কবির লেখা কবিতার লাইন ভাগ্য গণনার মন্ত্র এদেশে 

ঢাকা, বুধবার   ১৬ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৪ ১৪২৮,   ০৪ জ্বিলকদ ১৪৪২

কবির লেখা কবিতার লাইন ভাগ্য গণনার মন্ত্র এদেশে 

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:২৩ ১৮ মে ২০২১   আপডেট: ১৩:৩৪ ১৮ মে ২০২১

ইরানের বিখ্যাত কবি ছিলেন শামসুদ্দিন মুহম্মদ হাফিজ

ইরানের বিখ্যাত কবি ছিলেন শামসুদ্দিন মুহম্মদ হাফিজ

টিয়া পাখি কিংবা হাতের রেখা দিয়ে অনেকেই ভাগ্য গণনা করেন। তবে এর কতটুকু সত্যি আর কতটুকু ভুল তার কোনো ধার ধারেন না কেউ। নিশ্চয় বিশ্বকাপ ফুটবলের কথা মনে আছে? অক্টোপাস, বিড়াল, হাতি, ভাল্লুক বা ডলফিন দিয়ে ম্যাচের ফলাফল আগাম নির্ধারণ করার পদ্ধতি। 

ভাগ্যগণনার বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি এই পৃথিবীতে প্রচলিত আছে। মূলত হাতের রেখা বিচার করে ভাগ্য গণনা করা হয়। তবে আমাদের দেশে কুষ্ঠী বিচার করে ভাগ্যগণনার যে রীতি প্রচলিত তা সব জায়গায় দেখা যায় না। আবার কোনো কোনো জায়গায় কপাল দেখে ভাগ্য গণনার পদ্ধতি প্রচলিত আছে। তবে এতো এতো পদ্ধতি থাকলেও এগুলোর কোনোটিই সর্বজন স্বীকৃত নয়।

টিয়া পাখি দিয়ে এভাবে ভাগ্য গণনার চল বহু প্রাচীন ইরানে এক অদ্ভুত ধরনের ভাগ্য গণনা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এখানে খাঁচায় বন্দী হলুদ রঙের ক্যানারি পাখিকে দিয়ে বিখ্যাত কবি হাফিজের কবিতার লাইন লেখা কার্ড নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে ভাগ্য গণনা করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে ভাগ্য গণনা প্রথম প্রচলিত হয়েছিল ওই দেশের সিরাজ শহরে। বর্তমানে ইরানের সাধারণ মানুষ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকেও অনেকেই এই পদ্ধতিতে ভাগ্য গণনা করার জন্য ইরানে এসে হাজির হয়। এই পদ্ধতিতে ভাগ্যগণনার পোশাকি নাম হল ফাল-এ-হাফিজ।

শামসুদ্দিন মুহম্মদ হাফিজ ছিলেন চতুর্দশ শতকে ইরানের বিখ্যাত কবি চতুর্দশ শতকে ইরানের বিখ্যাত কবি ছিলেন শামসুদ্দিন মুহম্মদ হাফিজ। তিনি সিরাজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মূলত সেখানেই জীবনের সব ক’টি দিন কাটিয়েছিলেন। সেসময় হাফিজের লেখা কবিতা এবং গজল তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল। বর্তমান ইরানের সেই সময় নাম ছিল পারস্য। এই পারস্যের শাসকেরা হাফিজের সমস্ত কবিতা এবং গজলকে ভাল নজরে দেখেনি। মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহ নিয়ে কি করা হবে তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না শাসকরা। তারপর ঠিক করা হয় তার প্রধান কাব্যগ্রন্থ ‘ডিভাইন’-এর প্রথম পাতায় থাকা কবিতার প্রথম লাইনে যা লেখা থাকবে তাই হবে বিখ্যাত কবি হাফিজের শেষ পরিণতি। ঘটনাচক্রে সেই প্রথম লাইনে লেখা ছিল ‘আমি জানি আমি জান্নাতে যাব। তবে বেশ কিছু পাপের ভাগীদার আমি’।

বিখ্যাত এই কবি নিজের মুখেই নিজের পাপের কথা স্বীকার করেছেন মনে করে তৎকালীন শাসকরা আর পাঁচটা মানুষের মতো হাফিজের মৃতদেহ কবর দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে মনে করা হয়। এই রীতি থেকেই হাফিজের কবিতার লাইন ব্যবহার করে ভাগ্যগণনার প্রচলন গড়ে ওঠে পারস্যে, যা আজও বহমান।

বিখ্যাত হলেও সেসময় হাফিজের লেখা কবিতা এবং গজল তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার কাছে চ্যালেঞ্জ ছিলফলে এই পদ্ধতিতে ভাগ্যগণনার জন্য এই বিখ্যাত কবির নাম বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লেও তার কৃতিত্ব কম নয়। মূলত তার শ্রেষ্ঠ রচনা ওপর ভর করে ইরানের আমজনতার মধ্যেও কবিতার চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। এইদেশের মজুর থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া সমস্ত মানুষের মুখে হাফিজের শায়েরী এবং গজলের লাইন শোনা যায়।

কবি মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহ কি করা হবে, তাও বের করা হয়েছিল তার লেখা কবিতার লাইন থেকে যে সিরাজ শহরে এই বিখ্যাত কবির জন্ম হয় তা বর্তমানে ‘সিটি অফ পোয়েট’ নামে বিশ্বের দরবারে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এই শহরে প্রায় সমস্ত শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে কবিতা লেখেন। পরবর্তীকালে এখানেই জন্ম হয়েছিল ওমর খৈয়াম, রুমির মতো বিখ্যাত কবিদের। ইরানের এই বিচিত্র পদ্ধতিতে ভাগ্যগণনার ফলাফল সব সময় যে মিলে যায় তা নয়। তবে মনে করা হয় পারস্য নববর্ষ উপলক্ষে নুরুজ ও শাব-এ-ইয়াল্ডা উৎসবের দিন ফাল-এ-হাফিজ পদ্ধতিতে ভাগ্য গণনা করা হলে তার সুফল সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে