চার দশকেও মেলে নি ‘২১টি মুখওয়ালা রাক্ষস’এর সন্ধান, জাপানের আতস্ক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৯ জুলাই ২০২১,   শ্রাবণ ১৪ ১৪২৮,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

চার দশকেও মেলে নি ‘২১টি মুখওয়ালা রাক্ষস’এর সন্ধান, জাপানের আতস্ক

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৪৮ ১৯ জুন ২০২১   আপডেট: ১২:৫৭ ১৯ জুন ২০২১

২১টি মুখওয়ালা রাক্ষস

২১টি মুখওয়ালা রাক্ষস

১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চের রাত। অপহৃত হলেন এজাকি গ্লিকো কোম্পানির কর্ণধার এজাকি। জাপানের জনপ্রিয় এক ক্যান্ডি কোম্পানি। আইসক্রিম থেকে হ্যাম বার্গার পর্যন্ত সব ধরনের খাবার সরবরাহ করলেও গ্লিকো কোম্পানির সবচেয়ে বেশি নাম ছিল ক্যান্ডির জন্যই। পুডিং, চকলেট, ক্যারামেলের এক বিশাল সম্ভার। জাপানিদের নয়নের মণি গ্লিকো কোম্পানির ক্যান্ডি। তার কর্ণধার অপহৃত। স্বাভাবিকভাবেই হইহই পড়ে যায় টোকিও শহরজুড়ে। তবে আততায়ীর কোনো পাত্তা পাচ্ছে না পুলিশ।

রীতিমতো পুলিশের চোখে ধুলা দিয়ে নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে অপহরণকারী। পুলিশ সন্ধান না পেলেও অবশ্য এজাকি নিজেই পালিয়ে এসেছিলেন। ফিরে এসে পুলিশকে দেখিয়ে দেন, কোথায় তাকে বন্দি করা হয়েছিল। ভাবছেন তো, কাহিনি শেষ, পুলিশ ধরে ফেলেছে অপরাধীকে। এখন বিচারের পালা। না,আসল গল্পের শুরু এখান থেকেই।

এজাকি গ্লিকো কোম্পানির কর্ণধার এজাকিকে অপহরণ করে আততায়ী পুলিশ জায়গাটির সন্ধান পেলেও আততায়ীকে ধরতে পারল না। সারা শহর তল্লাশি করা শুরু হলো। এমন সময় সংবাদপত্রগুলোতে নিয়মিত এক ধরনের চিঠি আসতে থাকল। তাতে পুলিশের অকর্মণ্যতা নিয়ে হাসি-মশকরার পাশাপাশি মাঝে মাঝে কিছু সংকেত দেওয়া হত। যেন সেটা আততায়ীকে ধরিয়ে দেওয়ার কিছু রাস্তা। নাহ, সেসব ছিল শুধুই পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্য। আর এই মশকরা যিনি করছেন, চিঠিতে তার জাপানি নাম লেখা। যার বাংলা অর্থ ‘২১টি মুখওয়ালা রাক্ষস’।

কয়েক বাক্স ক্যান্ডিতে সায়ানাইড মিশিয়ে দেয় ‘গ্লিকো-মরিনাগা কেস’ নামে মামলাটি জাপানের অন্যতম রহস্যময় ঘটনাগুলোর একটি। এই অজানা আততায়ীর জন্য দুটি ক্যান্ডি কোম্পানি বাজার থেকে উঠে যায়। সারা দেশে মৃত্যুর আতঙ্ক দেখা দেয়। ১৯৮৪-৮৫ সাল। জাপানজুড়ে তখন এক অঘোষিত জরুরি অবস্থা। আততায়ীও চুপ করে বসে নেই। বরং পুরো সময়টা পুলিশের সঙ্গে মশকরা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন সেই ২১ মুখের আততায়ী।

এই হাসিমশকরার মাঝেই একদিন একটি বিস্ফোরক কথা লেখা হল। গ্লিকো কোম্পানির স্টোররুমে নাকি কয়েক বাক্স ক্যান্ডিতে সায়ানাইড মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্রে এই খবর প্রকাশ পেতেই শুরু হল মৃত্যুভয়। এর মধ্যে এজিকা সমস্ত বাক্স ফিরিয়ে এনে পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। কোথাও সায়ানাইডের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কিন্তু ততদিনে গ্লিকো-র ব্যবসা লাটে উঠে গিয়েছে।

সারাদেশে আতস্ক ছড়িয়ে পড়ে, কেউ আর ক্যান্ডি খাচ্ছিলোনা মৃত্যুভয়ে এখন নিশ্চয় অনেকে বুঝে গিয়েছেন যে, গ্লিকো কোম্পানির মালিকের সঙ্গে নিশ্চয় ব্যবসায়িক দ্বন্দে কেউ এমনটা করছে। নাহ, এখানেও শেষ হয়নি গল্পের। চলুন আরেকটু সামনে এগিয়ে যাওয়া যাক। ২১ মুখের রহস্যময় ব্যক্তি আরও একটি চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়, জাপানে গরম খুব বেড়েছে। তাই এবার তিনি ইউরোপে যাবেন। একবছর পর আবার ফিরে আসবেন। অবশ্য তার ফিরে আসার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হয়নি। সে-বছর সেপ্টেম্বর মাসেই ফিরে এলেন ২১ মুখের রাক্ষস। এবারের লক্ষ্য মরিনাগা কোম্পানি। একইভাবে সংবাদপত্রে চিঠি লিখে জানানো হল, মরিনাগা কোম্পানির ২০টি ক্যান্ডি বাক্সে সায়ানাইড মেশানো হয়েছে। এই কথাটিও লেখা হয়েছে বেশ গুছিয়ে। যেন বা কোম্পানি একধরনের পরীক্ষার জন্য নতুন ফ্লেবার যোগ করেছে। তবে চিঠিতে একথাও বলা হয়, বাক্সগুলোর গায়ে সতর্কতা চিহ্ন দেওয়া আছে।

এই স্কেস ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন দেশে, তারপরও হদিস পাওয়া যায়নি আততাতীর সত্যিই সতর্কতা চিহ্নযুক্ত বাক্স পেলেন বেশ কিছু বিক্রেতা। পুলিশের ফরেন্সিক ল্যাবে সেগুলো পরীক্ষা করা হল। আগেরবার যা ঘটেনি তা এইবার ঘটল। সত্যিই সায়ানাইডের নমুনা পাওয়া গেল ২০টি বাক্সের ক্যান্ডিতে। বাকিগুলো স্বাভাবিক। সেই আততায়ী আবারও চিঠি লিখে জানালেন যে এবার সব বাক্স সতর্কতা চিহ্ন ছাড়াই পাঠানো হবে। বিক্রেতারা কেউই আর মরিনাগা কোম্পানির ক্যান্ডি বিক্রি করতে রাজি নন। আবারও পুরো দেশে মৃত্যুভয়। এবারেও বন্ধ করে দিতে হল মরিনাগা কোম্পানি।

জাপানি পুলিশের নাকের ডগায় বসেও ঘোল খাইয়ে দিয়েছেনদুটি ঘটনার পর রহস্যজনকভাবেই বন্ধ হয়ে যায় এই উপদ্রব। অবশ্য তার আগে আততায়ী আবারও একটি চিঠিতে জানিয়ে দেয়, জাপানি ক্যান্ডি কোম্পানিদের উপর তার আর কোনো আক্রোশ নেই। এরপর সে অন্য কোথাও অন্য কোনো ধরনের খারাপ কাজ করবে। কিন্তু জাপানের ক্যান্ডি কোম্পানিদের সঙ্গে কোনো শত্রুতা করবে না।

সেই থেকে ফাইলবন্দি হয়ে আছে ‘গ্লিকো-মরিনাগা কেস’। আজও তার সমাধান হয়নি। শুধু সেই সময়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজ থেকে এক রহস্যময় ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছিল পুলিশ। আর তাকে নাকি বেশ কয়েকজন পুলিশ অফিসার নানা সময় তদন্তের জায়গার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে। সেই আততায়ীর স্কেচও তৈরি করা হয়েছিল। সারাদেশে এই ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি প্রতিবেশী অনেক দেশেই এই স্কেচের ব্যক্তিকে খোঁজা হয়েছিল। জাপানি পুলিশের নাকের ডগায় বসেও ঘোল খাইয়ে দিয়েছেন। একবার নয়, দুবার। তবে চার দশক কেটে গেলে এখনো সন্ধান মেলে নি তার। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে