প্রাচীন অন্ধবিশ্বাসের সাক্ষী এসব গুহাচিত্র

ঢাকা, বুধবার   ১৬ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৪ ১৪২৮,   ০৪ জ্বিলকদ ১৪৪২

প্রাচীন অন্ধবিশ্বাসের সাক্ষী এসব গুহাচিত্র

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৮:০৫ ১৯ মে ২০২১   আপডেট: ০৮:০৬ ১৯ মে ২০২১

গুহাচিত্রগুলোতে পাওয়া যায় প্রাচীন মানুষদের জীবনযাপনের ছাপ

গুহাচিত্রগুলোতে পাওয়া যায় প্রাচীন মানুষদের জীবনযাপনের ছাপ

বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রত্নতাত্ত্বিকদের আবিষ্কারের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে গুহাচিত্র। বিভিন্ন সময় গুহায় বাস করা মানুষেরা তাদের জীবনযাপন কীভাবে কাটাতো, সংস্কৃতির বিভিন্ন কথা লিখে রেখেছে। আবার শুধুই শিশুদের হাতের ছাপ কিংবা পশু পাখির ছবিও পাওয়া যায় অনেক জায়গায়। যা সেই সময়ের মানুষের সঙ্গে পৃথিবীতে বাস করা প্রাণীকুলের ব্যাপারেও ধারণা দেয়।

প্রাচীন সমাজের ও মানুষের বিবর্তনের অনেক কথা আমরা জানতে পারি গুহাচিত্র থেকে। চিত্রশিল্পের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত হলো এই গুহাচিত্র তখন মানুষ কীভাবে জীবন কাটাতো ও ধীরে ধীরে কীভাবে পরিবর্তন হলো তা জানতে পারা যায় এর থেকেই। আবিষ্কার করা বিভিন্ন গুহাচিত্রগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার মারকো দ্বীপের গুহাচিত্রটিই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন যার আনুমানিক বয়স প্রায় ৩৫ হাজার বছর। শুধু ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে অন্তত ২৪২টি গুহা আছে, যেগুলোতে প্রাচীন সব গুহাচিত্র আঁকা আছে।

এই চিত্রটির বয়স বয়স প্রায় ৩৫ হাজার বছরগুহাচিত্রগুলো ভালো করলে দেখলে বোঝা যাবে যে এর মূল বিষয়বস্তু ছিল শিকার, নানা ধরণের জীব-জন্তু এবং সেই সময়ের মানুষের জীবন চালানোর ব্যবস্থা। প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষের প্রধান শিকার করার জন্তু হয়ে উঠেছিলো বাইসন ও হরিণ। এই প্রাণীগুলো শিকারের চিত্রই বেশিরভাগ ছবিতে ফুটে উঠেছে।

কোনো ছবিতে আছে অস্ত্র-বিদ্ধ পশু, আবার কোনোটায় আছে আহত পশু। কোনোটিতে অনেক ধরণের পশুর পালও আঁকা রয়েছে। মানুষকে নিয়ে আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে আছে ঘোড়াসওয়ারের ছবি, নানা ধরণের নৃত্যের ভঙ্গিমা, বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের ছবি এঁকেছে তারা। শুধু ফ্রান্স এবং স্পেন থেকেই প্রায় ৩৪০টি গুহাচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়াও বুলগেরিয়া, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, রাশিয়া, রোমানিয়া, ইংল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নানা প্রান্তে গুহাচিত্র ছড়িয়ে রয়েছে।

প্রাণী শিকারের চিত্রই বেশিরভাগ ছবিতে ফুটে উঠেছে

দক্ষিণ আফ্রিকায় আবার স্যান তির মানুষের আঁকা কিছু চিত্র পাওয়া গিয়েছে যা গুহায় আঁকা। এগুলোর আবার আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর। এতে যেমন মানুষের ছবি আছে তেমন আছে পশুর ছবি। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই এগুলো আঁকা হয়েছে বলে সকলে মনে করেন।

২০০২ সালে এক ফরাসী প্রত্নতাত্বিক দল সোমালিয়ায় ৫ হাজার বছরের একটি গুহাচিত্রের খোঁজ পায় যেখানে বন্যপশু ও সাজসজ্জা করা গরুর ছবি খুঁজে বের করে তারা। শিল্পীরা প্রাকৃতিক উপাদানই নিয়েই চিত্রগুলি আঁকত। রঙ হিসেবে রঙিন মাটি, কয়লা ও বিভিন্ন খনিজ দ্রব্য ব্যবহার করতো তারা। গুহার দেওয়াল সমান করার জন্য পাথর দিয়ে ঘষার কায়দাও জানতো তারা।

অন্ধকার গুহায় আলো জ্বালানোর জন্য পাথরের প্রদীপ জ্বালানো হতো যার জ্বালানি ছিল শিকার করা পশুর চর্বি। ভারতের মধ্য প্রদেশের প্রাচীন মানব বসতির নিদর্শন হিসেবে রয়েছে ভীমবেটকা প্রস্তরক্ষেত্র। এখানে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন চিত্রটি আবার ৩০ হাজার বছর আগের। এই চিত্রগুলোতে মানব শিশুর জন্ম থেকে নৃত্য,ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মৃতদেহ সৎকারের দৃশ্য সবই রয়েছে।

চিত্রগুলোতে মানব শিশুর জন্ম থেকে নৃত্য,ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মৃতদেহ সৎকারের দৃশ্য সবই রয়েছেপ্রথম কোথায় গুহাচিত্রগুলো শুরু করা হয়েছিল তার ব্যাপারে আমাদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। এক মতবাদে জানা যায়, প্যালিওলিথিক যুগের শুরুর দিকে বিবর্তনের ধারায় ইউরোপে প্রস্তর যুগের এই শিল্প শুরু হয়। আজ থেকে ৪০ হাজার-১৪ হাজার বছর আগের সময়কাল সেটা। কেন গুহার গায়ে ছবি আঁকা হয়েছিল তার সঠিক কারণ আজ জানা মুশকিল। কারো মতে, এর পেছনে জাদু বিশ্বাস ছিল, কারো মতে মানুষের গল্প বলার আকাঙ্ক্ষা ছিল, কারো মতে এগুলো নানা সাংকেতিক তথ্য সংরক্ষণ করেছে, কেউবা এগুলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ধর্ম চর্চার নমুনা হিশাবেও দেখেছেন।

এমনকি কোনো কোনো গবেষক এইসব গুহাচিত্রের মধ্যে মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রমণ্ডলীর মানচিত্রের আদলও লক্ষ করেছেন। নানা মুনির নানা মত আছে, তাদের মতের নানা যুক্তি-প্রতিযুক্তিও আছে, কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে কোনো মতই প্রমাণিত নয়। তবে এটাও ঠিক যে, অধিকাংশ গুহাচিত্র এমন অবস্থানে এমন জায়গায় আঁকা হয়েছে, যে জায়গায় মানুষের হাত পৌঁছায় না এমনকি আলোও পৌঁছায় না। অন্ধকার এই গুহাগুলোতে শুধু আপন মনের খেয়ালে ছবি আঁকা হয় নি সেটা অনুমান করা যায়। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যে সব গুহায় ছবি আঁকা হয়েছে নানা পরীক্ষায় দেখা গেছে সেখানে মানুষ বাস করত না। খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষ এই গুহা ব্যবহার করত। হয়তো এইসব গুহা পবিত্র এবং গোপনীয় কোনো স্থান হিশাবেই ব্যবহৃত হতো।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে