ঘোড়ায় টানা বাস প্যারিস থেকে এসেছিল বাংলায়, জার্নিটা যেমন ছিল

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৫ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

ঘোড়ায় টানা বাস প্যারিস থেকে এসেছিল বাংলায়, জার্নিটা যেমন ছিল

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৪ ২৭ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৫:১৬ ২৭ জুলাই ২০২১

ঘোড়ায় টানা বাস জনপ্রিয় হয়েছিল ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়িয়ে ভারতেও

ঘোড়ায় টানা বাস জনপ্রিয় হয়েছিল ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়িয়ে ভারতেও

চাকার গাড়ি আবিষ্কার হয়েছে বহুকাল আগেই। তবে তা ছিল সময় সাপেক্ষ। পায়ে হাঁটার পর বাংলায়ও দুই চাকার গরু ঘোড়ার গাড়ি ছিল মানুষের একমাত্র ভরসা। তবে ইউরোপ-আমেরিকায় মোটর গাড়ির প্রবর্তনের আগে যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হত একটি বিশাল, বদ্ধ এবং ঘোড়া টানা গাড়ি। 

স্বল্পদূরত্বে যাতায়াতের প্রধান গণপরিবহন ছিল ঘোড়ায় টানা বাস। ১৮৭০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত এই পরিবহন খুব জনপ্রিয় ছিল। এটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ উভয় ক্ষেত্রেই উনিশ শতকের শেষদিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি শহরগুলোতে পরিবহণের অন্যতম সাধারণ মাধ্যম হয়ে ওঠে তখন। দোতলা এই বাস তৈরি হতো কাঠ দিয়ে। চালকের আসন ছিল বাসের বাইরে। ভেতরে দুইপাশে কাঠের বেঞ্চ ছিল যাত্রীদের বসার জন্য। নিচতলায় চার থেকে ছয়জন যাত্রী বসতে পারতো মুখোমুখি হয়ে। কয়েকটা ডাবল ডেকার বাসও তৈরি করেছিল বাস কোম্পানি। উপরতলায় রাখা হতো লাগেজ ও মালপত্র। অবশ্য মালপত্র না থাকলে উপরতলাতেও বসতে পারতো চার থেকে ছয়জন যাত্রী! 

প্যারিসে প্রথম এক ব্যবসায়ী এই বাসের সেবা চালু করেছিলেন বাস শব্দটি ল্যাটিন শব্দ অমনিবাস থেকে এসেছে। ১৮৭০ সালে ইউরোপে জনপ্রিয় হলেও ঘোড়া টানা গাড়ির উৎপত্তি ১৮২০ এর দিকে। প্রথমে এই বাস চালু হয়েছিল সমাজের সম্ভ্রান্ত মানুষদের জন্য। পরে অবশ্য পাবলিক বাস হিসেবেও ব্যবহার শুরু হয়। যার নাম দেওয়া হয় ক্যারেজ।এই ক্যারেজ দেখা যেত প্যারিসের বিভিন্ন রাস্তায়। তবে ভাড়া বৃদ্ধি এবং উচ্চ শ্রেণির মানুষের জন্য বরাদ্দ করায় ১৫ বছরের মধ্যেই এই সেবা বন্ধ হয়ে যায়। 

ব্রিটেনে জন গ্রিনউড ১৮২৪ সালে ম্যানচেস্টারে ব্রিটেনের প্রথম বাস লাইনটি চালু করেন। তার ইচ্ছা ছিল একটি পরিষেবা চালু করা। যেখানে ঘোড়া সওয়ারের সঙ্গে আগে থেকে যাত্রীর কোনো বুকিংয়ের প্রয়োজন নেই। যখন যেখানে দেখা পাবে সেখান থেকেই যে কোনো জায়গায় ভাড়ার বিনিময়ে যেতে পারবে। 

 স্ট্যানলিস বাউড্রি ব্যবসায় দেউলিয়া হয়ে আত্মহত্যা করেন ১৮২৭ সালে স্ট্যানলিস বাউড্রি নামে একজন ব্যবসায়ী একজন ইংরেজ কোচ-নির্মাতা, জর্জ শিলিবিয়ারকে দিয়ে একটি বড় গাড়ির ডিজাইন করান। যেটাতে একসঙ্গে অনেক মানুষ চলতে পারবে। এরপর ১৮২৮ সালে স্ট্যানলিস বাউড্রি প্রথম ফরাসি অমনিবাস লাইন শুরু করেন। যেখানে একবারে দুটি বগিতে ১৬ জন যাত্রী বহন করা যাবে। এটি কিন্তু রেলের প্রথম উদ্ভাবন ছিল বলেই মনে করা হয়। এরপর বাউড্রি প্যারিসে চলে আসেন এবং কোয়ে ডি জেমাপেইসে ওয়ার্কশপ দিয়ে রুয়ে ডি ল্যাঙ্করে এন্টারপ্রাইজ ডেস ওমনিবাস প্রতিষ্ঠা করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ১৮ টি অমনিবাস চালু করেন। 

একবার ভ্রমণের জন্য পঁচিশ সেন্ট মূল্য দিতে হত যাত্রীদের। সকাল সাতটায় এবং সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত চলত এই বাসগুলো। প্রতিটি অমনিবাস বারো থেকে আঠারো জন যাত্রী বহন করতে পারত। প্রথম ছয় মাসে আড়াই মিলিয়নেরও বেশি যাত্রী নিয়ে প্যারিস অমনিবাস পরিষেবাটি জনপ্রিয় সাফল্য অর্জন করে। তবে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় ছিল না বা ভাড়া আদায়কারীরা অর্থের অনেকাংশ নিজের জন্য রেখে দিতেন। এতে প্রথম বছরগুলোতে এই সংস্থাটি ক্রমাগত দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। হতাশায় বাউড্রি ১৮৩০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মহত্যা করেন। এরপর বাউড্রির অংশীদাররা এই সংস্থাটিকে পুনর্গঠিত করেন এবং এটিকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। তবে তার জন্য তাদের বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। 

 স্ট্যানলিস বাউড্রির প্রথম অমনিবাস ১৮৮৮ সালের সেপ্টেম্বরে, লস ডেমস-ব্লাঞ্চেস, একটি প্রতিযোগী সংস্থা নিজস্ব যানবাহন চালানো শুরু করেছিল। ১৮২৯ সালে বাউড্রির পরে  কাব্যিক নামযুক্ত আরও সংস্থা এই ব্যবসায় প্রবেশ করেছে। তখন ছিল লেস সিটিডাইনস, লেস ট্রাইসাইকেলস, ​​লেস অর্লানাইজিস, লেস ডিলিনেটেস, লেস কোকসাইজস, লেস বার্নায়াইসেস, লেস ক্যারোলিনস, লেস ব্যাটিগনোলাইসস, লেস প্যারিসিয়েনেস, লেস হিরোনডেলস, লেস জোসেফাইনস, লেস এক্সেলেনিস, লেস সিল্ফাইডস, লেস কনস্ট্যান্টাইনস, লেস ডেমস-ফরাসিনিয়ান্স লেস ডেমস-রেউনিজ এবং লেস গাজেলস। প্যারিসিয়ানদের জীবনে যাতায়াতের এই উন্নতি সর্বজনীন একটি গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ফলে প্যারিসের বাইরে গিয়ে কাজ করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। এরজন্য প্যারিসের আর্থসামাজিওক অবস্থাও উন্নত হতে থাকে। 

১৮৪৫ সাল নাগাদ প্যারিসে তেরোটি সংস্থা ছিল। যারা তেইশ থেকে তিরিশটি সর্বজনীন লাইন পরিচালনা করে। ১৮৫৫ সালে, নেপোলিয়ন তৃতীয় তাদের প্যারিসের গণপরিবহণের একচেটিয়া প্রতিষ্ঠার সঙ্গে কমপ্যাগনি গ্যানারেল দেস অ্যামনিবাসকে একটি সংস্থায় সংযুক্ত করে। ১৮৭৩ সালের শুরুতে, এগুলো ধীরে ধীরে ট্রামওয়ে দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়। ১৯০৬ সালে তা পুরোপুরি মোটর বাস হয়ে যায়। সর্বশেষ ঘোড়া টানা প্যারিস অমনিবাসটি ১৯ জানুয়ারী, ১৯৩১-এ সেন্ট-সুলপাইস থেকে লা ভিলিট পর্যন্ত চলেছিল। তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশে তখনো চলত ঘোড়া টানা বাস। 

প্যারিসে  স্ট্যানলিস বাউড্রির পর আরো তেরোটি বাস কোম্পানি গড়ে উঠেছিল এরমধ্যে ভারতবর্ষেও এসে গেছে ঘোড়া টানা ট্রাম। ১৮৫৪ সালের অগষ্ট মাস থেকে হাওড়া স্টেশন থেকে হুগলী পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু কলকাতার ভেতরে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ মালপত্র বইবার বা একসঙ্গে অনেক মানুষের যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা ছিলনা। সেই অসুবিধা দূর হল, ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু করে । মার্চ ১৮৭০ থেকে তোড়জোড় শুরু করে, শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বউবাজার, ডালহৌসি স্কোয়ার স্ট্রান্ড রোড হয়ে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত পাতা হল ট্রাম লাইন আর ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩ থেকে ঘোড়ায় টানা ট্রাম গাড়ি চলা শুরু করলো। দুটো বলিষ্ঠ ঘোড়া দিয়ে চালানো হত ট্রাম। এরপর অনেক রাস্তায় ট্রাম লাইন পাতা হল, কলকাতা ট্রামওয়েস কোম্পানী গঠন হল। 

ঘোড়ায় টানা ট্রামই হয়ে উঠলো কলকাতার প্রথম গণপরিবহন ব্যবস্থা। ১৮৯০-৯১ সনে কলকাতায় ট্রাম টানবার জন্য ঘোড়ার সংখ্যা ছিল একহাজার, সবই শীতপ্রধান দেশ থেকে নিয়ে আসা বেশ বলবান ঘোড়া। প্রায় ত্রিশ বছর চালু ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রামের ব্যবস্থা। ঘোড়ায় টানা ট্রামের যুগ শেষ হল ১৯০২এ পৌছে। ২৭শে মার্চ ১৯০২ এ প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চলতে শুরু করলো ধর্মতলা – খিদিরপুর পথে। তার আগে কিছুদিন পরীক্ষামূলক ভাবে কয়েকটি পথে বাষ্পীয় ইঞ্জিন দিয়ে ট্রাম চালানো হয়েছিল । এখন তো কলকাতার কয়েকটা মাত্র পথে ট্রাম চলে।

কলকাতার রাস্তায় ১৯২২ সাল পর্যন্ত চলেছে ঘোড়া টানা বাস ১৮৮৬ সনে জার্মানীতে মোটরগাড়ি আবিষ্কার হওয়ার পর দশ বছরের মধ্যেই কলকাতার রাস্তায় মোটর গাড়ি দেখা দিল, আর তার দশবছর পরে ১৮৯৬এ কলকাতায় চলে এলো ট্যাক্সি। ১৯৪০/৪৫ সাল নাগাদ কলকাতায় ট্যাক্সির ভাড়া ছিল কমপক্ষে আট আনা, তারপর প্রত্যেক ১/৪ মাইলের জন্য দু’আনা। তখন যাতায়াতের জন্য কলকাতায় প্রধান উপায় ছিল ট্রাম। কিন্তু শহরের বাইরে, দূরে যাওয়ার সমস্যা ছিল,কারণ ট্যাক্সিতে খরচ বেশি। অবশেষে ১৯২২ সনে কলকাতায় চালু হয়ে গেল যাত্রীবাহী মোটর বাস। 

তখন কিছু দিনের জন্য ঘোড়ায় টানা বাস চলার কথা জানা যায় । ধর্মতলা থেকে বারাকপুর পর্যন্ত ঘোড়ায় টানা বাস চলেছিল ১৮৩০ সনে । কতদিন চলেছিল –এসব তথ্য জানা যায় না । ১৯২২ থেকে মোটর বাসই হয়ে গেল কলকাতার প্রধান গণ পরিবহন ব্যবস্থা। চালু হওয়ার সময় ১৯২৪এ কলকাতায় বাসের সংখ্যা ছিল ৫৫টি। সেই সংখ্যাটা ১৯২৫ সনে হয় ২৮০ । ১৯২৬এ চালু হয় দোতলা বাস। প্রথম দোতলা বাস চলেছিল শ্যামবাজার থেকে কালিঘাট। প্রথম চালু হওয়া দোতলা বাসগুলো বছর কুড়ি আগে দেখা বা ছবিতে দেখা বাসের মত ছিল না। বাসগুলোর ওপরে ছাদ বা ছাউনি থাকতোনা। বর্ষায় যাত্রীরা ছাতা মাথায় বসে থাকতেন । আশির দশক পর্যন্তও বেশ কিছু প্রধান রাস্তায় দোতলা বাস চলতো। 

মূলত কাঠ দিয়েই তৈরি করা হত তখনকার সময়ের সেই অমনিবাসগুলো তারপর ১৯৯০ থেকে সেই সময়ের সরকার দোতলা বাস চালান বন্ধ করে দেয় । এখনও অনেকেই দোতলা বাসে চড়ার স্মৃতি রোমন্থন করে তৃপ্তি লাভ করেন । এখন নানা চেহারায় এই যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা –বাস, মিনিবাস, অটো ইত্যাদি । ১৯৪৮ থেকে সরকারী বাস চলাচল ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, গঠিত হয় স্টেট ট্রানসপোর্ট কর্পোরেশন। এখন অবশ্য সরকারি বাস সামান্যই চলে । ১৯৭৫এ চালু হয় ‘মিনিবাস’। সেই সময় যারা মিনিবাসে চড়তেন তাদের মনে পড়বে, সেগুলোর উচ্চতা বেশ কম ছিল, যার জন্য সাধারণ উচ্চতার যাত্রিকেও দাঁড়িয়ে যেতে হলে সারাক্ষণ ব্যথা সহ্য করেও বাসের মধ্যে ঘাড় নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো । এই গণ পরিবহন ব্যবস্থার বয়স আপাতত অতয়েব একশ’বছরেরও কম ।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে