পুতুল বাড়ির নৃশংস হত্যাকাণ্ড, রাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘রহস্য’

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১,   আশ্বিন ৯ ১৪২৮,   ১৫ সফর ১৪৪৩

পুতুল বাড়ির নৃশংস হত্যাকাণ্ড, রাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে ‘রহস্য’

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫৬ ৩১ মে ২০২১   আপডেট: ১৬:০৩ ৩১ মে ২০২১

পুতুল বাড়িতে এখনো ঘুরে বেড়ায় পুতুলরূপী নারীদের আত্মা

পুতুল বাড়িতে এখনো ঘুরে বেড়ায় পুতুলরূপী নারীদের আত্মা

ভূত প্রেত দেখলে ভয়ে মানুষের আত্নারাম বের হবার জোগাড় হয়। এরপরও মানুষ খুব আগ্রহ নিয়েই এদের গল্পগুলো শোনেন। ভূত বলতে কিছুই নেই। এ কথা মুখে স্বীকার করলেও ভূতুরে আঁকড়ার কথা শুনলেই সাহসের পরিধি দেখাতে এক রাত কাটিয়ে আসেন সেখানে। এমনই এক জায়গা কলকাতার পুতুল বাড়ি। আহরিটোলার বিশাল রোমান স্থাপত্যের নির্দশন এই পুতুলবাড়ি। এই বাড়ির উপরের তলায় নাকি ঘুরে বেড়ায় অতৃপ্ত পেত্নীরা। পুতুলরূপী নারীদের অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায় এ বাড়ির আনাচে-কানাচে। 

প্রায় ২০০ বছরের পুরনো বাড়িটি সাড়ে ৯ কাঠা জমির উপর দাঁড়িয়ে। মূলত তিনতলা, কিন্তু, এখনকার তিনতলা বাড়ির সঙ্গে তুলনা করলে বাড়িটি প্রায় ছয় তলার সমান। রোমান স্থাপত্যশিল্পের আদলে তৈরি বাড়ি। বাইরের তুলনায় ভেতরের অংশে কারুকার্যের বহর অনেকটাই বেশি। ভেতরের দেয়ালে হিন্দু দেবদেবীর নানান ছবি, মূর্তি খোদাই করা! পুতুলবাড়ির সম্মুখভাগে একাধিক দরজা থাকলেও বাড়িতে ঢোকার দরজা একটাই। বাকিগুলো নকল। কোনো কালেই এগুলো দরজা ছিল না। মূল প্রবেশদ্বার ছাড়া বাড়িতে ঢোকার আর একটি গোপন পথ আছে, সেটিপেছনের অংশ। যেটা রেললাইনের দিক থেকে।

বাচ্চা মেয়েটি মারা যাওয়ার পর তার আত্মা এই বাড়িতেই রয়ে যায় বর্তমানে বাড়ির মালিক ‘নট্ট পরিবার’। এর আগে এই বাড়ি সাহা পরিবারের হাতে ছিল। ১৮৬৯ সালে স্বর্গীয় বৈকুণ্ঠনাথ নট্টের হাত ধরে প্রথম এক যাত্রাদলের অভিযান শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের বরিশালে। সেই যাত্রা দলের নাম ছিল ‘মার্চরং বৈকুণ্ঠ সঙ্গীত সমাজ’। ধীরে ধীরে তাদের অভিনয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা, যশোর, খুলনা-সহ কলকাতাতেও। বাংলা ভাগের অনেক আগে এই নট্ট পরিবারের একটি শাখা কলকাতায় চলে আসে এবং তাদের মতো করে যাত্রাদলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সেই যাত্রা দলের বর্তমান নাম হচ্ছে ‘নট্ট যাত্রা কোম্পানি’। এই যাত্রাদলের নানান সাজসরঞ্জাম রাখা ও রিহার্সালের জন্য এই বাড়ির উপরের কয়েকটি ঘর ভাড়া নেয়া হয়।

১৯৭৮-এ ওই বাড়ির তৎকালীন মালিক সাহা পরিবারের প্রায় ৭৮ জন সদস্যের লিখিত সম্মতিতে মালিকানা পেয়েছিলেন বিখ্যাত যাত্রাশিল্পী স্বর্গীয় মাখনলাল নট্ট। তিনি ২০১৫ সালে প্রয়াত হন। বর্তমানে এই বাড়ির একতলায় একটি সুতার কল আছে। এ ছাড়া বেশ কিছু ঘর বিভিন্ন কোম্পানির গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাড়ির দোতলাটা সেই মাখনলাল নট্টের আমল থেকেই কিন্তু ভাড়াটেদের অধীনে। বাড়ির তিনতলায় নট্ট পরিবারের বেশ কিছু সদস্যের বাস এবং যাত্রাদলের জন্য বরাদ্দ দু’টি ঘর কিন্তু আজও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

বাড়িটি ২০০ বছরের পুরনো সমস্যার সূত্রপাত হয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে। শোনা যায়, এই পরিবারের কোনো এক ব্যক্তি তার শিশুকন্যাকে খুবই ভালোবাসতেন এবং স্নেহ করতেন। সেই বাচ্চা মেয়েটি সারাক্ষণ পুতুল নিয়ে লেখায় মগ্ন থাকত। ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ সেই বাবা এই বাড়ির বিভিন্ন স্থানে পুতুলের মূর্তি তৈরি করেন। তবে হঠাৎ করেই বাচ্চাটি  মারা যায়। আর তারপরই শুরু হয় আতঙ্কের বাতাবরণ। শোনা যায়, মেয়েটির মৃত্যুর পরেই নাকি তার অশরীরী আত্মা বাড়ির অন্দরমহলে বিচরণ করতে শুরু করে। বাতাসে কান পাতলেই নাকি তার খিলখিল হাসির শব্দ শোনা যেত। এ ছাড়াও রাতের অন্ধকারে পুতুলগুলোর জীবন্ত হয়ে ওঠার কাহিনীও শোনা গিয়েছে। বাড়ির পেছনের দিক থেকে দেখলে পুতুল বা ওই জাতীয় কিছু মূর্তি এখনও দেখা যায়। 

ভেতরের দেয়ালে হিন্দু দেবদেবীর নানান ছবি, মূর্তি খোদাই করা! 1

মেয়েদের উপর নির্যাতনের ইতিহাস আরও আছে। পরবর্তী সময়ে এই বাড়িটিতে এক বড়লোক মনিব বাস করতেন। বাড়ি দেখাশোনায় কয়েকজন দাসীও কাজ করত। মনিব দাসীদের সঙ্গে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক করতেন। কিছু দাসী মনিবের এ অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় তাদের হত্যা করা হয়। হত্যার পর বাড়ির পেছনে তাদের লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল। তবে এক সময় রাজাদের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয় নারী নির্যাতন। কিন্তু নির্যাতিত ও খুন হওয়া মেয়েদের আহাজারিতে যায়গাটা একটা অভিশপ্ত বাড়িতে রুপান্তারিত হয়। পরবর্তীকালে যারাই এই বাড়িতে থেকেছেন তারা রাতের বেলা অচেনা নারীর কণ্ঠস্বর, হাসির শব্দ, চিৎকার কিংবা কান্নার আওয়াজ পেয়েছেন। অনেকেই বাড়ির বিভিন্ন স্থানে সাদা পোশাক পড়া নারীর ছায়া দেখতে পেয়েছেন।

এখানেই শেষ নয়, আরও আছে। কানাঘুষো শোনা যায় যে, ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষে সরকারবিরোধী কার্যকলাপের জন্য বহু মানুষকে এ বাড়িতে এনে তাদের নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং সেই সমস্ত মানুষদের আত্মারা নাকি রাতের অন্ধকারে ফিসফিস করে কথা বলে এবং বিচিত্র সব আওয়াজের সৃষ্টি করে। জমিদারের ইতিহাসের বহুকাল পার হলেও এখনো মাঝে মাঝে রাতে মেয়েলি কণ্ঠের অশরীরীদের কান্নার শব্দ শোনা যায়। স্থানীয়দের ধারণা মনিবের এ পাপের কারণে এখনো পুতুলবাড়িতে অশরীরী আত্মার আনাগোনা। ভয়ংকর এই পুতুলবাড়ি নিয়ে রহস্য আজও সবার মুখে মুখে। 

কোনো এক জমিদার তার মেয়ে পুতুল ভালোবাসত বলে, বাড়ির চারপাশে পুতুলের মূর্তি বানান বাংলা সাহিত্যে পুতুলের বাড়িটি নিয়ে সত্যজিৎ রায় ও লিলা মজুমদারের কিছু ভয়ঙ্কর গল্প রয়েছে। এটা কলকাতা শহরের সবচেয়ে রহস্যজনক স্থান। গভীর রাতে তো বটেই এমনকি ভরদুপুরেও কিছু অশরীরীর উপদ্রব রয়েছে এখানে। তবে আশার কথা হচ্ছে, এতো এতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলেও কেউ এখানে মারা যায়নি। মৃত শিশুটির হাসির শব্দ, নারীর অতৃপ্ত আত্মা কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রামী শহিদদের এত কার্যকলাপ সত্ত্বেও এই বাড়িতে কেউ আত্মহত্যা করেননি, কেউ হার্ট আটাকে মারা যাননি। এমনকি এখনো এখানে মানুষ বসবাস করছেন। ভূতের ভয়ে কেউ পালিয়েও যায়নি। এ বাড়িতে বছরের পর বছর ধরে স্বচ্ছন্দে বাস করছেন সবাই। এ ছাড়া রহস্যময় পুতুলবাড়ি-তে যারা রয়েছেন তারা কিন্তু কোনো ভূতুড়ে বা অলৌকিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীনও হননি। সবই তারা শুনেছেন।

বর্তমানে এই বাড়ির নিজ তলায় একটি সুতার কারখানা আছে এবং কয়েকঘর মানুষ বাস করেন বর্তমানে বাড়িটি কলকাতা পুরসভার ‘হেরিটেজ বিল্ডিং’-এর তকমা পেয়েছে। ১৯৯২-তে রোলান্ড জোফে নির্দেশিত ‘সিটি অব জয়’-এর শুটিংও হয়েছিল এই বাড়িতে। অনেকের ধারণা, ব্রিটিশ আমলের জং ধরা বাড়ি ছাড়া আর কোনো বিশেষত্ব নেই এর। বাকি সবকিছুই মনগড়া গল্পের গায়ে রঙিন রং লাগিয়ে সেটাকে ‘মগজ ধোলাই’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু আমরা ভয় পেতে ভালোবাসি, তাই সেই ভয় পাওয়া বা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পুতুলবাড়িকে অযথা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে কেউ কেউ। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে