ভাইরাস নাকি দেবতার অভিশাপ, ঘাম-রোগের কারণ জানা যায়নি ৫৩৬ বছরেও

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৩ এপ্রিল ২০২১,   চৈত্র ৩০ ১৪২৭,   ২৯ শা'বান ১৪৪২

ভাইরাস নাকি দেবতার অভিশাপ, ঘাম-রোগের কারণ জানা যায়নি ৫৩৬ বছরেও

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:০৫ ৫ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ২২:৪৬ ৫ এপ্রিল ২০২১

এই রোগে মারা যায় রাজ পরিবারের সদস্যরাও

এই রোগে মারা যায় রাজ পরিবারের সদস্যরাও

গ্রীষ্মের দাবদাহে দরদর করে ঘাম পড়ছে কপাল বেয়ে। অতিষ্ঠ জীবন! এটি আমাদের মতো অনেক গ্রীষ্ম প্রধান দেশের একেবারেই সাধারণ চিত্র। তবে এমন যদি হয় শরীর থেকে ঘাম হচ্ছে ঠিকই আবার শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছেন। অসাড় হতে থাকল হাত-পা। শিরদাঁড়া বেয়ে যেন হিমস্রোত নেমে গেল। শক্ত হয়ে গেল পেশি। এরপর বড় জোড় আধা ঘণ্টা। তারপরেই যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু। এমনই এক দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল বিশ্ব। 

৫০০ বছর আগেকার কথা। ১৪৮৫ থেকে ১৫৫১ সাল অবধি ইউরোপে তাণ্ডব করেছিল ঘাম-রোগ। একে একে আক্রান্ত হচ্ছিলেন রাজপরিবারের সদস্যরাও। সপ্তম হেনরির দাদা ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’ আর্থার পড়লেন ঘাম-রোগের কবলে। সংক্রমণ ছড়াল তার স্ত্রী ক্যাথরিন অব অ্যারাগনের শরীরেও। সেটা ১৫০২ সাল। রাজপরিবারের বদ্যিরা বললেন বাষ্প-রোগ। ব্ল্যাক ডেথ, টিউবারকিউলোসিস, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই ছোঁয়াচে হয়ে উঠেছে এই অসুখ। ডাক্তাররা সেই সময় ভেবেছিলেন বাতাস থেকে ছড়াচ্ছে রোগ। মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি রোগের কারণ। আর্থারকে বাঁচানো যায়নি। ঘাম রোগের কারণ খুঁজতে ২০০২ সালে ইতিহাসবিদরা আর্থারের কবর খুঁড়ে বের করেছিলেন। তবে কী থেকে সেই রোগ ছড়িয়েছিল তা বোঝা যায়নি।

শরীর ঠাণ্ডা হয়ে ঘাম হতে শুরু করে এরপর মৃত্যু ঘাম হওয়া ব্যক্তির সংস্পর্শে কেউ এলে, তার নিশ্চিত মৃত্যু। বর্তমানে এক মহামারিতে আক্রান্ত পৃথিবী। পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে। ২০১৯ সালে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের এখন দ্বিতীয় ঢেউ। সর্দি কাশি, থুতু-লালা থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে অতিমারি হয়ে উঠেছে। এরইমধ্যে এর প্রতিষেধকও আবিষ্কার হয়েছে। তারপরও রোধ করা যাচ্ছে না এই ভাইরাসের সংক্রমণ। এমন অতিমারির মুখোমুখি হয়েছে বিশ্ব প্রতি শতকেই। তেমনি ঘাম থেকেও ছড়িয়েছিল এক মারণ রোগ। সেই রোগও মহামারি হয়ে মৃত্যুর পর মৃত্যু ঘটিয়ে চলেছিল। জনশূন্য হয়ে পড়েছিল ইউরোপের গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর। 

কেউই বুঝতে পারছে না কীভাবে এই রোগ ছড়াচ্ছে অসুখ জানান দিয়ে আসত না। আচমকাই শরীরে শিহরণ , গলগল করে বেরিয়ে আসা ঘাম, দুর্গন্ধ, অন্তিম পরিণতি মৃত্যু। ভাবতেও অবাক লাগে আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে এমন ঘাম-রোগের শিকার হয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। ইউরোপই ছিল এই ছোঁয়াচে বিদঘুটে অসুখের ভরকেন্দ্র। সূচনাটা হয়েছিল ইংল্যান্ডে। তারপর উল্কাগতিতে অসুখ ছড়িয়েছিল ইউরোপের অন্যান্য দেশে। কী থেকে রোগ ছড়াচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই শ্মশানের স্তব্ধতা নেমে এসেছিল শহরের অলিতে গলিতে। রাজপরিবারের অন্দরমহলে। সে এক দুঃস্বপ্নের সময়। স্প্যানিশ ফু, ব্ল্যাক ডেথ, জ্বর এবং হালে ইবোলা, সার্স, মার্স, করোনাভাইরাসের থেকেও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল সে মহামারি। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, ৫৩৬ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এই রোগের কারণ খোঁজা হয়নি সেভাবে, কালের গতিতে ইতিহাসের হলুদ পাতায় চির সমাধি হয়েছে।

রাজ পরিবারের সদস্যরা একের পর এক মারা যাচ্ছে অজানা এক রোগে ঘাম হয় আর তারপরেই মৃত্যু। প্রথমে বোঝা যায়নি এর কারণ, লক্ষণ এবং বিস্তার। ডাক্তার-বদ্যিরা ভেবেছিলেন হঠাৎ করেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হচ্ছে হয়তো। তবে সমস্যা বোঝা গেল কিছুদিন পর থেকে। ১৯ সেপ্টেম্বর। সুপার সাইক্লোনের মতো লন্ডনে আছড়ে পড়ল সেই অজানা রোগ। ছোঁয়াচে ঘাম সংক্রামক মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ল শহরে শহরে। কয়েকদিনে মৃত্যু হল কয়েক হাজার মানুষের। অক্টোবরে গিয়ে দেখা গেল মৃতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। রাজার সভাসদ-পারিষদরাও রয়েছেন তালিকায়, রাজপরিবারের দাসদাসী, কর্মচারীরাও আক্রান্ত। একদিকে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের ক্ষয়ক্ষতি, অন্যদিকে এক অজানা রোগ, মহা বিপদে পড়লেন রাজা সপ্তম হেনরি।

রাজা সপ্তম হেনরি১৫৫১ সালে শিউসবারির চিকিৎসক জন কেইয়াস এই রোগকে প্রথম শণাক্ত করলেন। তিনি এই রোগের নামকরণ করলেন সোয়েটিং সিকনেস। ইংরাজিতে সোয়েট মানে ঘাম। এই ঘাম থেকেই ছড়াচ্ছে রোগ। এই সোয়েটিং সিকনেসকে পরে অবশ্য ইতিহাসবিদরা নানা নামে ডেকেছিলেন, বাংলায় বলা হয়েছিল স্বেদন রোগ বা স্বেদন বালাই। এর কোনো উপসর্গ নেই, আচমকাই দরদর করে ঘাম হচ্ছে আর তারপরেই সব শেষ। জন বললেন, রোগের দুটি পর্যায় আছে। প্রথমটা কোল্ড স্টেজ। এই পর্বে রোগীর সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসবে। কাঁপুনি দেবে।

পেশিতে খিচুনি দেখা দেবে। গলা, কাঁধ, হাত-পায়ের পেশিতে অসহ্য যন্ত্রণা হবে, সেই সঙ্গে বুকে ভীষণ চাপ। কোল্ড স্টেজ থাকবে আধা ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টার মতো। যার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত বেশি, তার টিকে থাকার সময়ও বেশি। এই কোল্ড স্টেজের পরে আসবে সোয়েটিং স্টেজ। এই পর্বে হঠাৎ করেই শরীর গরম হতে থাকবে। প্রচণ্ড ঘাম হবে, সঙ্গে মাথাযন্ত্রণা। নাড়ির গতি বাড়বে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। রোগী যখন হাঁসফাঁস করতে শুরু করবে তখনই মোক্ষম ঝাপটা আসবে আচমকা অসাড় হয়ে যাবে হাত-পা, বন্ধ হবে হৃদগতি। তারপরেই মৃত্যু।

ডাক্তার বদ্যিরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না রাজা সপ্তম হেনরিকে এই রোগের বিশদ বিবরণ দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ডাক্তার থমাস ফ্রস্টিয়ার। তিনিও তখন সোয়েটিং ডিজিজ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। রোগীদের পরীক্ষা করছেন। থমাস বললেন, বসন্তকাল আর গ্রীষ্মের সন্ধিক্ষণেই ছড়াচ্ছে এই রোগ। কী কারণে ঘাম হচ্ছে তা অবশ্য তিনি ধরতে পারেননি। তবে রোগের কিছু লক্ষণ বলেছিলেন। চিঠিতে থমাস লিখেছিলেন, ঘাম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেছে রোগীর হার্ট ও ফুসফুসের চারপাশে বাষ্প জমছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে রোগীর। তবে ত্বকে কোনো র‍্যাশ, ফোস্কা বা চুলকানি দেখা যাচ্ছে না কারো। শরীরের ভেতরটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে আর তাতেই দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হচ্ছে রোগীর। রোগের বিবরণ শুনে হইচই পড়ে যায় ব্রিটেনে। বসওয়ার্থ ফিল্ড যুদ্ধের দোহাই দিয়ে অনেকে বলেন রাজা সপ্তম হেনরিকে জোর করে সিংহাসনে বসানো হয়েছে, আর তাতেই কুপিত হয়েছেন দেবতারা। এ কোনো রোগ নয়, আসলে এক ভয়ংকর অভিশাপ ছিড়েখুঁড়ে খাবে ইংল্যান্ডবাসীকে। 

ঘাম রোগ নিয়ে চিকিৎসক  জন কেইয়াসের লেখা বই  প্রায় ৫৩৬ বছর আগে যে রোগ পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে তার কারণ এখনো জানে না বিশ্ব। হিসাব মেলাতে পারেননি তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরাও। আবার একেক সময় একেক গবেষণায় উঠে এসেছে একেকরকম তথ্য। গবেষকরা বলেছিলেন, হান্টা ভাইরাস এই রোগের কারণ হতে পারে। ইঁদুর, বাদুড় জাতীয় প্রাণীর থেকে ছড়িয়েছিল অসুখ। যেসব উপসর্গ দেখা দিয়েছিল সেগুলোর সঙ্গে হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিন্ড্রোমের বিস্তর মিল ছিল। তবে হান্টাভাইরাসই রোগের কারণ কিনা তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

দেবতার অভিশাপে ইংল্যান্ড ধ্বংস হচ্ছিল এমনটাই মনে করছিলেন অনেকে অন্য এক তথ্যে বলা হয় এই রোগের কারণ অ্যানথ্রাক্স। ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামে ব্যাকটেরিয়া নিঃশ্বাস, ত্বকের ক্ষত দিয়ে বা খাবারের মাধ্যমে বাহিত হয়ে সংক্রমণ চড়াতে পারে। গবাদি পশুর থেকে এই রোগ ছড়ায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী অবস্থায় থাকতে পারে সেই ব্যাকটেরিয়া। ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি মারণাস্ত্রের প্রসঙ্গও তুলেছিলেন কয়েকজন গবেষক, ইতিহাসবিদ। দায়ী করা হয়েছিল ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধকে।

জৈবিক মারণাস্ত্র ছড়িয়ে দিয়ে মৃত্যু ঘটানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। যদিও এই তথ্যেরও প্রমাণ মেলেনি। ঘাম-রোগের প্রায় ২০০ বছর পরে ১৭১৮-১৯১৮ সালের মধ্যে ফ্রান্সে পিকার্ডি সোয়েট নামে প্রায় একই রকম রোগ ছড়িয়েছিল। কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এতে। সে রোগের কারণও ছিল অজানা। ব্রিটেনের সোয়েট ডিজিজ আর ফ্রান্সের পিকার্ডি সোয়েটের মধ্যে যোগসূত্র ছিল কিনা তাও ধরতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। ঘাম-রোগ এখনো রহস্য হয়েই রয়ে গেছে। এমন রহস্যাবৃত আছে অনেক মহামারিও। কোনোটির প্রতিষেধকও আবিষ্কার হয়নি শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গিয়েও।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে