পূর্ব-পশ্চিম যুক্ত করে ‘দার্জিলিং মেইল’, চলত ঘড়ির কাটা মিলিয়ে

ঢাকা, শনিবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৩ ১৪২৮,   ০৯ সফর ১৪৪৩

শেষ পর্ব

পূর্ব-পশ্চিম যুক্ত করে ‘দার্জিলিং মেইল’, চলত ঘড়ির কাটা মিলিয়ে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৬ ৩ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৪:১৩ ৩ আগস্ট ২০২১

ভারতবর্ষে উচ্চগতিসম্পন্ন ট্রেনগুলোর অন্যতম ছিল দার্জিলিং মেইল

ভারতবর্ষে উচ্চগতিসম্পন্ন ট্রেনগুলোর অন্যতম ছিল দার্জিলিং মেইল

বর্তমান ঈশ্বরদী তখন সাঁড়া থানার অধীনে থাকায় সাঁড়াঘাটই ছিল বৃহত্তর ঈশ্বরদীর প্রাণকেন্দ্র। প্রথমদিকে এই রেলপথে চলাচল করতো ইবিআর এর দু'টি ট্রেন - কলকাতা হতে পার্বতীপুর পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল মেইল এবং কলকাতা হতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত দার্জিলিং মেইল। দার্জিলিং মেল পূর্ব ভারতের একটি কিংবদন্তী ট্রেন। ট্রেনটির পরিসেবা স্বাধীনতার আগে শুরু হয়েছিল এবং বর্তমানেও এটি চলমান। 

তৎকালীন ভারতবর্ষে উচ্চগতিসম্পন্ন ট্রেনগুলোর অন্যতম ছিল এটি। কথিত আছে দার্জিলিং মেইল চলাচল করতো ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে। ১৯৫০-১৯৬০ দশকেও অনেকে ট্রেনের সঙ্গে নিজের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিত। 

প্রথম পর্বের পর...   

দার্জিলিং মেইল কলকাতা হতে ছেড়ে এসে দামুকদিয়া ঘাটে এসে ভিড়তো। সেখানে রেলওয়ে স্টীমার ফেরি সার্ভিসের মাধ্যমে যাত্রী ও মালামাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে অপরদিকে সাঁড়াঘাটে পৌঁছালে সেখান হতে তারা এনবিএসআর এর মিটারগেজ ট্রেনে শিলিগুড়ি পৌঁছাতেন। কলকাতা হতে দামুকদিয়া ঘাট ১৮৫ কিলোমিটার এবং সাঁড়াঘাট হতে শিলিগুড়ি ৩৩৬ কিলোমিটার মোট ৫২১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে চলতো দার্জিলিং মেইল। এর মাঝখানে ৩.৫ কিলোমিটার প্রশস্ত পদ্মার বুকে ছিল রেলওয়ে স্টীমার ফেরি। তখন সাঁড়াঘাট হতে ওই রুট ছিল আবদুলপুর, সুলতানপুর (পরবর্তীতে নামকরণ শান্তাহার), পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, নীলফামারি ও চিলাহাটি হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত।

দার্জিলিং মেইল কলকাতা হতে ছেড়ে এসে দামুকদিয়া ঘাটে এসে ভিড়তোদার্জিলিংগামী যাত্রীরা শিলিগুড়ি পৌঁছে সেখান হতে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর) এর ন্যারোগেজ 'টয় ট্রেন'-এ ৮৫ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ৫ ঘন্টায় দার্জিলিং পৌঁছুতেন। এভাবে কলকাতা হতে দার্জিলিং যেতে সময় নিতো প্রায় ২৪ ঘন্টা।  ১৮৮৪ সালে রেলওয়ের সরকারি অধিগ্রহণের ফলে ১৯১৫ সাল অব্দি ইবিআর এর নাম ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে (ইবিএসআর) ছিল। অতঃপর তা মূল নাম অর্থাৎ ইবিআর-এ ফিরে যায়। উল্লেখ্য এর মাঝে এনবিএসআর ১৮৮৭ সালে ইবিএসআর এর সঙ্গে একীভূত হলে সাঁড়াঘাট হতে পদ্মার পূর্বপাশের ওই রেলপথটিও ইবিএসআর এর অধীনে চলে যায়। পরবর্তীতে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে (এবিআর) ১৯৪২ সালে ইবিআর এর সঙ্গে একীভূত হয়ে বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম রেলওয়ে (বিএআর) নামে আত্মপ্রকাশ করে দেশভাগ পর্যন্ত ওই নামেই রেল চলাচল পরিচালনা করে। 

১৯১৫ সালে পদ্মার ওপর ৫৯০০ ফুট দীর্ঘ হার্ডিঞ্জ রেলসেতু চালু হলে দার্জিলিং মেইল কলকাতা হতে ওই সেতুর ওপর দিয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাতায়াত শুরু করে। তখন পদ্মার পশ্চিমে যথারীতি শেষ স্টেশনটি ছিলো ভেড়ামারা। আর ওই লাইনে পদ্মার অপর পাড়ে নতুন স্টেশন হিসেবে পাকশী ও তার পর ঈশ্বরদীর আবির্ভাব ঘটে। এর ফলে দামুকদিয়া-সাঁড়াঘাট রেলওয়ে স্টীমার ফেরি সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে গেলে ওই দুটি ঘাট তাদের ছত্রিশ বছরের গৌরব হারিয়ে ফেলে। 

১৮৮৪ সালে রেলওয়ের সরকারি অধিগ্রহণের ফলে ১৯১৫ সাল অব্দি ইবিআর এর নাম ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে (ইবিএসআর) ছিলতবে দামুকদিয়ার গৌরব কিছুটা ফিরে আসে ১৯১৬ সালে যখন ভেড়ামারা হতে দামুকদিয়া রেলপথটি চার কিলোমিটার পশ্চিমে পদ্মাপাড়ে রায়টা ঘাট পর্যন্ত বর্ধিত হয়। প্রথমদিকে ওই পথে অর্থাৎ খুলনা হতে যশোর, বেনাপোল, বনগাঁ, রানাঘাট ও দর্শনা হয়ে রায়টা ঘাট পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করতো। যা ১৯৫০ দশকে এসে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে দর্শনা ও রায়টা ঘাটের মধ্যে ট্রেন চলাচল শুরু হয় যা ১৯৮৬ সালে বন্ধ হয়ে গেলে প্রথমে দামুকদিয়া এবং অতঃপর রায়টা ঘাট তাদের সেই গৌরব চিরতরে হারিয়ে ফেলে।

উল্লেখ্য পদ্মার পূর্বপাশে পাকশী হতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত মিটারগেজ লাইন থাকায় ১৯২৬ সালে তা ব্রডগেজে পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত কলকাতা হতে ভেড়ামারা হয়ে হার্ডিঞ্জ রেলসেতুর ওপর দিয়ে পাকশী রেলস্টেশন পর্যন্ত ব্রডগেজ ট্রেন চলাচল করতো। কলকাতা হতে ব্রডগেজ আপ ট্রেন পাকশীতে গিয়ে থামলে যাত্রী ও মালামাল সেখানে অপেক্ষারত মিটারগেজ ট্রেনে স্থানান্তরিত হতো। ডাউন ট্রেনের ক্ষেত্রে সেখানে ঘটতো তার বিপরীত। দার্জিলিং মেইলও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বলাই বাহুল্য ১৯২৬ সালে রেলপথটি সম্পূর্ণভাবে ব্রডগেজে পরিণত হলে দার্জিলিং মেইল সহ অন্যান্য ট্রেন ওই পথে সরাসরি যাতায়াত করা শুরু করে। 

পদ্মার অপর পাড়ে পাকশী ও তার পর ঈশ্বরদী নতুন স্টেশন হলে দামুকদিয়া-সাঁড়াঘাট রেলওয়ে স্টীমার ফেরি সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায় উল্লেখ্য আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে (এবিআর) ১৯৪২ সালে ইবিআর এর সাথে একীভূত হয়ে বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম রেলওয়ে (বিএআর) নাম পরিগ্রহণ করে। বিএআর এর নথি মোতাবেক তখন ওই রেলপথে শিলিগুড়ি পর্যন্ত চলতো তিনটি ট্রেন - দার্জিলিং মেইল (ট্রেন নং ১/২), শিলিগুড়ি প্যাসেঞ্জার (ট্রেন নং ১৩/১৪) এবং নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস (ট্রেন নং ১৫/১৬)। 

দেশভাগের পর ভারতের অংশে ওই রেলপথটি ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে (ইআইআর) এর অধীনে চলে যায় ১৯৫২ সালে যা ইস্টার্ন রেলওয়ে (ইআর) নাম পরিগ্রহণ করে এবং তখন ইআর এর নামেই দার্জিলিং মেইল পরিচালিত হতো। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন - দেশভাগের পর ভারতের ওই অংশে রেলওয়ের নাম পরিবর্তিত হলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ইবিআর নামটি বহাল থাকে। যা ১৯৬১ সালে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে (পিইআর) নাম পরিগ্রহণ করে দেশ স্বাধীন হবার পর হতে যা বাংলাদেশ রেলওয়ে (বিআর) নামে পরিচিত হয়।  বিএআর এর ১৯৪৩ সালের নথিতে দেখা যায় কলকাতা হতে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ভেতর দিয়ে উত্তরবঙ্গ ও আসামে মোট ৬টি ট্রেন চলাচল করতো - দার্জিলিং মেইল, আসাম মেইল, সুরমা মেইল, নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস, আমানুরা প্যাসেঞ্জার ও শিলিগুড়ি প্যাসেঞ্জার। 

দেশভাগের পর ভারতের ওই অংশে রেলওয়ের নাম পরিবর্তিত হলেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ইবিআর নামটি বহাল থাকেএছাড়া পূর্ববঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াত করতো আরও ১২টি ট্রেন যার মধ্যে ৪টি ছিল মেইল ট্রেন। যাহোক সবার মধ্যে উন্নতমানের দার্জিলিং মেইল ছিল সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ। তখন কলকাতা হতে শিলিগুড়ি যাবার পথে আপ দার্জিলিং মেইল (ট্রেন নং ১) মোট ১৭টি স্টেশনে এবং ডাউনে শিলিগুড়ি হতে কলকাতা ফেরার পথে (ট্রেন নং ২) মোট ১৫টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করতো। আপ স্টেশনগুলো ছিল কলকাতা, ব্যারাকপুর, রানাঘাট, পোড়াদহ, ঈশ্বরদী, নাটোর, শান্তাহার, আক্কেলপুর, জামালগঞ্জ, হিলি, চরকাই, ফুলবাড়ি, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, নীলফামারি, হলদিবাড়ি, মন্ডালঘাট, জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি। উল্লেখ্য ডাউনে এর মধ্যে মন্ডালঘাট ও নীলফামারিতে দার্জিলিং মেইল যাত্রাবিরতি করতো না। উল্লেখ্য শুধুমাত্র প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রী ওঠানামার প্রয়োজনে চব্বিশ ঘন্টা আগে জানানোর শর্তে ওই ট্রেন ব্যারাকপুরে যাত্রাবিরতি করতো। 

ট্রেনটি আপে কলকাতা হতে ছাড়তো বিকেল ৩:৪৫-এ এবং শিলিগুড়ি পৌঁছাতো পরের দিন সকাল ৫:৪৫-এ; সময় নিতো ১৪ ঘন্টা। ডাউনে শিলিগুড়ি হতে ছাড়তো রাত ৯:২৫-এ এবং কলকাতা পৌঁছাতো পরের দিন সকাল ৯:৫৫-য়; সময় নিতো সাড়ে ১২ ঘন্টা। তখন কলকাতা হতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত ৫২৭ কিলোমিটার রেলপথে প্রথম শ্রেণীর ভাড়া ছিল ৩৬ টাকা ৫ আনা, দ্বিতীয় শ্রেণী ২১ টাকা ৭ আনা ৯ পাই, ইন্টার শ্রেণী ৮ টাকা ১১ আনা ৬ পাই এবং তৃতীয় শ্রেণীর ভাড়া ছিল ৫ টাকা ১৪ আনা ৩ পাই। উল্লেখ্য ওই সময় উন্নতমানের ১ ভরি সোনার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৬০ টাকা। 

দেশভাগ হলেও কলকাতা হতে পূর্ববঙ্গের মাঝে রেল চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলেও কলকাতা হতে পূর্ববঙ্গের মাঝে রেল চলাচল তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়নি। উল্লেখ্য ওই রেলপথে বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দর্শনায় ১৮৬৮-১৮৬৯ সালে একটি রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয় যার নাম ছিল রামনগর ১৯২০ দশক বা তার পরেও যা ওই নামেই পরিচিত ছিল। ধারণা করা হয়, এর পর কোনো এক সময়ে তা দর্শনা নাম পরিগ্রহণ করে। আর গেদে রেলস্টেশনের প্রতিষ্ঠা হয় দেশভাগের পর সীমান্তে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এর প্রয়োজনে। তার আগে ওই রেলপথে বানপুরই ছিলো বর্তমান ভারত ভূখন্ডের শেষ স্টেশন। ফলে দর্শনায় রামনগর রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত ভারতের বানপুর ও বর্তমান বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার মাঝে তখন কোনো রেলস্টেশন ছিল না। সে' হিসেবে ১৮৬২-১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চুয়াডাঙ্গা রেলস্টেশনটিই বর্তমান বাংলাদেশ ভূখন্ডের সর্বপ্রথম রেলস্টেশন। 

যাহোক এদেশের মধ্য দিয়ে দার্জিলিং মেইল চলাচল বন্ধ হয় ১৯৫০ দশকের শেষার্ধে, মতান্তরে ১৯৬০ বা ১৯৬২ সালে। এছাড়া ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হবার চার-পাঁচদিন পর পর্যন্ত কলকাতা হতে গোয়ালন্দ পর্যন্ত ঢাকা মেইল নামে খ্যাত ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস, খুলনা পর্যন্ত বরিশাল এক্সপ্রেস এবং পার্বতীপুর পর্যন্ত পার্বতীপুর মেইল নামে খ্যাত ইস্ট বেঙ্গল মেইল চলাচল করতো বলে জানা যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে