মনের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এক চিত্রশিল্পী, যার শৈল্পিক গুণ মুগ্ধ করেছিল বিশ্বকবিকেও

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৮,   ১৯ সফর ১৪৪৩

মনের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এক চিত্রশিল্পী, যার শৈল্পিক গুণ মুগ্ধ করেছিল বিশ্বকবিকেও

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১১ ১ আগস্ট ২০২১   আপডেট: ১৭:১৫ ১ আগস্ট ২০২১

ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদারের আঁকা বিখ্যাত একটি ছবি এটি

ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদারের আঁকা বিখ্যাত একটি ছবি এটি

বাঙালি এক চিত্রশিল্পীর আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে যান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বেশ নাম ডাকও হয়েছে সেই শিল্পীর। বিশ্বকবির থেকে মাত্র বছর তিরিশের ছোট সেই শিল্পী। যার হাতের অঙ্কনশৈলী মুগ্ধ করেছিল আরো অনেককে। যার মধ্যে আছে বিখ্যাত মুসোলিনি কন্যা জাপানের প্রখ্যাত চিত্রসমালোচক ওকাকুরাও। 

এই শিল্পীর নাম ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি চিত্রশিল্পী। শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় শিষ্যদের অন্যতম ছিলেন। তার শিল্পীস্বত্বায় ছিল খাঁটি ভারতীয়ত্বের বৈষ্ণবীয় প্রভাব। ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদারের জন্ম ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ৩১ শে জুলাই এবং ১২৯৮ সালের ১৫ শ্রাবণ বঙ্গাব্দে বৃটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জগতাই গ্রামে। অতি অল্প বয়সে তিনি মাতৃহারা হন।
পিতা কেদারনাথ মজুমদার ছিলেন গ্রামের সহজ সরল মনের মানুষ, পেশায় সাব-রেজিস্ট্রার। কিন্তু বাড়িতে ছিল বৈষ্ণবীয় পরিবেশ। কীর্তনের আসরও বসত নিয়মিত । নিজে আগ্রহী ছিলেন সঙ্গীত ও নাটকে।  

ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার ছোটবেলা থেকেই বাবার যাত্রাদলে অভিনয় করতেন পড়াশোনার সঙ্গে নিজের তৈরি যাত্রদলে ছোটবেলা থেকেই অংশগ্রহণ করতে দিতেন ক্ষিতিন্দ্রনাথকে। নিমতিতা মাইনর স্কুল থেকে পাশ করে তিনি দু’বছর পড়াশোনা করেন পাকুড় স্কুলে। তার শৈল্পিক গুণে মুগ্ধ হন স্থানীয় নিমতিতা গ্রামের জমিদার ‘নাট্যশিল্প ও সংস্কৃতি জগতের গুণগ্রাহী’ মহেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। তার আগ্রহে ও আনুকূল্যে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার আর্ট স্কুলে বর্তমানে গভর্মেন্ট আর্ট কলেজে ভর্তি হন। 
এবং ২০ টাকার মাসিক বৃত্তি লাভ করেন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংস্পর্শে আসেন। নবগঠিত ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্টের সাথে যুক্ত হন।

১৯১২ খ্রিস্টাব্দে নন্দলাল বসুর সঙ্গে শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইন্ডিয়ান স্কুল অব ওরিয়েন্টাল আর্টে। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন এবং ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু তার শিল্পকর্ম থেমে থাকেনি। তার অঙ্কিত রাধাকৃষ্ণের দেহ শীর্ণ এবং আভঙ্গ, ত্রিভঙ্গ ও বহু ভঙ্গ ঢঙের। তিনি বাল্যকাল পিতার যাত্রাদলের পৌরাণিক কাহিনীর বিষয়বস্তু গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল মনে, যার প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে শিল্পকর্মে। বিশেষকরে বৈষ্ণবীয় বিষয়বস্তু তার অঙ্কন প্রেরণার প্রধানতম উৎস। সেই সঙ্গে সূক্ষ্ম রূপরেখা, বিশিষ্ট অলংকরণ এবং উচ্চতর বিন্যাসযুক্ত অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তি ছিল যেমন তার শিল্পকর্মের নিজস্বতা।

শিল্পীর আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘দময়ন্তী’তেমনি নান্দনিক আনন্দদানে ছিল সর্বজনীন আবেদন। শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণবধর্মের পাশাপাশি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুনজাগরণবাদী আন্দোলনে বহুলাংশে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তার এক শিষ্য বলেছেন- বৈষ্ণবকাব্যে যেমন বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস, বৈষ্ণবীয় চিত্রমালায় তেমনি ক্ষিতীন্দ্রনাথ। তার ছবি গুলিতে সম্মিলিত হয়েছে বিশ্বাস ও প্রয়োগের বিরল গুণ।

শিল্পাচার্য তার প্রিয় দুই শিষ্য সম্পর্কে বলেছেন - ‘আমার দুটি হাতের একটি নন্দলাল, অপরটি ক্ষিতীন্দ্রনাথ। নন্দলাল শিবসিদ্ধ, আমি মোগল বিষয়ে সিদ্ধ, আর ক্ষিতীন চৈতন্যসিদ্ধ। সূক্ষ্ম রেখারচনা ও সুমধুর বর্ণ বিন্যাসে ক্ষিতীন আমাকে পরাস্ত করেছে’। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ হতে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে তার অঙ্কিত চিত্রের প্রদর্শনী শুরু হয় এবং প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। তার কাজে মুগ্ধ হয়েছেন বিলেতের রয়াল আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম রোথেনস্টাইন। কাশীতে, কলকাতায় তার চিত্র প্রদর্শনী রসিক সমাজে সমাদৃত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ একবার এই ভাবুক শিল্পীকে বলেছিসেন, ‘ঘণ কৃষ্ণ মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে বিদ্যুতের আলোয় রাধাকৃষ্ণের বিমূর্ত ছবি এঁকে দেখাও দেখি।’ শিল্পী আঁকলেন সেই ছবি। জগতাই-এ তার নিজের বাড়িতে দুর্গাপূজা হত। তিনি মূলত চিত্রশিল্পী হলেও একবার নিজের হাতে অপূর্ব দক্ষতায় দুর্গাপ্রতিমা গড়েছিলেন। ১৯১১ সালে পার্ক স্ট্রীটে ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’-এ একটি প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ। সেখানে অবণীন্দ্রনাথের ছবির পাশাপাশি ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণের সাতটি ছবি স্থান পায়। এই প্রদর্শনীতেই ক্ষিতীন্দ্রনাথের ‘পর্বতকন্য পার্বতী’ চিত্রখানি সংগ্রহ করে লেডি হার্ডিঞ্জ এই তরুণ শিল্পীকে বিপুলভাবে অভিনন্দিত করেন।

লর্ড রোনাল্ডজে এই শিল্পীর আঁকা ২০/২২ খানা ছবি কেনেন। মুসোলিনীর কন্যাও চার খানা ছবি কেনেন। ১৯১৮ সালে ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট স্কুল থেকে নন্দলাল বসু চলে যাওয়ার পরে অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ ক্ষিতীন্দ্রনাথকে শিক্ষকরূপে নিয়োগ করেন। এ সময় জাপানের প্রখ্যাত চিত্রসমালোচক ওকাকুরা ক্ষিতীন্দ্রনাথের আঁকা ‘শকুন্তলা’ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ একবার এই ভাবুক শিল্পীকে বলেছিসেন, ‘ঘণ কৃষ্ণ মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে বিদ্যুতের আলোয় রাধাকৃষ্ণের বিমূর্ত ছবি এঁকে দেখাও দেখি।’ শিল্পী আঁকলেন সেই ছবি। মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংগ্রহে রাখলেন ক্ষিতীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি ছবি। এখনও কলকাতা, লাহোর ও ইলাহাবাদের মিউজিয়ামে এবং কাশী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষিতীন্দ্রনাথের আঁকা অনেক ছবি আছে। 

‘পুরুরাভাস’, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদারের আঁকা আরো একটি বিখ্যাত ছবি দেশের দিল্লিতে ন্যাশনাল থিয়েটার অব আর্ট গ্যালারি সহ বিভিন্ন স্থানে বিদেশের বহু জায়গায় তার অঙ্কিত চিত্র সংরক্ষিত আছে। উল্লেখযোগ্য ছবির কয়েকটি হল - 'নৃত্যরত চৈতন্য','রামলীলা', 'রাধিকা', 'দি মুন', 'কচ ও দেবযানী' ইত্যাদি। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় বাংলা কংগ্রেস কমিটি তাকে মেরিট পুরস্কারের ভূষিত করে এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডি.লিট প্রদান করে। 

তার অঙ্কনশৈলী মুগ্ধ করেছিল বিখ্যাত মুসোলিনি কন্যা জাপানের প্রখ্যাত চিত্রসমালোচক ওকাকুরাকেওক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৯ ই ফেব্রুয়ারি এলাহাবাদে ৮৩ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন। শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ঘরের ছেলেকে আমরা মনে রাখিনি। এই প্রতিভাবান শিল্পীর কোনো জন্ম কিংবা মৃত্যু বার্ষিকি সেভাবে মনে রাখে না কেউই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে