পিঠে বইয়ের সম্ভার, চার পায়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরে ‘রোশন’

ঢাকা, রোববার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৪ ১৪২৮,   ১০ সফর ১৪৪৩

পিঠে বইয়ের সম্ভার, চার পায়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরে ‘রোশন’

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:১৩ ১২ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১২:১৮ ১২ জুলাই ২০২১

পিথের দুইদিকে বইয়ের সম্ভার ঝুলিয়ে মুরুর পথে পথে ঘুরে বেড়ায় রোশন

পিথের দুইদিকে বইয়ের সম্ভার ঝুলিয়ে মুরুর পথে পথে ঘুরে বেড়ায় রোশন

শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির কার্যক্রম আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর আগেও হয়েছে। বিশ্বের সব দেশেই মোটামুটি বই পড়ার প্রতি উৎসাহ জোগাতে স্কুল, কলেজে লাইব্রেরি তৈরি করা হয়। তবে অনেকে ভাবেন স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে গল্পের বই পড়ে ক্ষতি হচ্ছে শিশুদের। একেবারেই এমনটা নয়। 

এক গবেষণায় দেখা গেছে, অধ্যয়ন ডিমেনশিয়া এবং অ্যালজাইমার নামের এই রোগ দুটিকে হ্রাস এমনকি প্রতিরোধ করতেও সাহায্য করে। মস্তিষ্ককে সচল রাখলে তা কখনোই তার ক্ষমতা হারাবে না। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও এ কথাটি প্রযোজ্য। বই পড়ার সর্বপ্রথম উপকারিতা হচ্ছে মানসিক উত্তেজনা হ্রাস।

 প্রত্যন্ত এসব অঞ্চলের শিশুরা যাতে পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে না পড়ে তাই এই ব্যবস্থা করেছেন রহিমা জালাল তবে এখন বলছি একেবারে ভিন্ন এক লাইব্রেরির কথা। ভ্রাম্যমাণ বটে! তবে চলে চার চাকায় নয় পায়ে। উঁচু-নিচু মরুপথ দিয়ে মুখ তুলে এগিয়ে চলেছে সে। পিঠে কোনো সওয়ারি নেই। বরং পিঠের দু’দিকে ঝুলে রয়েছে গুচ্ছ বই। কোনোটা সপ্তম শ্রেণির, কোনোটা অষ্টম, কোনোটা আবার নবম বা দশম। মরুপথের কথা জেনে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন চার পায়ের প্রাণীটি উট। আর তার নাম রোশন। সত্যিই ঘরে ঘরে ‘রোশনাই’ পৌঁছে দিচ্ছে সে। প্রত্যন্ত গ্রামের আনাচে-কানাচে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ।

এত গুরুদায়িত্ব নিজের পিঠে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে রোশন। পাকিস্তানের বালুচিস্তানের একটি প্রত্যন্ত জেলা কেজ। এই জেলার বেশির ভাগ মানুষই গরিব। শিক্ষার আলোও গ্রামগুলোর প্রতিটি ঘরে ঢুকতে পারেনি। তার উপর অতিমারিতে একেবারেই ভেঙে পড়েছে এই জেলার শিক্ষা ব্যবস্থা। সেই ২০২০ সাল থেকেই জেলার সমস্ত স্কুল বন্ধ। স্কুল কবে চালু হবে, ফের কবে দল বেঁধে গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়তে যাবে, তার উত্তর কারও কাছে নেই।

যে যার প্রয়োজনীয় বই এখান থেকে নিয়ে পড়তে পারে, চাইলে একদিন নিজের কাছে রাখতেও পারবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল এত দিন পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা ছেলেমেয়েরা কি ফের পড়াশোনার সঙ্গে নিজেদের নিয়মিত জড়িয়ে রাখতে পারবে! স্কুলছুটের সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে না তো! এই প্রশ্নগুলোই ভাবিয়ে তুলেছিল রহিমা জালালকে। রহিমা এই জেলারই একটি স্কুলের প্রধান। অতিমারির কারণে তার নিজের স্কুলও বহু দিন থেকে বন্ধ হয়ে রয়েছে।

রহিমা এবং তার বোন মিলে এর উপায় ভাবতে শুরু করেন। তাদের মাথায় এক অভিনব পরিকল্পনা আসে। তারা এমন কিছু উপায় আনতে চেয়েছিলেন যাতে বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করা যাবে। না, অনলাইন ক্লাসের সুযোগ ওই সমস্ত পড়ুয়াদের কাছে ছিল না। তাদের না রয়েছে মোবাইল ফোন এবং না সেখানে নেটওয়ার্ক পরিষেবা ভাল। ফলে অনলাইন ক্লাস বেশির ভাগের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব ছিল না।

রহিমারা এর নাম দিয়েছেন ‘ক্যামেল লাইব্রেরি প্রোজেক্ট’তাই তাদের কথা ভেবে চলন্ত লাইব্রেরি চালু করলেন তারা। চলন্ত, কারণ এখানে নিজেকে লাইব্রেরিতে পৌঁছতে হয় না। বরং লাইব্রেরি ‘চার পায়ে’ হেঁটে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যায়। ঠিকই বুঝেছেন। রোশনই আসলে সেই চলন্ত লাইব্রেরি। পিঠে বই নিয়ে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যায় সে।

কবে কোন গ্রামে কী বই নিয়ে হাজির হবে তা আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। এ ভাবে প্রতি গ্রামে সপ্তাহে দু’দিন করে পৌঁছে যায় সে। আজ যে বইটা সে পড়ুয়ার কাছে পৌঁছে দিল, দ্বিতীয় দিন সেই বইটা আবার পড়ুয়ারা ফিরিয়ে দেবে রোশনকে। নিয়ম এমনই।

একেক জায়গায় রোশন দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে, শিক্ষার্থীদের এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় বই সংগ্রহ এবং আগের দিন নেয়া বইটি ঝোলার মধ্যে রেখে দিতে হয় প্রতি গ্রামে দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করে সে। এই সময়ে কেউ চাইলে তার পিঠ থেকে প্রয়োজনীয় বই নিয়ে পড়ে ফের ওই দিনই তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে। দু’ঘণ্টা পর বইয়ের সম্ভার নিয়ে ফের রওনা দেয় অন্য কোনো গ্রামে। পরের দিন কী কী বই আনতে হবে তার তালিকাও বানিয়ে নেয়।

রহিমারা এর নাম দিয়েছেন ‘ক্যামেল লাইব্রেরি প্রোজেক্ট’। রহিমাদের এই অভিনব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে এগিয়ে এসেছে বালুচের আরও দু’টি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা— ‘ফিমেল এডুকেশন ট্রাস্ট’ এবং ‘আলিফ লায়লা বুক বাস সোসাইটি’। গত ৩৬ বছর ধরে বালুচিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষা পৌঁছনোর কাজ করছে এই দুই সংস্থা। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে