ঘণ্টা বাজালেই শোনা যায় কিশোরীর আর্তচিৎকার

ঢাকা, বুধবার   ২০ অক্টোবর ২০২১,   কার্তিক ৫ ১৪২৮,   ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ঘণ্টা বাজালেই শোনা যায় কিশোরীর আর্তচিৎকার

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৫ ২৫ জুন ২০২১   আপডেট: ১৩:৫১ ২৫ জুন ২০২১

সুন্দর এই ঘণ্টাই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও শ্রুতিমধুর

সুন্দর এই ঘণ্টাই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও শ্রুতিমধুর

ঘণ্টার প্রতিধ্বনি একদিকে যেমন প্রশান্তি এনে দেয়, তেমনি মনে অস্তিরতাও তৈরি করে। স্কুলের ছুটির ঘণ্টায় মনে একরাশা আনন্দের দোল দিলেও কিছু ঘণ্টার সুমধুর শব্দ আপনার মনে খানিকটা হলেও নাড়া দেবে। আচ্ছা বলুন তো পৃথিবীর সবথেকে বড় আর সুমধুর ঘণ্টা কোনটি। অনেকে কিছু না ভেবেই বলবেন চীনের বেজিংয়ে ‘দ্য জোং’মন্দিরের ঘণ্টাটির কথা। যার আসল মান ‘তা চুং সু’ মন্দির। এই মন্দিরের বিশাল বড় ঘণ্টাটি চোখে পড়বে প্রথমেই। আর এর সুমধুর আওয়াজ শোনা যায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও।  

প্রায় ৪০ টন ওজনের ধাতবের বিশাল এক ঘণ্টা। তার ওপরে আবার ভারী কারুকাজের ছড়াছড়ি। সুন্দর এই ঘণ্টাই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও শ্রুতিমধুর ঘণ্টা যা রয়েছে চীনের বেইজিংয়ে। কথিত আছে, ১৭৩৩ সালে সম্রাট ইয়ংলুর শাসন আমলে সুবিশাল এই ঘণ্টাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্রাটকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামানুসারেই মন্দিরের ভেতর বড় ঘণ্টাটির নামকরণ করা হয় ‘ইয়ংলু'। 

সম্রাট ইয়ংলুঘণ্টাটির উচ্চতা ৫.৫ মিটার ও ব্যাস ৩.৩ মিটার। শুধু বিরাট আকৃতির জন্যই নয় মন্দিরের এই বড় ঘণ্টাটি যখন বাজে তখন ১২০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ তৈরি করতে পারে। রাতের দিকে ৫০ কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায় এই ঘণ্টাধ্বনি। মনে করা হয়, এই ঘণ্টাটিই বিশ্বের শ্রুতিমধুর ঘণ্টা। এমন মন কেড়ে নেয়া মিষ্টি শব্দ পৃথিবীর আর কোনো ঘণ্টাতেই নাকি শুনতে পাওয়া যায়না। নেহাত জনশ্রুতি নয়, রীতিমতো পরীক্ষা নীরিক্ষার পর এই ঘণ্টার শব্দকে শ্রুতিমধুর বলে আখ্যা দিয়েছেন অনেক ধ্বনি বিশারদই।

এর সুমধুর আওয়াজ শোনা যায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকেওতবে এই আশ্চর্য ঘণ্টার মধুর ধ্বনির পেছনে আজও করুণ সুরে বাজে এক মর্মান্তিক ইতিহাস। চীনের সম্রাট ইয়ংলুর শাসনকালে তিনি ‘তা চুং সু’মন্দিরের জন্য এক বিরাট ঘণ্টা নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে শুরু হলো তোড়জোড়। আর এজন্য তিনি ২০০ কারিগরের মধ্যে থেকে বেছে নেন বেইজিং শহরের সেরা কারিগর 'ওং চাং ছি'কে। তার হাতেই সম্রাট তুলে দেন এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ভার। 

সম্রাটের শর্ত একটাই। ঘণ্টা হতে হবে প্রকাণ্ড আর তার আওয়াজ হতে হবে যেমন জোরালো তেমনই শ্রুতিমধুর। কয়েকমাস কাজ শেষে 'ওং চাং ছি' বিশাল এক ঘণ্টা তৈরি করলেন। অপূর্ব কারুকার্য নির্মিত সেই ঘণ্টাটি পর পর দুবার বানানোর পরও সম্রাটের ঘণ্টার ধ্বনি পছন্দ হয় না। আওয়াজ শুনে মন ভরে যাবে এমন সুবিশাল ঘণ্টাই চাই সম্রাটের।  

চীনের বেজিংয়ে ‘দ্য জোং’মন্দিরের ঘণ্টাটি রয়েছে আবারও নতুন করে কাজে নামলেনকারিগর, তবে পুরনো ঘণ্টাটিকে গলিয়ে অ্যালুমিনিয়াম, কাঁসা বা তামা নতুন করে মিশিয়ে আবারো গড়তে হবে সেটি। তবে বারবার ব্যর্থ হওয়া, প্রচুর অর্থ ব্যয় করায় সম্রাট রেগে গেলেন খুব। তৃতীয়বার রাজা রেগে কারিগরসহ তার পরিবারকে হত্যার হুমকি দিলেন। আর এটাই তার শেষ সুযোগ। এবার ঠিকভাবে ঘণ্টা তৈরি করতে না পারলে পরিমাণ হবে ভয়ংকর। কারিগরসহ তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হবে।  

সম্রাটের আদেশ শুনে ভয়ে কেঁপে উঠলেন কারিগর। নিজের প্রাণ গেলে যাক, কিন্তু প্রাণপ্রিয় স্ত্রী আর কন্যাদের জীবন বিপন্ন করতে পারেন না কিছুতেই। তাই নতুনভাবে আবারো কাজ শুরু করলেন তিনি। তবে এক জ্যোতিষী কারিগরকে জানালেন, মন্দিরে কুমারী মেয়ে বলি দিলেই ঘণ্টার শব্দ শ্রুতিমধুর হবে। কিন্তু এ কথা কারিগরের বিশ্বাস না হলেও তার ১২ বছরের মেয়ে সেটা ঠিকই বিশ্বাস করেছিলেন। পরীর মতো ফুটফুটে মেয়েটির নাম মাও আই। নিজের পরিবারের জীবন রক্ষায় ঘণ্টা তৈরির বিরাট চুল্লিতে গনগনে আগুনে ছাপ দিয়ে নিজেকে বিসর্জন করে যান তিনি। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও বাবার জন্য খাবার নিয়ে এসেছিল মাও আই। বাবার খাওয়া হয়ে গেলে পাশে গিয়ে বসে মাও আই। এরপর কিছুক্ষণ বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে ছুটে যায় চুল্লির কাছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ে গনগনে আগুনের চুল্লির মধ্যে। মুহূর্তের মধ্যেই চুল্লি গিলে নিল ছোট্ট পরীর মতো মাও আইকে। এরপর অবশ্য ঘণ্টাতে শ্রুতিও ফিরে এসেছিল, আবার রাজাও সেই ঘণ্টা পছন্দ করেছিলেন।

গনগনে চুল্লির মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে কারিগরের ছোট্ট মেয়ে মাও আইএর অনেক বছর পর এই বিস্ময়কর ঘণ্টার ধাতব গুণ পরীক্ষা করতে গিয়ে গবেষকেরা দেখেন যে তাতে কাঁসা, সোনা তামা এবং ফসফরাস মেশানো হয়েছিল একদম সঠিক অনুপাতে, সম্ভবত এর ফলেই আরও মধুর হয়ে উঠেছিল ঘণ্টাধ্বনি। ঐতিহাসিকেরা এই ধারণাও করেন যে প্রথম দুবার ওং চাং বাকি সবকিছুর মিশ্রণ ঠিক বানালেও হয়তো ফসফরাস মেশাতে ভুলে গেছিলেন। এর একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও তারা দিয়েছিলেন। মানবদেহে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস থাকে। মানুষের শরীরে হাড় আর দাঁতে এই ফসফরাসের পরিমাণ প্রায় ৮৫ শতাংশ। ফলে ওং চাং-এর মেয়ে যখন আগুনে ঝাঁপ দেয় তখন তার দেহের হাড়ের মধ্যে থাকা ফসফরাস বাকি যৌগগুলোর সঙ্গে মিশে যায়।

এখনো এই ঘণ্টা চীনাদের অন্যতম পবিত্রতার প্রতীক হয়ে আছে তবে মেয়ের মৃত্যুর পর ঘণ্টার কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন ওং চাং ছি। এদিকে সম্রাটের সিপাহী এসে জানিয়ে গেল একমাসের মধ্যে কাজ শেষ না হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে ওং চাং ছি ও তার পরিবারের। আত্মীয়স্বজনরা এবার বোঝাতে লাগলো ওং চাং ছিকে। সময়মতো কাজ শেষ করতে না পারলে ছোট মেয়ে আর স্ত্রীকেও হারাতে হবে তাকে। শেষপর্যন্ত মনস্থির করলেন ওং চাং ছি। এই শেষবারের মতো ঘণ্টা বানাবেন তিনি। আবারও শুরু হলো কাজ। আবারও জ্বলে উঠল মৃত মেয়ের ভস্ম রক্তমাখা চুল্লি। 

তবে অনেকের মতে, লোহার সংমিশ্রণে ফসফরাস খুব কম পরিমাণেই লাগে তাও অতো বড় ঘণ্টা তৈরিতে ওই সামান্য ফসফরাস কি আদৌ কোনো ভূমিকা নিয়েছিল?তবে ঘটনা যাই হোক একথা সত্যি যে ওই শেষবারের তৈরি সেই ঘণ্টাই আজ ইতিহাস হয়ে বেঁচে আছে ‘দা জোং' মন্দিরপ্রাঙ্গণে। সুমধুর সুরে সেই ঘণ্টা যখন বাজে কেউ কি শুনতে পায় ১২ বছরের এক ছোট্ট মেয়ের মৃত্যুচিৎকার?

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে