গুটিবসন্তের টিকা শিশুদের শরীরে সংরক্ষণ করতেন এই বিজ্ঞানী  

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

গুটিবসন্তের টিকা শিশুদের শরীরে সংরক্ষণ করতেন এই বিজ্ঞানী  

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৩৫ ২৯ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১২:৪১ ২৯ জুলাই ২০২১

ফ্রান্সিসকো হাভিয়ের দি বালমিস গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন

ফ্রান্সিসকো হাভিয়ের দি বালমিস গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন

১৮ শতকের একেবারে শুরুতে,  ইউরোপজুড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছিল গুটিবসন্তে। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত বসন্ত মহামারিতে। ১৭৯৬ সালে ইংরেজ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার আবিষ্কার করলেন গো-বসন্তের পুঁজ মানুষের শরীরে প্রবেশ করালে সেটি টিকা হিসেবে কাজ করে; সুস্থ হয়ে ওঠে গুটিবসন্তের রোগী।

হাভিয়ের দি বালমিস ছিলেন স্পেনের রাজদরবার ও সেনাবাহিনীর চিকিৎসক। রাজা চতুর্থ কার্লোসকে স্পেনের উপনিবেশগুলোতে সাম্রাজ্যের খরচে টিকাদান কর্মসূচি চালাতে রাজি করান তিনি। রাজা চতুর্থ কার্লোসের মেয়েও মারা গিয়েছিল গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে।

শিশুদের ব্যবহার করা হত রেফ্রিজারেটর হিসেবে ১৮০৩ সাল। স্পেনের উপনিবেশগুলোতে গুটিবসন্তের টিকা দেওয়ার জন্য জাহাজে চেপে বসেছেন ফ্রান্সিসকো হাভিয়ের দি বালমিস। বালমিসের যাত্রা শুরু হয় উত্তর-পশ্চিম স্পেন থেকে। সঙ্গে হাভিয়ের ২২ জন অনাথ শিশুকে নিয়ে যান। এ যাত্রায় নার্স ও সেবকের দায়িত্ব পালন করেছিল নয় বছর বয়সী বালক ইসাবেল জেন্দাল।

গুটিবসন্তের টিকা কাচের টেস্টটিউবে মাত্র ১২ দিন টিকে থাকত। কাজেই টিকা তাজা রাখার জন্য বিকল্প কৌশল বের করলেন বালমিস। গো-বসন্তের পুঁজ থেকে তৈরি টিকা দিয়ে প্রতি ১০ দিন পরপর দুটি শিশুকে সংক্রমিত করতেন তিনি। ১০ দিন পর আগে আক্রান্ত দুই শিশুর রক্তরস দিয়ে নতুন দুই শিশুকে আক্রান্ত করতেন। এভাবে গন্তব্যে পৌঁছার আগপর্যন্ত এই শিশুদের রেফ্রিজেটর হিসেবে ব্যবহার করে টিকা তাজা রাখতেন বালমিস।

রাজা চতুর্থ কার্লোসের মেয়েও মারা গিয়েছিল গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েশিশুরা অসুস্থ হলেও মারা যেত না। কাজটাকে বর্বর মনে হলেও সে যুগে এরকম কাজকে স্বাভাবিক চোখেই দেখা হতো। গুটিবসন্তের টিকার আবিষ্কারক জেনার নিজেও তার টিকা প্রথমে আট বছর বয়সী এক ছেলের ওপর প্রয়োগ করে পরীক্ষা করেছিলেন।

প্রথম জাহাজে ওঠা ২২ জন শিশুকে মেক্সিকোতে রেখে বালমিস নতুন ২৬ জন শিশুকে নিয়ে ফিলিপাইনের উদ্দেশে রওনা দেন। কাগজপত্র থেকে জানা যায়, এই শিশুদের বয়স ছিল চার থেকে চোদ্দ বছরের মধ্যে। টাকার বিনিময়ে এসব শিশুর বাবা-মায়েরা তাদেরকে বালমিসের হাতে তুলে দিয়েছিল। এ শিশুদের কয়েকজন ছিল 'স্প্যানিশ', বাকিরা মেস্টিজো (মিশ্র রক্তের)।

হাভিয়ের দি বালমিস ছিলেন স্পেনের রাজদরবার ও সেনাবাহিনীর চিকিৎসকবালমিসের এই অভিযান শেষে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, মেক্সিকো, ফিলিপাইন ও চীনের টিন লাখ মানুষ বিনাপয়সায় টিকা পায়।

বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও মহামারিবিদ আলবার্তো গার্সিয়া-বাস্তেরিয়োর মতে, দূর-দূরান্তে টিকা পৌঁছে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত এক উপায় বের করেছিলেন বালমিস। গার্সিয়া-বাস্তেরিয়ো বলেন, আজকের দিনে টিকা পরিবহনের জন্য শিশুদের ব্যবহার করা নৈতিকভাবে অত্যন্ত গর্হিত কাজ মনে হতে পারে—কিন্তু এ কৌশলের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও সুফল অস্বীকার করার জো নেই।

গুটিবসন্তের টিকা দেওয়ার জন্য  বালমিস মেক্সিকো এবং ফিলিপাইন গিয়েছিলেন প্রতি শতকেই পৃথিবী কোনো না কোনো মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। সেই রেস কাটাতে সময় লেখেছে বহুকাল। এরপর আবার যখন পৃথিবী সুস্থ হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে নতুন করে। তখনই আবার কোনো না কোনো ভাইরাসের আক্রমণে দিশেহারা। শত শত বছর কেটে গেলেও এখনো অনেক ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার করা যায়নি।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে