‘সেফটি কফিন’ এ ঘণ্টা বাজলেই বেরিয়ে আসবে মৃত

ঢাকা, শুক্রবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ২ ১৪২৮,   ০৮ সফর ১৪৪৩

‘সেফটি কফিন’ এ ঘণ্টা বাজলেই বেরিয়ে আসবে মৃত

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৭ ৩ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৫:২০ ৩ আগস্ট ২০২১

রোগী মৃত না জীবিত বোঝার সুযোগটা পেতেন না আত্মীয়রা, তার আগেই কফিন বন্দি করা হত কলেরা রোগীকে

রোগী মৃত না জীবিত বোঝার সুযোগটা পেতেন না আত্মীয়রা, তার আগেই কফিন বন্দি করা হত কলেরা রোগীকে

সময়টা আঠারো শতকের শেষ দিক। তখন কলেরার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ইউরোপ জুড়ে। বাড়িতে বাড়িতে তখন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে কলেরায়। কিন্তু সে দেহ খোলা পড়ে থাকলে যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে রোগের জীবাণু। যা আরও ত্বরান্বিত করবে মহামারিকে। তাই প্রাণস্পন্দন থেমে গেলেই কফিনবন্দি করে সমাধিস্থ করা হত মানবদেহ। চিকিৎসক ডেকে এনে মৃত্যু নিশ্চিত করার সুযোগটা পর্যন্ত পেতেন না মৃতের আত্মীয়রা। 

এই ঘটনাই একপ্রকার ত্রাস তৈরি করেছিল তৎকালীন সমাজে। যদি সত্যিই কোনো জীবিত মানুষকে কবর দেওয়া হয় মৃত বলে? সেই ভয় থেকেই এই বিশেষ কফিন জন্ম নেয় ব্রিটেনে। যা পরবর্তীকালে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘সেফটি কফিন’ নামে। এই কফিনের উপর একটি ঝুলন্ত ঘণ্টা। আর সেটার সঙ্গে লাগানো একটি ফিতা, কফিনের ওপরের ছোট্ট গর্ত দিয়ে ঢুকে গেছে ভেতরে। মৃতভেবে যাকে কফিনবন্দি করা হয়েছে তিনি যদি বেঁচে থাকেন তবে ফিতা টান দিবেন। বাইরের ঘণ্টা বেজে উঠবে। এতেই আরেকটি বার প্রাণ ফিরে পাবেন মরনাপন্ন ব্যক্তি।

সেসময় ইউরোপে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছে কলেরায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ পরিবর্তিত হয়েছে এই কফিনের চেহারা। সংযুক্ত হয়েছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। সেটা ১৭৯১ সাল। ম্যাঞ্চেস্টারের এক উদ্ভাবক রবার্ট রবিনসন প্রথম নিজের জন্য তৈরি করেন এই বিশেষ ধরনের কফিন। সে কফিনের ভেতরে মৃতদেহ শায়িত করার জায়গার ঠিক ওপরেই ছিল একটি কাচের প্যানেল। ছিল বিশেষ দরজাও। রবিনসন আত্মীয়দের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন প্রতিদিন তারা এসে পরীক্ষা করে যান সেই কাচের ফলকে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে বাষ্প জমেছে কিনা।

অবস্থা এতো খারাপ হয়েছিল যে, চিকিৎসক ডেকে এনে মৃত্যু নিশ্চিত করার সুযোগটা পর্যন্ত পেতেন না মৃতের আত্মীয়রাঠিক পরের বছরই এই প্রযুক্তিতে বেশ কিছু বদল এনে সেফটি কফিন তৈরি করান স্বয়ং ব্রান্সউইকের ডিউক ফার্দিনান্দ। সেখানে আরামদায়ক গদি থেকে শুরু করে ছিল কাচের জানলা, ভেন্টিলেটর, বাইরে থেকে খাবার খাওয়ানোর নলও। পাশাপাশি কফিনের ঢাকনার তালা খোলার ব্যবস্থা ছিল দু’দিক থেকেই। পরবর্তীতে ফার্দিনান্দের মৃত্যুর পর সেই দরজার একটি চাবি রেখে দেওয়া হয়েছিল তার পকেটে। যাতে আপদকালীন পরিস্থিতিতে তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে পারেন।

এটাই সেই সেফটি কফিন, যেখানে রোগীকে ঢোকানোর পর সে যদি জিবত হয় তাহলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানান দিত খোদ ডিউকের সেফটি কফিন ব্যবহার দেখেই পরবর্তীতে বহু মানুষ হাঁটেন এই পথেই। মৃত্যুর আগে নিজের জন্য পছন্দসই সেফটি কফিন কিনে রাখতেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সেফটি কফিনে ঘণ্টার ব্যবহার শুরু হয় এরও প্রায় এক শতাব্দী পরে। ১৮৯২ সালে ড. জোহান গডফ্রাইড ট্যাবারগার কফিনের সঙ্গে সংযোজন করেন অভিনব ‘কলিং বেল’। কফিনের বাইরে অবস্থিত সেই ঘণ্টার সঙ্গে সংযুক্ত সুতো বেঁধে রাখা হত শায়িত মৃতদেহের হাতে। যাতে তিনি জীবিত থাকলে ন্যূনতম প্রচেষ্টাতেই সাহায্যের জন্য আবেদন করতে পারেন সমাধিক্ষেত্রের পাহারাদারদের কাছে।

কোনো লাভ হয়নি এতে, কাউকে বাঁচানো যায়নি এই কফিন থেকে তবে মাঝেমধ্যেই এহেন কফিনের জন্য বাড়তি সমস্যায় পড়তে হত সেমেট্রির পাহারাদারদের। মৃতদেহের পচনে মৃত ব্যক্তির শরীর ফুলে গেলেই টান পড়ত ঘণ্টার সঙ্গে সংযুক্ত সুতোয়। আর বিপদ সংকেত পেয়ে ছুটে আসতেন রক্ষীরা। তারপর মহাসমারোহে কফিন খোলার পর ব্যর্থ মনোরথেই বাড়ি ফিরতে হত মৃত ব্যক্তির আত্মীয়দের। কিন্তু আদৌ কি সুরক্ষা দিতে পেরেছিল এই সেফটি কফিন? লিখিত রেকর্ড বলছে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একজন মানুষেরও প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়নি কোনোদিন।

অর্থাৎ, বলা যেতে পারে সম্পূর্ণই বৃথা গিয়েছিল এই আবিষ্কার। তবে কার্যকরী না হলেও, মহামারির আবহে মানুষকে জীবিত অবস্থায় মৃত্যুভয় থেকে যে খানিক মানসিক স্বস্তি দিয়েছিল এই কফিন, তাতে সন্দেহ নেই কোনো। প্রতি শতকেই মহামারি আমাদের মুখোমুখি করেছে নিষ্ঠুর বাস্তবতার। শিখিয়েছে দূরত্বই একমাত্র নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার উপায়। আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে এখনকার মতো তখনও মানুষ মরণাপন্ন প্রিয়জনের কাছে ঘেঁষত না। সেখানে এটি ছিল খানিকটা মানসিক স্বস্তি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে