পহেলা বৈশাখ পালনেও আছে অঞ্চলভেদে রকমফের

ঢাকা, রোববার   ০৯ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৬ ১৪২৮,   ২৬ রমজান ১৪৪২

পহেলা বৈশাখ পালনেও আছে অঞ্চলভেদে রকমফের

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৭ ১৪ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৩:৫১ ১৪ এপ্রিল ২০২১

চাকমারা বিজু উৎসবের মাধ্যমে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে

চাকমারা বিজু উৎসবের মাধ্যমে বরণ করে নেয় নতুন বছরকে

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। নানান উৎসব আর আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হয় এই দিনটি। ভোরের আলো ফুটতেই রমনার বটমূলে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো ... মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’ কবিগুরুর এই গান দিয়েই বরণ করে নেয়া হয় নতুন বছরকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গলশোভাযাত্রা যেন নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসে মেলা। এ যেন বাঙালির প্রাণের উৎসব। ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে উদযাপন করে এ উৎসব। পুরনো সব দুঃখ ভুলে নতুন করে শুরু করার সংকল্প নিয়েই নতুন ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ দেয় সবাই।    

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ তবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসবের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রূপ। উপজাতিরা এই দিনটিতে তাদের নিজস্ব উৎসব বিজু পালন করে। তিনদিন ধরে চলে সেই উৎসব। চলুন আজ পহেলা বৈশাখের সেইসব ভিন্ন আয়োজনের কথা জানবো- 

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দকে আজকের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়ার কৃতত্ব অবশ্য বাংলা একাডেমির। ১৯৬৬ সালে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে একটি কমিটি বাংলা সনের বিভি ন্নমাস ও ঋতুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে নির্ণয় করেন। যার মধ্যে ছিল বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর মতনই ৩৬৫ দিনের। যদিও সেখানে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের পরিপূর্ণ সময়কেই যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে। এই প্রদক্ষিণের মোট সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট এবং ৪৭ সেকেন্ড। এই ব্যবধান ঘোচাতে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর প্রতি চার বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান নির্ভর হলেও বাংলা সনে অতিরিক্ত এই দিনটি রাখা হয়নি। বাংলা মাস অন্যান্য সনের মাসের মতনই বিভিন্ন পরিসরের হয়ে যাচ্ছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে শুরু এই ডিনের আয়োজন এই সমস্যাগুলোকে দূর করতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি প্রস্তাবণায় বাংলা একাডেমি বাংলা সন আধুনিকায়ন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সিদ্ধান্ত হয়, বছরের প্রথম পাঁচ মাস অর্থাৎ বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের। পরের মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন হতে চৈত্র হবে প্রতিটি ৩০ দিনের মাস। প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়, বঙ্গাব্দের দিন গণনা শুরু হবে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই। ইংরেজি সন (খ্রিস্টাব্দে) দিন গণনা হয় রাত ১২টা থেকে। বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের একটা বড় পার্থক্য হলো, ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন করা হয় ঠিক রাত ১২টা থেকে আর বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে।

চট্টগ্রামে বর্ষবরণ
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্র ডিসি পাহাড় পার্ক। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে এখানে পুরোনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুইদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মুক্তমঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকে নানা গ্রামীণ পণ্যের পশরা। থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থাও। চট্টগ্রামে সম্মিলিতভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের উদ্যোগ ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে রাজনীতিকদের প্রচেষ্টায়। ইস্পাহানি পাহাড়ের পাদদেশে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ১৯৭৮ সালে এই উৎসব এখনকার ডিসি হিল পার্কে সরিয়ে নেয়া হয়। ১৯৭৮ সালের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওয়াহিদুল হক, নির্মল মিত্র, মিহির নন্দী, অরুন দাশ গুপ্ত, আবুল মোমেন, সুভাষ দে প্রমুখ।

সাদা লাল শাড়ি খোঁপায় ফুল বাঙালি তরুণীদের পরনে বৈশাখ উদযাপনে প্রথম দিকে প্রত্যেক সংগঠন থেকে দুইজন করে নিয়ে একটি স্কোয়াড গঠন করা হতো। সেই স্কোয়াডই সম্মিলিত সংগীত পরিবেশন করতো। ১৯৮০ সাল থেকে সংগঠনগুলো আলাদাভাবে গান পরিবেশন শুরু করে। পরে গ্রুপ থিয়েটার সমন্বয় পরিষদ যুক্ত হওয়ার পর অনুষ্ঠানে নাটকও যুক্ত হয়েছে। নগরীর অন্যান্য নিয়মিত আয়োজনের মধ্যে রয়েছে শিশু সংগঠন ফুলকীর তিনদিন ব্যাপী উৎসব যা শেষ হয় বৈশাখের প্রথম দিবসে। নগরীর মহিলা সমিতি স্কুলে একটি বর্ষবরণ মেলা হয়ে থাকে।

পার্বত্য জেলায় আদিবাসীদের বর্ষবরণ

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্ত্বা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি। 

এই দিনে ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব পালিত হয়১২ এপ্রিল পালন করা হয় ফুলবিজু। এই দিন ভোরের আলো ফুটার আগেই ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ে ফুল সংগ্রহের জন্য। সংগ্রহিত ফুলের একভাগ দিয়ে বুদ্ধকে পূজা করা হয় আর অন্যভাগ পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। বাকি ফুলগুলো দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাত্‍ ১৩ এপ্রিল পালন করা হয় মুলবিজু। এইদিন সকালে বুদ্ধমূর্তি গোসল করিয়ে পূজা করা হয়। ছেলেমেয়েরা তাদের বৃদ্ধ দাদা-দাদী এবংনানা-নানীকে গোসল করায় এবং আশীর্বাদ নেয়। এই দিনে ঘরে ঘরে বিরানী সেমাই পাজন (বিভিন্ন রকমের সবজির মিশ্রণে তৈরি এক ধরনের তরকারী) সহ অনেক ধরনের সুস্বাদু খাবার রান্না করা হয়। বন্ধুবান্ধব আত্নীয়স্বজন বেড়াতে আসে ঘরে ঘরে এবং এসব খাবার দিয়ে তাদেরকে আপ্যায়ন করা হয়। সারাদিন রাত ধরে চলে ঘুরাঘুরি। বাংলা নববর্ষের ১ম দিন অর্থাত্‍ ১৪ এপ্রিল পালন করা হয় গজ্যা পজ্যা দিন (গড়িয়ে পড়ার দিন)। এই দিনেও বিজুর আমেজ থাকে।

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ  

ভোরের আলো ফুটতেই রমনার বটমূলে কবিগুরুর গান দিয়েই বরণ করে নেয়া হয় নতুন বছরকে
রমনার বটমূলের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা রাজধানীতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। ১৯৬৭ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের নিচে মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ।

ঢাকায় বৈশাখী উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সব শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ। 

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে