেমে যায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে মৃত্যু বরণকারী ভারতের কনিষ্ঠতম বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। 

১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ফাঁসি হয় ক্ষুদিরামের তবে জন্মের পরই ছেলে মারা যাবে এই অন্ধবিশ্বাসে তার মা লক্ষীপ্রিয় দেবী তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে তাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন মাসির কাছে। সেই থেকেই তার নাম হয় ক্ষুদিরাম। ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মেদিনীপুর জেলার মোহবনী গ্রামে জন্মেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু। তিন কন্যার পর তিনি ছিলেন চতুর্থ সন্তান। আগেই দুই পুত্র জন্মের পরপরই মারা গিয়েছিলেন বলে তার মা লক্ষীপ্রিয় দেবী ক্ষুদিরামও দ্রুত মারা যাবেন বলে ভয় পেয়েছিলেন। সেই কারণেই নিজের দিদির কাছে বিক্রী করে দিয়েছিলেন পুত্রকে। তিনি বুঝতে পারেননি তার এই ছেলে অন্য ধাতুতে গড়া।

ক্ষুদিরামের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তিনি তার মাকে হারান। এক বছর পর তার পিতার মৃত্যু হয়। তখন তার বড় দিদি অপরূপা তাকে দাসপুর থানার এক গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায় ক্ষুদিরামকে তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলে ভর্তি করে দেন। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি স্বাধীনতা ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়েন। প্রতিকার অসম্ভব জেনেও  অন্যায়ের প্রতিবিধানের চেষ্টা করবার ঐকান্তিক প্রবৃত্তি ও সৎসাহস ক্ষুদিরাম চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারের মুজফ্ফরপুরে ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকির সঙ্গে বোমা ছুড়ে হত্যা করতে গিয়েছিলেন অত্যাচারী ব্রিটিশ বিচারক ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড সাহেবকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত যে গাড়িটিতে তারা বোমা ছুড়েছিলেন তাতে ছিলেন না কিংসফোর্ড। বদলে দুই ইংরেজ নারীর মৃত্যু হয়।

ক্ষুদিরামের বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর,৭ মাস, ১১ দিনব্রিটিশদের হাতে প্রাণ দেবে না এজন্য প্রফুল্ল চাকি আত্মহত্যা করেন। কিন্তু ক্ষুদিরাম ধরা পড়েছিলেন ব্রিটিশদের হাতে। বিচারে তার ফাঁসির রায় দিয়েছিলেন ব্রিটিশ বিচারক মি. কর্নডফ। রায় ঘোষণার পর ক্ষুদিরামের মুখে ছিল হাসি। অল্প বয়সী ক্ষুদিরামকে বিচারক কর্নডফ প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, ফাঁসিতে যে মরতে হবে সেটা সে বুঝেছে তো? এর উত্তরে ক্ষুদিরাম যা বলেছিলেন তা চমকে দিয়েছিল উপস্থিত সকলকে।   

স্বাধীনতার আকাঙ্খায় এমনই নির্ভীক ছিলেন মেদিনীপুরের এই বিস্ময় যুবক। রায় ঘোষণার পর জীবনের শেষ কয়েকটা দিনে কারাগারে বসে মাৎসিনি, গ্যারিবল্ডি ও রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে চেয়েছিলেন। ১০ আগস্ট আইনজীবী সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তীকে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, 'রাজপুত নারীরা যেমন নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়া জওহরব্রত পালন করিত, আমিও তেমন নির্ভয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিব। আগামীকাল আমি ফাঁসির আগে চতুর্ভুজার প্রসাদ খাইয়া বধ্যভূমিতে যাইতে চাই।'

ফাঁসি হওয়ার সময় ক্ষুদিরামের বয়স ছিল ১৮ বছর, ৭ মাস এবং ১১ দিন, যেটা তাকে ভারতের কনিষ্ঠতম ভারতের বিপ্লবী অভিধায় অভিষিক্ত করেছিল। ফাঁসির আগেও ক্ষুদিরামের শেষ ইচ্ছা ছিল- দেশের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ারই চেষ্টা করা! তিনি বলেছিলেন, তিনি বোমা বানাতে জানেন। ব্রিটিশদের অনুমতি পেলে সেই বিদ্যা ভারতের অন্যান্য যুবকদের শিখিয়ে যেতে চান।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে মৃত্যু বরণকারী ভারতের কনিষ্ঠতম বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুফাঁসির মঞ্চে এসেও যে প্রশান্তি ছিল তার মনে, তা সবচেয়ে বিস্ময়কর। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট জেলের ভেতরে গড়া হয়েছিল ১৫ ফুট উঁচু এক ফাঁসির মঞ্চ। দুই দিকে ছিল দুটি খুঁটি। তার উপর একটি মোটা লোহার রড ছিল আড়াআড়িভাবে লাগানো। সেই রডের মাঝখানে মোটা একগাছি দড়ি বাঁধা ছিল। তার শেষ প্রান্তে ছিল মরণ-ফাঁস।

ক্ষুদিরামকে সেই মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন ব্রিটিশ সরকারের চার পুলিশ। ক্ষুদিরাম ছিলেন তাদের সামনে। ফাঁসির আগে উপস্থিত আইনজীবীদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিলেন তিনি। তারপর পিছমোড়া করে বাঁধা হয় দুইহাত। গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো মাত্র জল্লাদকে শহিদ ক্ষুদিরাম প্রশ্ন করেছিলেন 'ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?' এটাই ছিল বীর শহীদের জীবনের শেষ কথা। জল্লাদ বিস্ময়ে কিছু বলতে পারেননি। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ জেলার সহ উপস্থিত সকলে। ফাঁসির আগে কী করে কারোর মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে?

ফাঁসির আগেও ক্ষুদিরামের শেষ ইচ্ছা ছিল- দেশের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়ারই চেষ্টা করা!বিপ্লবী ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস রচনা করেন কালজয়ী এক সঙ্গীত-“একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি। হাসি হাসি পরব ফাঁসি, দেখবে জগৎবাসী।” 

ক্ষুদিরামের মৃত্যুর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই বাঙালির নামটি এখনো বিপ্লবের প্রতীক হয়ে আছে। ক্ষুদিরাম যুগে যুগে আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছেন মুক্তির স্বপ্ন দেখতে, অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে। মৃত্যুর ১১৩ বছর পরেও এই উপমহাদেশের মানুষের মনে যিনি আজও অমর। তাই তো কবির কথায় এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়/ পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে/ এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়/ এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে