ব্রিটিশদের কল্যাণে ভারতবর্ষে রেলগাড়ি, পূর্ব-পশ্চিম যুক্ত করে ‘দার্জিলিং মেইল’

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ১৩ ১৪২৮,   ১৯ সফর ১৪৪৩

১ম পর্ব

ব্রিটিশদের কল্যাণে ভারতবর্ষে রেলগাড়ি, পূর্ব-পশ্চিম যুক্ত করে ‘দার্জিলিং মেইল’

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১১ ৩১ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৪:১৪ ৩ আগস্ট ২০২১

ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে সর্বপ্রথম রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (ইবিআর)

ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে সর্বপ্রথম রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (ইবিআর)

স্থল পথে যাতায়াত ব্যবস্থায় অন্যতম প্রধান মাধ্যম রেলপথ। খরচ কম এবং দ্রুততার জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন রেলে যাতায়াত করছে। ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের কল্যাণেই এসেছিল রেলগাড়ি। ১৮৫৩ সালের কথা। বাংলার প্রথম রেলপথ চালু হয় ১৮৫৪ সালে পশ্চিম বঙ্গের হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রেলপথের উদ্বোধনের মাধ্যমে। 

১৮৭৪ সাল থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে নর্থ বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে নামে ব্রিটিশ সরকার একটি নতুন ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ মিটারগেজ রেললাইন স্থাপন করে। লাইনটি পদ্মার বাম তীর ঘেঁষে সারা (হার্ডিঞ্জ ব্রিজ) থেকে চিলাহাটি হয়ে হিমালয়ের পাদদেশস্থ ভারতের শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত। কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ এবং আসামের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের জন্য পদ্মার উপরে সেতু নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়ে। তারই প্রেক্ষাপটে ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ দুই লেনবিশিষ্ট হার্ডিঞ্জ ব্রিজ রেল চলাচলের জন্য উদ্বোধন করা হয়। এর ফলে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে চিলাহাটি হয়ে কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য স্থানে মালামাল সরবরাহ ও যাত্রী চলাচল গাড়ি বদল ছাড়াই সম্ভব হয়ে ওঠে।  

রেলপথ বাগুলা ও বানপুর হয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রবেশ করে যার প্রথম রেলস্টেশনটি ছিল চুয়াডাঙ্গাতবে এই রেল পূর্ব বাংলায় আসে তার কিছু বছর পর ১৮৫৭ সালে। ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে সর্বপ্রথম রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (ইবিআর)। ইবিআর এর ১৮৫৭ সালের নথি মোতাবেক ওই প্রস্তাবিত রেলপথের বর্ণনা ছিল এমন - সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কলকাতা হতে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত এর ব্রডগেজ লাইনটিই এদেশের সর্বপ্রথম রেলপথ একথা সবাই জানি। আর অনেকে এটাও দাবী করেন জগতিই এদেশের সর্বপ্রথম রেলস্টেশন। কিন্তু রেলপথ নির্মাণের কারিগরি রীতি ও বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা যা উক্ত দাবীকে সমর্থন করেনা। 

উল্লেখ্য প্রচলিত কারিগরি রীতি মোতাবেক যে কোনো রেলপথ নির্মাণ শুরু হয় বেজ স্টেশন থেকে। যা ক্রমান্বয়ে অগ্রবর্তী হয়ে পর্যায়ক্রমে এন্ড স্টেশন -এ গিয়ে শেষ হয়। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওই নির্মিত রেলপথের ওপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রেলস্টেশন, কালভার্ট, সেতু, ইত্যাদি কাঠামো নির্মিত হয়ে থাকে। সেই রীতি মোতাবেক ওই রেলপথটির নির্মাণ শুরু হয় কলকাতা হতে এবং পর্যায়ক্রমে তা শেষ হয় কুষ্টিয়ার সন্নিকটে জগতিতে। 

বাংলার প্রথম রেলপথ চালু হয় ১৮৫৪ সালেউল্লেখ্য জগতিতে প্রতিষ্ঠিত রেলস্টেশনটি প্রথম দিকে 'কুষ্টিয়া' নামে পরিচিত ছিল। ইবিআর এর নথিতেও এর নাম ছিল 'কুষ্টিয়া'। পরবর্তীতে কুষ্টিয়া সদর এবং তৎসংলগ্ন গড়াই নদীর পূর্ব পাড়ে যথাক্রমে 'কুষ্টিয়া' ও  'গড়াই ব্রিজ' (পরবর্তীতে অবলুপ্ত) রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠা হলে জগতিতে স্থাপিত 'কুষ্টিয়া' স্টেশনটি তার স্থানীয় নাম 'জগতি' পরিগ্রহণ করে। উল্লেখ্য সেই প্রক্রিয়ায় কলকাতা হতে শুরু করে জগতি পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে দু'টি পর্যায় পেরুতে হয় যেখানে ওই পথে জগতি রেলস্টেশনের আগে একাধিক রেলস্টেশন নির্মিত হয়েছিল।  

এই রেলপথটির নির্মান কলকাতা হতে শুরু হয়ে তৃতীয় পর্যায়ে জগতিতে গিয়ে শেষ হয়। প্রথম পর্যায়ে বেজ স্টেশন কলকাতা হতে রানাঘাট পর্যন্ত, দ্বিতীয় পর্যায়ে বেজ স্টেশন বাগুলা'র অধীনে রানাঘাট হতে পোড়াদহ পর্যন্ত এবং তৃতীয় পর্যায়ে বেজ স্টেশন পোড়াদহ হতে প্রথমে কুষ্টিয়ার জগতি এবং অতঃপর গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেলপথটি নির্মিত হয়।

বাংলার প্রথম রেলপথ চালু হয় ১৮৫৪ সালেউনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এবং শেষ দিকে ইংল্যান্ডে গড়ে ওঠা রেলওয়ে কোম্পানিগুলো এই সেকশনগুলোর নির্মাণকাজের দায়িত্ব নেয়। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে রেল চলাচল শুরু হয়। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে জয়দেবপুর অবধি রেলপথ সম্প্রসারণ করা হয়। ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ নভেম্বর কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া অবধি রেলপথ চালু করা হয়। সর্ব প্রথম ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডালহৌসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালক পর্ষদের কাছে ভারতবর্ষে রেলওয়ে স্থাপনের জন্য প্রস্তাব পেশ করেন। পরে ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল গেট ইন্ডিয়ার পেনিনসুলার রেলওয়ে নামক কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত মুম্বাই থেকে আনা পর্যন্ত ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল লাইনটির উদ্বোধন করা হয়। এটিই ছিল ব্রিটিশ ভারতের রেলওয়ের প্রথম যাত্রা। 

ইবিআর এর নথিতে কলকাতায় অবস্থিত প্রধান রেলস্টেশনটির নাম ছিল 'কলকাতা' পরবর্তীতে যার নামকরণ হয় শিয়ালদহ। প্রথম পর্যায়ে নির্মিত কলকাতা-রানাঘাট সেকশনে নিয়মিতভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ১৮৬২ সালে। দ্বিতীয় পর্যায়ে সেখান হতে রেলপথ বিছানো শুরু হয়ে বাগুলা ও বানপুর হয়ে তা বর্তমান বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রবেশ করে যার প্রথম রেলস্টেশনটি ছিল চুয়াডাঙ্গা। সে সময় চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা হতে কুষ্টিয়া জেলার জগতী পর্যন্ত। ৫৩.১১ কিলোমিটার ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি (১,৬৭৬ মি.মি.) (ব্রডগেজ) লাইন স্থাপিত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে সেই রেলপথ পোড়াদহে গিয়ে শেষ হলে তৃতীয় পর্যায়ে সেখান হতে তা প্রথমে জগতি পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং তারপর তা সর্বশেষ এন্ড স্টেশন গোয়ালন্দ ঘাটে গিয়ে শেষ হয়। 

সারাদেশে রেলপথ বিছাতে বাঁধা হয় নদী, খালবিল। সেই বাঁধা কাটাতে নদীর উপর দিয়ে তৈরি হয় ব্রিজ, কালভাট এরপর আবার ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি ১৪.৯৮ কিলোমিটার ৩ ফুট ৩৩⁄৮ ইঞ্চি (১,০০০ মি.মি.) (মিটারগেজ) লাইন চালু হয়। ১৮৯১ সালে, ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় তত্‍কালীন বেঙ্গল আসাম রেলওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয়, তবে তা পরবর্তীতে বেঙ্গল আসাম রেলওয়ে কোম্পানি কর্তৃক অধিগৃহীত হয়। ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই, চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ১৪৯,৮৯ কিলোমিটার এবং লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৫০.৮৯ কিলোমিটার মিটারগেজ লাইনের দুইটি সেকশন চালু করা হয়। তার  আগেই ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। 

প্রথমদিকে গেদে ও দর্শনা সহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি রেলস্টেশন ছিল না। যা পরবর্তীকালে নির্মিত হয়। এমনকি প্রথম পর্যায়ের নির্মাণকাজের জন্য কন্সট্রাকশন ডিভিশন ছিল কলকাতায়, দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য বাগুলায় এবং তৃতীয় পর্যায়ের জন্য কন্সট্রাকশন ডিভিশন ছিল পোড়াদহে। কলকাতা হতে রানাঘাট, বাগুলা, বানপুর ও চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে পোড়াদহ হয়ে জগতি পর্যন্ত রেলপথে নিয়মিতভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ১৮৬৪ সালে। তবে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেল চলাচল শুরু হতে ১৮৭১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ওই পথে গোয়ালন্দ ঘাট হতে ঢাকা পর্যন্ত ইবিআর এর রেলওয়ে স্টীমার সার্ভিসের মাধ্যমে ভারতবর্ষের তৎকালীন রাজধানী কলকাতাকে পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করে। 

পদ্মার ওপর দামুকদিয়া-সাঁড়াঘাট রেলওয়ে স্টীমার ফেরি সার্ভিস সুবিধা সহ কলকাতা হতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হয়কলকাতা হতে কুষ্টিয়ার জগতি এবং তারপর গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠার শেষদিকে পোড়াদহ হতে উত্তরে পদ্মার পশ্চিম পাড়ে ভেড়ামারার দামুকদিয়া ঘাট পর্যন্ত ইবিআর এর ব্রডগেজ রেলপথটি নির্মিত হয়। এদিকে প্রায় একই সময়ে পদ্মার অপর পাড় অর্থাৎ বর্তমান পাকশী স্টেশনের পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে সাঁড়াঘাট হতে উত্তরে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নর্দান বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে (এনবিএসআর) এর মিটারগেজ রেলপথ নির্মিত হলে ১৮৭৮ সালে ইবিআর ও এনবিএসআর এর রেলপথের মধ্যবর্তী সংযোগ হিসেবে পদ্মার ওপর দামুকদিয়া-সাঁড়াঘাট রেলওয়ে স্টীমার ফেরি সার্ভিস সুবিধা সহ কলকাতা হতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। 

এনবিএসআর এর ওই লাইনটিই  ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রথম মিটারগেজ রেলওয়ে। তখন দামুকদিয়ায় দু'টি রেলস্টেশন ছিল - দামুকদিয়া ও দামুকদিয়া ঘাট। পাকশী ও ঈশ্বরদীতে তখনও কোনো রেলস্টেশন ছিল না। বর্তমান ঈশ্বরদী তখন সাঁড়া থানার অধীনে থাকায় সাঁড়াঘাটই ছিল বৃহত্তর ঈশ্বরদীর প্রাণকেন্দ্র। প্রথমদিকে এই রেলপথে চলাচল করতো ইবিআর এর দু'টি ট্রেন - কলকাতা হতে পার্বতীপুর পর্যন্ত ইস্ট বেঙ্গল মেইল এবং কলকাতা হতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত দার্জিলিং মেইল। দার্জিলিং মেল পূর্ব ভারতের একটি কিংবদন্তী ট্রেন। ট্রেনটির পরিসেবা স্বাধীনতার আগে শুরু হয়েছিল এবং বর্তমানেও এটি চলমান। 

 দার্জিলিং মেইল চলাচল করতো ঘড়ির কাঁটা মিলিয়েতৎকালীন ভারতবর্ষে উচ্চগতিসম্পন্ন ট্রেনগুলোর অন্যতম ছিল এটি। কথিত আছে দার্জিলিং মেইল চলাচল করতো ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে। ১৯৫০-১৯৬০ দশকেও অনেকে ট্রেনের সঙ্গে নিজের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিত। 

দার্জিলিং মেইল কলকাতা হতে ছেড়ে এসে দামুকদিয়া ঘাটে এসে ভিড়তো। সেখানে রেলওয়ে স্টীমার ফেরি সার্ভিসের মাধ্যমে যাত্রী ও মালামাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে অপরদিকে সাঁড়াঘাটে পৌঁছালে সেখান হতে তারা এনবিএসআর এর মিটারগেজ ট্রেনে শিলিগুড়ি পৌঁছুতেন। কলকাতা হতে দামুকদিয়া ঘাট ১৮৫ কিলোমিটার এবং সাঁড়াঘাট হতে শিলিগুড়ি ৩৩৬ কিলোমিটার মোট ৫২১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে চলতো দার্জিলিং মেইল। এর মাঝখানে ৩.৫ কিলোমিটার প্রশস্ত পদ্মার বুকে ছিলো রেলওয়ে স্টীমার ফেরি। তখন সাঁড়াঘাট হতে ওই রুট ছিল আবদুলপুর, সুলতানপুর (পরবর্তীতে নামকরণ শান্তাহার), পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, নীলফামারি ও চিলাহাটি হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত।

পরবর্তী পর্ব জানতে ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকুন... 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে