ইতিহাসের দুর্ধর্ষ একদল নারী যোদ্ধা

ঢাকা, শনিবার   ১৯ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৭ ১৪২৮,   ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

ইতিহাসের দুর্ধর্ষ একদল নারী যোদ্ধা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৬ ৭ মে ২০২১   আপডেট: ১৫:২৬ ৭ মে ২০২১

‘দাহোমি আমাজন’ নামে পরিচিত ছিল নারীদের এই সৈন্যদল

‘দাহোমি আমাজন’ নামে পরিচিত ছিল নারীদের এই সৈন্যদল

বিংশ শতাব্দীতে এসে সব কাজেই পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের সমান পদচারণা দেখা যায়। তবে প্রায় ৪০০ বছর আগে একদল নারী এক ইতিহাস গড়েছিল। যা আজও জ্বলজ্বল করে আছে বিশ্ব ইতিহাসের পাতায়। ষোল শতকে আফ্রিকায় গড়ে উঠেছিল এই রাজ্য। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগের ঘটনা। এদের নিয়ে গঠিত ‘দাহোমি আমাজন’ সৈন্যদলের জন্য এই রাজ্য ইতিহাসের পাতায় সুপরিচিত। 

আগুজি যোদ্ধাদল, মিনো ইত্যাদি নামে নারীদের এই সেনাদল পরিচিত। তবে কীভাবে গঠিত হয়েছিল আর কেমন ছিল এই যোদ্ধারা। চলুন তাই জানাবো আজ আপনাদের- আফ্রিকার বেনিনে অবস্থিত ছিল দাহোমি। এই রাজ্য ধনী হয়ে উঠেছিল দাস ব্যবসার মাধ্যমে। অনেক মতানৈক্য থাকলেও, মোটামুটি যে তথ্য মেলে সেই অনুযায়ী এই সাম্রাজ্যের তৃতীয় রাজা ছিলেন ওয়েগবাজা। তিনি হাতি শিকার করতেন। এজন্য নারীদের ব্যবহার করতেন। সেজন্য নারীদের সমন্বয়ে একটি সৈন্যদল গঠন করেছিলেন। এই দলের নাম ছিল জিবেতো।

মেয়েদের ৮ বছর হলেই পাঠানো হত সেনাদলে জানা যায় ২০ জন জিবেতো নিয়ে তৈরি হতো একটি দল। তারা ৪০টি হাতির পালকে তাড়া করতে সক্ষম ছিল। অন্তত ৩টি হাতি শিকার করতে পারত। ওয়েগবাজার ছেলে নারীদের নিয়ে একটি সেনা গঠন করেছিল। এরা রাতে প্রাসাদ পাহারা দিত। তিনি নারী রক্ষীদলকে সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। এরা ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। হারাতে শুরু করে পাশের রাজ্যের পুরুষ সেনাদের। পুরুষরা এদেরকে ‘মিনো’বলত। অর্থ ‘আমাদের মা’।

ইতিহাসবিদের মতে, এই সেনাদলে আট থেকে দশ বছরের মেয়েরাও যোদ্ধা হিসেবে কাজ করত। রাজার যে সকল স্ত্রী খুব একটা সুন্দরী হতো না তারা ওই যোদ্ধা দলে অংশগ্রহণ করত। এরা জীবন উৎসর্গ করতো দাহোমি রাজ্যের জন্য যুদ্ধে। সন্তান ধারণ করত না এরা, কারণ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কোনো সময়ে সরে আসা যাবে না। কেন নারী যোদ্ধাদল গড়ে উঠেছিল দাহোমিতে? বলা হয় শত্রু সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল। সামাল দিতে নারীদেরও যুক্ত করা হয়েছিল। আবার আরেকটি তথ্য মতে, ওই রাজ্যে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি ছিল নারীর সংখ্যা। তাই নারী শক্তিকে কাজে লাগাতেই হত। ছাড়া অন্য উপায়ও ছিল না। পুরুষদের মতোই কঠোর প্রশিক্ষণ দেয়া হত এই যোদ্ধাদের। আলাদা যুদ্ধের পোশাক ছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করত তারা। নিজের জীবন উৎসর্গ করত দেশের জন্য। এজন্য অবশ্য বেশিরভাগ মেয়েই কুমারী থেকে যেত সারাজীবন।  

আশেপাশের রাজ্যের জন্য এরা ছিল এক আতঙ্কের নাম

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা আর্থার আর্ডলি উইলমটের লেখা থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তিনি দাহোমিতে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক নারী লক্ষ্য করেন। যার কারণ হিসেবে তিনি যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি এবং দাস ব্যবসার উল্লেখ করেন। মূলত এই দুটি কারণই প্রধান ছিল পুরুষের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কমে যাওয়ার। ফলে দাহোমির রাজাদের কাছে নারী শক্তিকে কাজে লাগানো ছাড়া অন্য উপায়ও ছিল না। রাজা গেজোর সময় নারী যোদ্ধাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।

দাহোমি রাজ্যের পতন ঘটে ১৮৯৪ সালে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের হার হয়। ১৮৯২ সালে হয়েছিল ‘ফ্রাংকো-দাহোমিয়ান যুদ্ধ’। তখন তাদের আত্মবিশ্বাস চরমে। নারী শক্তির উপর ভর করে জয় করছে একের পর এক রাজ্য। এমনভাবেই ফ্রান্সের একটি উপনিবেশের উপর আক্রমণ করে তারা।

এই সৈন্যদলের নারীরা কখনো নিয়ে কিংবা সন্তান ধারণ করতে পারত না, যে কারণে বেশিরভাগ নারী সারাজীবন কুমারী থেকে যেতপর্যটক স্যার রিচার্ড বার্টন ১৮৬০ সালে দাহোমিতে যান এবং আমাজনদের কাছ থেকে দেখেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজা গেজো দাহোমি আমাজনদের প্রাসাদের আঙিনাতেই রাখতেন। তাদের সরবরাহ করা হতো পর্যাপ্ত পরিমাণ তামাক, মদ এবং দাসী। যখন কোনো আমাজন প্রাসাদের বাইরে বের হত, একজন দাসী তার আগে আগে একটি ঘন্টি নিয়ে হেঁটে যেত। সেই ঘন্টির আওয়াজ ছিল পুরুষ যোদ্ধাদের সতর্ক করার জন্য, যাতে তারা নির্দিষ্ট দূরত্বে সরে যায়।

দাহোমির নারী যোদ্ধারাই যে তাদের সময়ের একমাত্র নারী ছিলেন যারা সামরিক কাজে অংশ নিয়েছেন তা কিন্তু নয়। কিছু সংখ্যক সমসাময়িক নারী শাসক, নারী দেহরক্ষীর ঘটনা জানা যায়। কিন্তু দাহোমি আমাজনের বিশেষত্ব হলো তাদেরকে প্রস্তুত করার ধরণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ। পুরুষদের মতোই কঠোর প্রশিক্ষণ দেয়া হত তাদের। নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম ছিল।

পুরুষদের মতোই কঠোর প্রশিক্ষণ দেয়া হত এই যোদ্ধাদেরতারা কেবল অন্দরমহল কিংবা প্রাসাদের রক্ষী হিসেবে থাকত না, যুদ্ধের ময়দানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করত। রাজ্য ও রাজার জন্যে যুদ্ধ করা ও প্রায়শঃ জীবন দেয়াই দাহোমির নারী যোদ্ধাদের বাকীদের চেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড় করায়। উনিশ শতকের শেষে অর্ধেকেই অন্তত ৬ থেকে ১৫ হাজার দাহোমি আমাজনের মৃত্যু ঘটে বিভিন্ন যুদ্ধে। তাদের দেয়া প্রশিক্ষণ ছিল তাদের স্নায়ুকে ইস্পাতের মতো কঠিন করে গড়ে তোলার জন্য। প্রায়ই প্রশিক্ষণার্থীদের পরীক্ষা করা হতো যুদ্ধবন্দীদের শাস্তি দেয়ানোর মাধ্যমে।

এমনকি নারী যোদ্ধারা বন্দী হত্যায়ও নিয়োজিত ছিল। এক বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হত তাদের, যার নাম ছিল 'অসংবেদনশীলতার প্রশিক্ষণ'। এই প্রশিক্ষণে এক বাৎসরিক অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থী যোদ্ধারা ১৬ ফুট উঁচু একটি বেদীতে দাঁড়িয়ে ঝুড়িতে বাঁধা অবস্থায় একজন করে যুদ্ধবন্দী নিয়ে নিচে দাঁড়ানো জনতার ভীড়ে ছুড়ে মারত। বেশিরভাগ সময়েই মৃত্যু ঘটতো বন্দীর। 

চারশো বছর আগে এই নারীরা গড়েছেন এক ইতিহাস, যা বিংশ শতাব্দীতে নারীদের উৎসাহ যোগায় দাহোমি রাজ্যের পতন ঘটে ১৮৯৪ সালে, ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ১৮৯০ সালের দিকে দাহোমি সাম্রাজ্যের শেষ রাজা বেহানজিন ফ্রেঞ্চ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যা ‘ফ্রাংকো-দাহোমিয়ান যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধের সূত্রপাতও হয় দাহোমিদের দ্বারাই। ১৮৭০ সাল থেকেই নিজেদের সৈন্যদল নিয়ে দাহোমিদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকে। একের পর এক গোত্রের উপর আক্রমণ চালাতে থাকে তারা। নারী যোদ্ধাদের দুর্ধর্ষতার উপর ভিত্তি করেই মূলত এসব আক্রমণ চালাতে থাকে দাহোমিয়ান রাজারা। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন ফ্রান্সের একটি ক্ষুদ্র উপনিবেশের উপর আক্রমণ চালিয়ে বসে তারা। বলা হয়ে থাকে, একজন নারী যোদ্ধার ছোড়া এক আঘাতে গোত্র প্রধানের মাথা কেটে তা হাতে করে তাদের রাজার জন্য নিয়ে আসে ফ্রান্সের পতাকায় মুড়ে।

শুত্রুর মাথা কেটে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দাহোমি যোদ্ধা এ ঘটনায় ফ্রান্সও ক্রোধোন্মত্ত হয়ে ওঠে। যুদ্ধ ঘোষণা করে দাহোমি রাজ্যের বিরুদ্ধে। ফ্রেঞ্চরা  প্রথমেই অনুধাবন করেছিল যে, দাহোমিয়ানরা হাতে হাতে যুদ্ধে বেশ পারদর্শী হলেও অস্ত্র চালনায় এখনো কিছু কমতি রয়ে গেছে। এই সুযোগই কাজে লাগায় ফ্রান্স। তাদের গুলি বারুদ নিয়ে হামলা চালায় দাহোমিয়ানদের উপর। সামলাতে পারেনি তারা। হার মানতে বাধ্য হয়। ফ্রান্সের ব্যাপক যুদ্ধাস্ত্রের সামনে তাদের শেষ যুদ্ধে ১,৫০০ জন নারী যোদ্ধার মাঝে কেবল ৫০ জন যুদ্ধ শেষে সক্রিয় দায়িত্ব পালনে সক্ষম অবস্থায় ছিল। দাহোমি রাজ্যের পতন ঘটে ফ্রান্সের হাতে। ফ্রান্সের অধীনে যাওয়ার পর দাহোমি আমাজন ভেঙে দেয়া হয়। সর্বশেষ দাহোমি নারী যোদ্ধা নাওয়ি। তিনি এক ইতিহাসবিদকে বলেছিলেন তিনি ১৮৯২ সালে ফ্রান্সের সেই যুদ্ধে ছিলেন। ১৯৭৯ সালের মারা যান তিনি। বয়স ছিল ১০০’র বেশি। নাওয়ির মৃত্যুতে শেষ হয় দাহোমি আমাজনের নারীদের ইতিহাস।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে