প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রামের মাটির তলায় হাজার হাজার টন বিস্ফোরক

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রামের মাটির তলায় হাজার হাজার টন বিস্ফোরক

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩২ ৩১ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৬:৩৪ ৩১ জুলাই ২০২১

ছবিঃ সংগৃহীত

ছবিঃ সংগৃহীত

মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সুইজারল্যান্ডের কিনডের উপত্যকা। মাথার উপর উজ্জ্বল আকাশ, চারপাশে গগনভেদী পাহাড় আর মাঝে ছোট গ্রাম মিতহোলজৎ। নিজেদের ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর করতে পর্যটকদের জন্য আদর্শ ঠিকানা হতে পারে এই গ্রাম।

তবে এই গ্রামের প্রতিটি ঘরের প্রতিটি মানুষের কপালে কিন্তু সারাক্ষণই দুশ্চিন্তার ভাঁজ। প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর হাতছানিকে সঙ্গে করেই বাস তাদের। ৭৪ বছর আগে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ইতিহাস আজও পিছু ছাড়েনি গ্রামবাসীদের।

মাত্র ১৭০টি পরিবারের বাস এই পাহাড়ি গ্রামে। প্রতিটি বাড়ি একই আদলে তৈরি। একতলায় গবাদি পশুর ঘর আর দোতলায় নিজেদের থাকার জায়গা। আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে প্রায় সব গ্রামেই এই কায়দায় গড়ে উঠেছে ঘর-বাড়ি।

৭৪ বছর আগে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ইতিহাস আজও পিছু ছাড়েনি গ্রামবাসীদের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুইস সেনাদের অস্ত্রভাণ্ডার ছিল এই পাহাড়ি গ্রাম। মাটির তলায় গোপনে তারা এই অস্ত্রভাণ্ডার পরিচালনা করত। তাতে মজুত ছিল প্রচুর পরিমাণে বিস্ফোরক। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলে। গোলা-বারুদের রমরমা দেখেই দিন কাটিয়েছেন এই এলাকার বাসিন্দারা।

১৯৪৫ সালে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা হলে বাসিন্দারা ভেবেছিলেন আর কোনো বিস্ফোরণ, গোলাগুলির সম্মুখীন হতে হবে না তাদের। দু’বছর পর দুঃস্বপ্নের রাত আবার ফিরে আসে তাদের জীবনে। ১৯৪৭ সালে গভীর রাতে আচমকা কেঁপে ওঠে গোটা গ্রাম।

মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রামটি

গ্রামবাসীরা মনে করেছিলেন ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে যে দৃশ্য তারা দেখেছিলেন তা আজো চোখের সামনে বিভীষিকা তৈরি করে। চারদিক দাউ দাউ করে জ্বলছিল। প্রাণে বাঁচার মরিয়া চেষ্টায় হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল বাসিন্দাদের মধ্যে। এক রাতের মধ্যেই পুরো গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিলেন, জখমের সংখ্যাও ছিল অসংখ্য। এই গ্রামের এমন কোনও ঘর অবশিষ্ট ছিল না যা আগুনের গ্রাস থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

পরে জানা যায়, অস্ত্রভাণ্ডারে মজুত বিস্ফোরকে বিস্ফোরণেই এই পরিণতি হয়েছিল। রাতারাতি গোটা গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সাত হাজার টন বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটেছিল সে দিন।

গ্রাম খালি করে বিস্ফোরক অন্যত্র সরিয়ে যাওয়ার কাজ

১৯৪৮ সালে সুইস সরকার এই গ্রামকে নিরাপদ ঘোষণা করে এবং ফের বসতি গড়ে তোলার সবুজ সংকেত দেয়। একে একে বাসিন্দারা গ্রামে ফিরে আসেন। ফের নতুন করে বাড়ি বানিয়ে নেন ওই গ্রামে। আর কোনো বিপদ আসবে না এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত ছিলেন। সুইস সরকারের থেকেও তেমনই আশ্বাস মিলেছিল। তাই অনেকেই সঞ্চয়ের অনেকটা খরচ করে স্বপ্নের বাড়ি বানিয়েছিলেন।

২০১৮ সালে সুইস সরকার এই গ্রামে ফের প্রচুর পরিমাণ বিস্ফোরকের খোঁজ পায়। এখনো সাড়ে তিন হাজার টন বিস্ফোরক রয়েছে গোপন অস্ত্রভাণ্ডারে। এমনই জানিয়েছে সুইস সরকার। গ্রাম খালি করে বিস্ফোরক অন্যত্র সরিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করার কথাও ওই সময়ে ঘোষণা করে দেয় সরকার। তা না করলে যে কোনো দিন ফের আর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠতে পারে গোটা গ্রাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভিটে ছাড়তে নারাজ গ্রামবাসীদের একাংশ।

অস্ত্রভাণ্ডারে মজুত বিস্ফোরকের বিস্ফোরণেই এই পরিণতি হয়েছিল

সুইস সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ১০ বছর লাগবে ওই পরিমাণ বিস্ফোরক নিরাপদে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যেতে। আর এই ১০ বছর গ্রামবাসীদের ভিটেছাড়া হয়েই কাটাতে হবে।

এদিকে এর জন্য ক্ষতিপূরণ দিতেও রাজি সুইস সরকার। কিন্তু রাজি হননি গ্রামবাসীদের একাংশ। বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তাই ভিটে আগলে গ্রামেই পড়ে রয়েছেন তারা।

সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা অনলাইন

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচএফ