শুধুমাত্র নারীদের অলিম্পিক, ১১ জন প্রতিযোগীর খেলা দেখতে এসেছিল ২০ হাজার মানুষ

ঢাকা, সোমবার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১২ ১৪২৮,   ১৮ সফর ১৪৪৩

শুধুমাত্র নারীদের অলিম্পিক, ১১ জন প্রতিযোগীর খেলা দেখতে এসেছিল ২০ হাজার মানুষ

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৩৬ ৪ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৩:৪৩ ৪ আগস্ট ২০২১

শুরুতে অলিম্পিক ছিল শুধু পুরুষদের জন্য

শুরুতে অলিম্পিক ছিল শুধু পুরুষদের জন্য

অলিম্পিক গেমস বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং সর্বোচ্চ সম্মানজনক প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচিত। অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা অলিম্পিক গেমস হল একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা যেখানে গ্রীষ্মকালীন এবং শীতকালীন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীরা বিভিন্ন ধরনের খেলায় অংশগ্রহণ করে। দুইশতাধিক দেশের অংশগ্রহণে মুখরিত এই অনুষ্ঠান। তবে এখানে নারীদের কোনো স্থান নেই। 

অলিম্পিকের প্রাথমিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল নারীবিদ্বেষী দর্শন থেকে। ডি কুবেরত্যাঁ নিজ মুখে বলেছিলেন, অলিম্পিক শুধু পুরুষদের জন্যই। এখানে অংশগ্রহণের জন্য পুরুষদের সবচেয়ে বড় পুরষ্কার হচ্ছে নারীদের ভদ্র করতালি। তারপরও শুরুর দিকে সাঁতার, ডাইভিং ও টেনিসের মতো কিছু ইভেন্টে নারীদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হতো। ১৯২৮ সালে প্রথমবারের মতো ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু নারীরা বেশিদূর দৌড়াতে পারবে না, এই চিন্তা থেকে তাদের দৌড় প্রতিযোগিতা সীমিত রাখা হয় ২০০ মিটার পর্যন্ত। ২০০ মিটারের বেশি দৌড়াতে নারী অ্যাথলেটদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক পর্যন্ত। প্রমীলা দৌড়বিদরা প্রথম ম্যারাথনে নামার সুযোগ পেয়েছে ১৯৮৪ সালে।

অলিম্পিকে নারীদের স্থান তৈরি করে দিয়েছিলেন অ্যালিস মিলিয়েটশুরুর দিকের কথা। পৃথিবীর ৭টি দেশ থেকে এসেছেন বেশ কয়েকজন নারী ক্রীড়াবিদ। অবশ্য তাদের ক্রীড়াবিদ বলা হবে কিনা, এই নিয়ে তখনও তর্ক চলছে। কারণ খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রথাগত প্রশিক্ষণ পাননি প্রায় কেউই। অথচ পা রাখতে চলেছেন আন্তর্জাতিক স্তরের এক প্রতিযোগিতায়। প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে ফ্রান্সের সীমান্ত পেরিয়ে মোনাকো সমুদ্র উপকূলে মন্টে-কার্লো শহরে। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মতো কোনো স্টেডিয়াম বা ট্রাক পাওয়া গেল না। কারণ প্রতিযোগীরা সবাই নারী। নারীদের জন্য কিছু হালকা খেলা অবশ্য অলিম্পিকেই চালু হয়ে গিয়েছে ততদিনে। কিন্তু দৌড়, রেসলিং, লং জাম্প, হাই জাম্পের মতো শারীরিক কসরতের খেলা কি নারীরা দেখাতে পারেন? আয়োজকদের নিয়ে শুরু হল হাসাহাসি।

প্রতিযোগিতা অবশ্য নির্দিষ্ট সূচি মেনেই হল। ট্রাক পাওয়া না গেলেও পাওয়া গিয়েছিল একটি পাখি শিকারের রেঞ্জ। মন্টে-কার্লো শহর সাক্ষী থাকল নারীদের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার। আর এই বিরাট আয়োজনের পিছনে ছিল যে মানুষটির নিরলস পরিশ্রম, তার নাম অ্যালিস মিলিয়েট। ফ্রান্সের খ্যাতনামা লেখিকা ও অনুবাদক মিলিয়েট। তবে খেলাধুলোর প্রতি তার অনুরাগ ছোটো থেকেই। আর তখন থেকেই দেখেছেন, শুধুমাত্র লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে প্রতিযোগিতার আসর থেকে কীভাবে ছিটকে যান নারীরা। মিলিয়েট এই ব্যবস্থার বদল চেয়েছিলেন। অবশ্য অলিম্পিকে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্যারন পিয়ের কুবারটিনও বেশ উৎসাহী ছিলেন। ১৯০০ সালেই তার উদ্যোগে শুরু হয়েছিল অলিম্পিকের নারী প্রতিযোগিতা। কিন্তু সামান্য কিছু হালকা খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যা নিছকই শ্বেতাঙ্গ নারীদের বিনোদনের মাধ্যম।

১৯২২ সালে ফ্রান্সে প্রথম শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় এই অলম্পিক, এসেছিল মাত্র ৫ টি দেশ ১৯১৯ সালে প্রথম অলিম্পিক কমিটির কাছে আবেদন জানালেন মিলিয়েট। ততদিনে স্থির হয়ে গিয়েছে, ১৯২৪ সালে অলিম্পিকের আয়োজন হতে চলেছে প্যারিস শহরেই। মিলিয়েট চাচ্ছিলেন তার নিজের দেশের মাটিতেই ঘটুক এই বিপ্লব। কিন্তু প্রস্তাব দেওয়া মাত্রই তা বাতিল করল অলিম্পিক কমিটি। মিলিয়েট হাল ছাড়লেন না। একাই এক আলাদা প্রতিযোগিতার আয়োজন শুরু করলেন। সমমনস্ক আরও কয়েকজন নারীকে নিয়ে গড়ে তুললেন ‘ফেডারেশন স্পোর্টিভ ফেমিনিন ইন্টারন্যাশানালি’। আর এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেই ১৯২১ সালে আয়োজিত হল পূর্বোক্ত প্রতিযোগিতা। প্রথমবারের সাফল্যে আত্মবিশ্বাস পেলেন মিলিয়েট। এবার প্রত্যক্ষ লড়াই অলিম্পিক কমিটির সঙ্গে।

১৯২২ সাল। আবারও আয়োজিত হল এই প্রতিযোগিতা। এবার মিলিয়েট তার নাম রাখলেন ‘উইমেন্স অলিম্পিক গেমস’। আর সবপ্রতিযোগিতার আয়োজন হল প্যারিসের পার্সিং স্টেডিয়ামে। এবারে অবশ্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় মাত্র ৫টি দেশ। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, সুইৎজারল্যান্ড, চেকস্লোভাকিয়া এবং ফ্রান্স। ১১ জন প্রতিযোগীর খেলা দেখতে ভিড় করলেন ২০ হাজার মানুষ। অলিম্পিক বলে কথা, তাও আবার নারীদের! আয়োজন ব্যর্থ হলে হয়তো অলিম্পিক কমিটি এইসব নিয়ে মাথা ঘামাত না। কিন্তু মিলিয়েটের সাফল্য তাদের আতঙ্কিত করল। সঙ্গে সঙ্গে আইনি নোটিশ পাঠালেন মিলিয়েটকে। অলিম্পিকের নাম ব্যবহার করা যাবে না কোনোভাবেই। তার বদলে আরও কয়েকটা খেলায় নারীদের অংশগ্রহণের কথা ভাবতে পারে অলিম্পিক কমিটি।

১১ জন প্রতিযোগির খেলা দেখতে ভিড় করেছিল ২০ হাজার মানুষ মিলিয়েট কিন্তু চেয়েছিলেন, বাছা বাছা কয়েকটি নয়, বরং অলিম্পিকের সব খেলাতেই অংশ নিক নারীরা। তাই অলিম্পিক কমিটির প্রস্তাবে রাজি হতে চাননি কিছুতেই। কিন্তু আইনি জটিলতা মেটাতে এফএসএফআই-এর অন্যান্য সদস্যদের মত মেনে নিয়েই নাম পাল্টাতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ঠিক করলেন, এবার অলিম্পিকের সব নিয়ম মেনেই হবে আয়োজন। যথারীতি অলিম্পিকের মতোই ৪ বছর পর ১৯২৬ সালে স্থির হল পরবর্তী প্রতিযোগিতার সময়। এবারে নাম ‘উইমেন্স ওয়ার্ল্ড গেমস’। আর আয়োজক শহর সুইডেনের গথেনবার্গ। এরপর ১৯৩০ সালে প্রাগ শহর এবং ১৯৩৪ সালে লন্ডন শহরে হল প্রতিযোগিতা। ক্রমশ জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকল নারীদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার। তবে প্রতিবন্ধকতা পিছু ছাড়ল না মিলিয়েট এবং ‘উইমেন্স ওয়ার্ল্ড গেমস’এর।

মিলিয়েটের সঙ্গে যে ক্রীড়া সংস্থারাই এগিয়ে আসেন, তাদেরই বাদ পড়তে হয় অলিম্পিকের আয়োজন থেকে। কিন্তু শুধুমাত্র নারীদের খেলাধুলোয় উৎসাহ দিতে অলিম্পিক থেকে ছিটকে যেতে চান না কেউই। অবশ্য এসবের মধ্যেও নানা দেশে নারীদের নিজস্ব ক্লাব গড়ে উঠছিল। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াল অর্থ। আন্তর্জাতিক স্তরের একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এদিকে কোনো ধনী ব্যক্তিই এগিয়ে আসতে চাইছেন না। এদিকে ১৯৩৬ সালে মিলিয়েটের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিল অলিম্পিক কমিটি। তারা ভেবে দেখতে চান আর কোন কোন প্রতিযোগিতায় নারীদের অংশগ্রহণ সম্ভব। আলোচনার প্রস্তাবেই বোঝা যায়, সমস্ত প্রতিযোগিতায় কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

নারীদের সব খেলায় অংশগ্রহণ করাতে চেয়েছিলেন মিলিয়েট মিলিয়েট হয়তো এই আলোচনার প্রস্তাব ফিরিয়েই দিতেন। কিন্তু এর মধ্যেই ফ্রান্স সরকার জানিয়ে দিয়েছে, উইমেন্স ওয়ার্ল্ড গেমসে তারা যে অর্থসাহায্য করতেন, তা আর করা হবে না। এরপর আর উপায় থাকে না। প্রতিযোগিতা বন্ধ হবেই। অতএব অলিম্পিক কমিটির প্রস্তাবে সাড়া দিতে হল তাকে। সেটা ১৯৩৬ সাল। আর তারপর কেটে গিয়েছে ৮৫ বছর। অলিম্পিকের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখতে পাব, ৪৬ শতাংশ খেলায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও অংশগ্রহণ করেন। আর মোট প্রতিযোগীদের মধ্যেও নারীদের সংখ্যা থাকে ওই ৪০ শতাংশের আশেপাশে। ক্রমশ নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু তবুও সাম্যে পৌঁছয়নি। ১০০ বছর আগে মিলিয়েট যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজও তা স্বপ্নই। আর সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন সারা পৃথিবীর অসংখ্য নারী খেলোয়াড়।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে