বিজ্ঞানীর ‘মনস্টার পুতুল’ আবিষ্কার, নিজের কাজ দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন নিজেই

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৬ মে ২০২১,   বৈশাখ ২৩ ১৪২৮,   ২৩ রমজান ১৪৪২

বিজ্ঞানীর ‘মনস্টার পুতুল’ আবিষ্কার, নিজের কাজ দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন নিজেই

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৭ ১৩ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৪:০৫ ১৩ এপ্রিল ২০২১

টমাস আলভা এডিসনের ‘লিটল মনস্টার’

টমাস আলভা এডিসনের ‘লিটল মনস্টার’

বোতাম টিপলেই সাইয়া সাইয়া কিংবা টুইংকেল টুইংকেল ছড়া নেচে নেচে গাওয়া পুতুলটির কথা মনে আছে কি? নব্বই দশকের প্রায় প্রতিটি ঘরেই বোধহয় এমন পুতুল ছিলই। সেই সময়কার বিলাসিতার প্রকাশ এই পুতুল হলেও আজকের শিশুদের কাছে ব্যাপারটা নেহাতই মজার। এখন তো মোবাইল ফোনেই এমন কত প্রোগ্রাম পাওয়া যায়। 

২০ বছর আগে নয়, আজ থেকে ১৩০ বছর আগের কথা ভাবুন তো। সেসময় এটি আশ্চর্য জিনিস ছিলই বটে। সেই সময় এমন ঘটনা কল্পনা করাও বেশ কঠিন ছিল। শুধু তাই নয়, ক্রেতারা আগ্রহ করে এই পুতুল ঘরে নিয়ে গেলেও শেষে রীতিমতো ভয় পেয়েই আবার ফিরিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। একজন দুজন নন, প্রায় প্রত্যেক ক্রেতাই ভয় পেয়েছেন। আর তাদের যিনি ভয় পাইয়েছেন, সেই মানুষটি আর কেউ নন, প্রযুক্তি বিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ টমাস আলভা এডিসন।

এই বিজ্ঞানীই ১৩০ বছর আগে প্রথম এমন পুতুল তৈরি করেন, যেগুলোর হাতল ঘোরাই গান গাইত১৮৯১ সাল। বোস্টন শহরের হোরাস প্যাট্রিজ অ্যান্ড কোং-এর কর্ণধার একটি চিঠি লিখলেন বিজ্ঞানী এডিসনকে। কিছুদিন আগেই এই দোকান থেকে পুতুল কিনে নিয়ে গিয়েছেন ২২ জন ক্রেতা। অনেকেই পুতুলের গঠনগত ত্রুটির কথা বলছেন। এমনকি শব্দ চালু করার হাতল ভেঙে গিয়েছে অনেকের। তবে এসব তেমন কোনো গুরুতর নয়। দোকান থেকেই সেসব সারিয়ে দেয়া যায়। এর বাইরেও বেশিরভাগ ক্রেতার অভিযোগ, এই পুতুলটি নিয়েই। এটি আসলে ভয়ংকর একটি পুতুল। পুতুলের মুখ থেকে হঠাৎ ছড়া বেরিয়ে আসতে শুনে ছোটরা তো বটেই বড়রাও ভয় পাচ্ছেন। 

কারখানায় তৈরি হয় এই পুতুল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সফল প্রযুক্তিবিদ হিসাবে স্বীকৃত টমাস এডিসন। তবে ব্যর্থতাও তার জীবনে এসেছে। সেইসব ব্যর্থতাকে অবশ্য পাত্তা দিতে রাজি ছিলেন না এডিসন। তিনি তার নোটবুকে লিখেছিলেন, তার অন্তত ১০ হাজার রকমের পরিকল্পনা বাস্তবে কাজ করেনি। তবে সেইসব ব্লুপ্রিন্ট থেকেই তৈরি হয়েছে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কিন্তু যে মানুষ জীবনের সমস্তকিছুকে এভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে শিখেছিলেন, তিনিই রীতিমতো বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন এই পুতুল নিয়ে। একসময় এদের নাম রেখে বসলেন ‘লিটল মনস্টার’।

কিছু ত্রুটির কারণে পুতুলটিকে সবাই ভয় পেতে থাকে যেহেতু এডিসন বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারী, বৈদ্যুতিক শক্তি, ধারণযোগ্য সংগীত এবং ছবি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন ততদিনে। আবার ফোনোগ্রাফ যন্ত্রের আবিষ্কারক হিসেবে ততদিনে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন এডিসন। সেই যন্ত্রকেই আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে এই পুতুলের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন এডিসন। পুরো প্রক্রিয়াটা সহজ ছিল না একেবারেই। সেকালের মিনিয়েচার যন্ত্র! এডিসনের কাছে এ ছিল এক চ্যালেঞ্জ।

পেছনের হাতল ঘোরালেই পুতুলটি গান গেয়ে উঠত সেই চ্যালেঞ্জ অবশ্য জিতেছিলেন এডিসন। মোমের প্রলেপ দেয়া মিনি ক্যাসেটের মধ্যেই রেকর্ড করা হল ছড়া। একটি ক্যাসেট নয়। কারণ ছোটো একটি ক্যাসেটে বড়জোর ২০ সেকেন্ডের রেকর্ডিং হতে পারে। একটার পর একটা ক্যাসেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরপর বাজানোর ব্যবস্থাও হল। বাছাই করা হল ২২টি ছড়াও। এইসব ছড়া আবৃত্তি করার জন্য ১৮ জন কণ্ঠশিল্পীকে জোগাড় করেছিলেন এডিসন। রীতিমতো ধুমধাম করে তৈরি হল ফোনোগ্রাফ পুতুল। প্রযুক্তির জগতে সে এক বিরাট সাফল্য।

শিশুরা তো বটেই বড়রাও এর শব্দে ভয় পেত বর্তমানে বার্বি ডল যে এতো জনপ্রিয়, সেই পুতুলটির মতোই ছিল দেখতে অনেকটা এই লিটল মনস্টারগুলো। তবে বিজ্ঞানীর ব্যর্থতার আরো একটি কারণ হতে পারে পুতুলের সাজসজ্জা। বাজার দখল করতে গেলে প্রযুক্তির সঙ্গে একটু শিল্পের মেলবন্ধন প্রয়োজন ছিল। একে তো বেশিরভাগ পুতুলের শরীরে কোনো পোশাক পরাননি এডিসন। যাদের পোশাক পরিয়েছেন, তাও যৎসামান্য। এমন পুতুলের মুখ থেকে হঠাৎ শব্দ বেরিয়ে এলে ভয় তো লাগবেই। আর এই সামান্য কারণেই বিরাট পুঁজি নিয়ে নামা ব্যবসায় হঠাৎ ভরাডুবি হল। পুনরায় গবেষণার জগতে ফিরতেও বেশ কয়েক বছর সময় লেগে গেল এডিসনের। যদি সঙ্গে একজন প্রোডাক্ট ডিজাইনারকে নিতেন, হয়তো এমন ভরাডুবি হত না তার।

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে