ইতিহাসের নিঃসঙ্গতম মানুষ মাইকেল কলিনস

ঢাকা, শনিবার   ১৯ জুন ২০২১,   আষাঢ় ৭ ১৪২৮,   ০৭ জ্বিলকদ ১৪৪২

ইতিহাসের নিঃসঙ্গতম মানুষ মাইকেল কলিনস

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৮ ৬ মে ২০২১   আপডেট: ১৫:১৬ ৬ মে ২০২১

প্রথম চন্দ্রাভিযানের নভোচারী মাইকেল কলিনস

প্রথম চন্দ্রাভিযানের নভোচারী মাইকেল কলিনস

২০ জুলাই,১৯৬৯ সাল। বিশ্ব মুখোমুখি হলো নতুন এক ইতিহাসের। প্রথমবার চন্দ্রপৃষ্ঠ ছুঁয়েছে মানুষ। নীল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন বাজ অলড্রিন। তৈরি হল এক নতুন ইতিহাস। তবে এই দুই ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি সেই ইতিহাসের অংশীদার আরও একজন। মাইকেল কলিনস। অনালোচিত, বিস্মৃতপ্রায় একটি নাম। মাইকেল সেদিন চাঁদের মাটিতে অবতরণ করেননি। বরং টানা ৮দিন ৪ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন মুন-অরবাইটারে বসে। এই চন্দ্রাভিযানে মাইকেলের ভূমিকা অসামান্য। তিনি না থাকলে হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যেত নীল মানব সভ্যতার প্রথম বহির্বিশ্বজয়।

এ বছরের ২৮ এপ্রিল প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি এই নভোচারী। ফ্লোরিডাতে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ‘লোনলিয়েস্ট ম্যান ইন হিস্ট্রি’ মাইকেল কলিনস। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছিলেন দুরারোগ্য ক্যান্সারে। চন্দ্রজয় করলেও, মারণ রোগকে হারাতে পারলেন না মাইকেল! তার সঙ্গেই সমাপ্ত হলো ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ের।  

মাইকেল কলিনস মার্কিন নাগরিক হলেও কলিনসের জন্ম ইতালির রোমে। বাবা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ইতালিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। সেই সূত্রেই কলিনসের বড় হয়ে ওঠা ইতালিতে। জীবনের প্রথম ১৭ বছর তিনি কাটিয়েছেন ইতালির বিভিন্ন শহরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে ইতালি থেকে সেনা সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেইসময়েই মার্কিন প্রদেশে ফেরা কলিনসের। 

সেদিন তিনি না থাকলে হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যেত নীল মানব সভ্যতার প্রথম বহির্বিশ্বজয়মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রথম উড়ানের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন কলিনস। বাবার সহকর্মীদের থেকে আয়ত্ত করেছিলেন বিমানচালনা। ইতালি ছাড়ার আগে ডুয়েল ইঞ্জিন উভচর এয়ারক্র্যাফট ‘গ্রুম্যান উডগন’-এর পাইলটের আসনে বসেছেন বেশ কয়েকবার। ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি একাডেমি থেকে ‘মিলিটারি সায়েন্স’-এ স্নাতকতা করেন কলিনস। তারপরই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষেক হয় পাইলটের আসনে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় মার্কিন সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন তিনি।

প্রথম চন্দ্রাভিযানের নভোচারী ছিলেন মাইকেল ষাটের দশকের শুরুর দিকে মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করে নাসা। খোঁজ শুরু হয় উপযুক্ত নভোচারীদের। শেষ পর্যন্ত মার্কিন বিমানবাহিনীর দক্ষ ৩১ জন পাইলটকে বেছে নেয় নাসা। সেই তালিকাতেই ছিলেন কলিনস। খামতি ছিল না উৎসাহে। ফলত আবার নতুন করে শুরু হল পড়াশোনা। এবার তিনি শান দিলেন সনাতন বিজ্ঞানে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলল পদার্থবিদ্যা, জিওলজির পাঠক্রম। সেইসঙ্গে ট্রেনিংও। কঠিন থেকে কঠিনতর প্রতিটি পরীক্ষাই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন কলিনস। তারপরই সেই ঐতিহাসিক চন্দ্র অভিযান। অ্যাপোলো-১১।

এই অভিযানের দৌলতেই তিনি পরিচিতি পান ‘ইতিহাসের নিঃসঙ্গতম মানুষ’ হিসেবে। চন্দ্রপৃষ্ঠে নীল এবং অলড্রিন অবতরণ করলেও, অরবাইটারে থেকে যান কলিনস। সেখান থেকেই মডিউল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। তবে খুব সহজ ছিল না সেই কাজ। চাঁদের অন্ধকারে অংশে চলে যাওয়া মাত্রই পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন হয়ে যেত সম্পূর্ণভাবে। থাকত না নীল আর্মস্ট্রং কিংবা অলড্রিনের সঙ্গেও বেতারে যোগাযোগ করার সুযোগ। অন্ধকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু প্রতীক্ষার মধ্যেই কাটিয়েছেন তিনি। সেই ঘটনাই এনে দেয় এমন পরিচিতি।

চন্দ্রাভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর সদস্য ছিলেন কলিনস অ্যাপোলো অভিযানের সময়, মহাশূন্য থেকে তোলা পৃথিবীর ছবিগুলোর পিছনেও রয়েছেন তিনিই। অরবাইটারে বসেই তিনি ফ্রেমবন্দি করেন নীলগ্রহ এবং চন্দ্রপৃষ্ঠের কয়েক হাজার ছবি। চন্দ্রাভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর সদস্য ছিলেন কলিনস। দুইবার চেষ্টার পর নাসায় নভোচারী হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। দক্ষ পাইলট হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। তবে চন্দ্রাভিযানের সাফল্যে তিনি কোনোদিনই তার দক্ষতাকে গুরুত্ব দেননি।

মহাশূন্য থেকে তোলা পৃথিবীর ছবিগুলোর পিছনেও রয়েছেন তিনিই২০০৯ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাত্কারে কলিন্স বলেছিলেন, আমি ও আমার দুই সহঅভিযাত্রী কঠিন পেশা বেছে নিয়েছিলাম। আর সফলও হয়েছি। তবে আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি যে মাত্র ১০ ভাগ পরিকল্পনামাফিক কাজ করেছি। বাকি ৯০ ভাগই ভাগ্য। আমার কবরে যেন ‘লাকি’ শব্দটা খোদাই করা থাকে!

টানা ৮দিন ৪ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন মুন-অরবাইটারে বসে ছিলেন মাইকেল ঐতিহাসিক সেই চন্দ্র-অভিযানের পর পেরিয়ে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার চাঁদের মাটিতে মানুষ পা দিলেও, ১৯৭২ সালের পর অধরাই থেকে গেছে উপগ্রহ-জয়।  আগামী ২০২৪ সাএ আবার চাঁদের মাটি ছুঁতে চলেছে মানুষ। আরও এক ইতিহাস গড়তে চলেছে নাসা। কিন্তু তার আগেই বিদায় নিলেন পথিকৃৎ। পাড়ি দিলেন অনন্তের দিকে। তবে তার অবদান অনেক বেশি থাকলেও আলোচনায় ছিলেন খুবই কম। 

৯০ বছর বয়সে দুরারোগ্য ক্যান্সারে ভুগে মারা যান মাইকেল কলিনস চন্দ্রাভিযানের পর প্রথম চাঁদের মাটিতে পা রাখা নীল আর্মস্ট্রং এবং দ্বিতীয় মানব অলড্রিনের কথা আলোচনা হয়েছে অনেক বেশি। সেই তুলনায় মাইকেল খানিকটা আড়ালেই ছিলেন বলা যায়। এই নিঃসঙ্গ মানুষটির সঙ্গে সঙ্গে সমাপ্ত হলো বিশ্বের এক ইতিহাসের অধ্যায়। উল্লেখ্য, বর্তমানে অ্যাপোলো ১১ অভিযানের মাত্র একজন সদস্য বেঁচে আছেন। তিনি হচ্ছেন এডুইন অলড্রিন। তার বয়স ৯১ বছর।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে